সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়েই ব্যাধিগ্রস্ত

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪১ বার পড়া হয়েছে

পুঁজিবাদের অধীনে কোনো সমাজেরই সুস্থ থাকবার কথা নয়। খোদ আমেরিকাতেই মাদকাসক্তি, ধর্ষণ, খুন, প্রতারণা, আত্মহত্যা ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ। আমাদের সমাজ যে সুস্থ নেই, সেটা আমরা সবাই জানি ও মানি। এর যে বদল দরকার, সেটি নিয়েও বলাবলি করে থাকি। সমাজের সবচেয়ে পরিশ্রমী অংশ হচ্ছে কৃষক। অথচ তারাই সর্বাধিক বঞ্চিত। সমাজের সকল বঞ্চনার তারা প্রতীকবিশেষ। তাদের দুর্দশার ভেতর সেই রোগেরও পরিচয় রয়েছে, যার দরুন সমাজ সবচেয়ে বেশি পীড়িত। সেটি হলো শোষণ ও বৈষম্য। ওই দুটি একসঙ্গে থাকে। শোষণ বৈষম্য তৈরি করে এবং বৈষম্যের কারণে শোষণ সম্ভব হয়। সমাজের কল্যাণ করতে হলে এই রোগের চিকিৎসা অত্যাবশ্যক। তার জন্য সমাজকে বদল করা চাই। সংস্কারে কাজ হবে না; মৌলিক পরিবর্তন দরকার হবে।
এটি ভাবা স্বাভাবিক এবং আমরা ভাবিও বটে– সমাজ বদলালে রাষ্ট্রও বদলাবে। সেটি হয়তো মিথ্যা নয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি না বদলায় তাহলে সমাজ কি বদলাবে? রাষ্ট্রনৈতিকভাবে আমাদের দেশে তো পরিবর্তন এসেছে। ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তানিদেরও আমরা পরাভূত করেছি। তাতে সমাজের উন্নতি হয়নি, এমনটি বলা যাবে না। কিন্তু সেই উন্নতির সঙ্গে বৈষম্যও কি বাড়েনি? উন্নতি সবার হয়নি। উন্নতির সঙ্গে বিতরণও চাই। সেই বিতরণ যথার্থভাবে ঘটেনি; উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাই বৈষম্য বেড়েছে। অল্প কিছু মানুষ সব কিছুই পাচ্ছে, বাকিরা সবদিক দিয়েই বঞ্চিত হচ্ছে।
কিন্তু এমনটি ঘটবার তো কথা ছিল না। আমরা মুক্তির জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছি। তার মূল কথাটিই হচ্ছে সমাজ বদলাবে; মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে; ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে যথার্থ ও জবাবদিহির দায়িত্ব বহনকারী জনপ্রতিনিধিদের শাসন কার্যকর হবে। মানুষের বাকস্বাধীনতা, মুক্তিবুদ্ধির চর্চা ঘটবে। বাস্তবে কোনোটিই ঘটেনি। স্বপ্নটি ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের; সেটি আমরা পাইনি।
কেন পেলাম না? না-পাবার কারণটি অস্পষ্ট নয়। সেটি হলো রাষ্ট্র আয়তন ও পরিচয়ে পরিবর্তিত হয়েছে বটে, কিন্তু চরিত্রগতভাবে আগের মতোই রয়ে গেল। ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ছিল পুঁজিবাদী ও অগণতান্ত্রিক; পাকিস্তান আমলেও তাই ছিল। বাংলাদেশেও রাষ্ট্রের সেই চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। রাষ্ট্র অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তার হাতে আছে আইন-কানুন, বিভিন্ন বাহিনী, প্রচার মাধ্যম এবং খরচ করবার মতো বিস্তর টাকা। এই রাষ্ট্র শাসক শ্রেণির স্বার্থ দেখে এবং শাসক শ্রেণি তার নিজের স্বার্থই দেখে থাকে; সমাজে যে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ বসবাস করে, তাদের স্বার্থ দেখে না। বরঞ্চ বহুর স্বার্থকে বিপর্যস্ত করেই অল্পের স্বার্থের শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। রাষ্ট্রের পক্ষে তাই সমাজ কাঠামোতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবার কথা নয়। রাষ্ট্র বরঞ্চ তেমন পরিবর্তন যাতে না ঘটে সেদিকেই চোখ রাখে। পরিবর্তনকামীদের শাস্তি দেয়।
আমরা জানি, অতীতেও সমাজে প্রধান সত্য ছিল বৈষম্য, এবং দেখি যে বর্তমানে সেটি কমেনি, উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈষম্য আছে ধনী-দরিদ্রে, শিক্ষিত-অশিক্ষিতে, পাবলিক-প্রাইভেটে। একমাত্র শিক্ষাক্ষেত্র ছাড়া সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে পাবলিক হলো খারাপ; প্রাইভেট হলো ভালো। পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভালো মনে করবার প্রধান কারণ তার অবকাঠামো। সেটি না থাকলে তাদের দশা প্রাইভেটের চেয়ে খারাপ হতো। কিন্তু এর মধ্যেও সত্য এই যে, শিক্ষা এখন ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারি পণ্যে পরিণত হয়েছে এবং তারাই ভালো শিক্ষা পাচ্ছে, শিক্ষা ক্রয় করবার মতো ক্ষমতা যাদের রয়েছে। পরাধীনতার উভয় আমলেই দেখেছি, পাবলিক হাসপাতালগুলো ছিল পাবলিকের জন্য ভরসাস্থল। এখন তা নেই। এখন পাবলিক হাসপাতালের আশপাশেই প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে, এবং চিকিৎসা পাবলিক হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ওইসব জায়গাতে চলে গেছে। জাতীয় বাজেটে সব খাতেই ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, স্বাস্থ্য খাত ছাড়া। সেখানে মাথাপিছু বরাদ্দ কমেছে। ওদিকে কার বিরুদ্ধে কবে যে আমরা যুদ্ধ করব– সে ব্যাপারে যতই অনিশ্চয়তা থাকুক না কেন; দামি দামি সামরিক অস্ত্রশস্ত্র কেনার কোনো বিরাম নেই। এটি এক চমৎকার বাণিজ্য।
আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা ভাবি এবং সুযোগ পেলেই উল্লেখ করি। সেই চেতনাটি রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা ও কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝেছি যে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়; চাই সার্বিক মুক্তি। সেই মুক্তিকে যদি অতি সংক্ষেপে চিহ্নিত করতে হয় সেটি হচ্ছে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনা; তাকে গণতান্ত্রিক করা। অর্থাৎ সমাজ ব্যবস্থায় একটি বিপ্লব সংগঠিত করা। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে সামাজিক বিপ্লবের চেতনা। এর বাইরে সব কথাবার্তাই হয় বাহুল্য, নয় অবান্তর।
সমাজকে আমরা ভাবতে চাই মায়ের মতো। সমাজ মায়ের মতোই সবাইকে সমান চোখে দেখবে; ইতরবিশেষ করবে না। এর বিপরীতে রাষ্ট্রের আচরণটা পিতার মতো। মাতা নিজেও কিন্তু এই পিতার শাসনাধীন, যার অর্থ সমাজ চলে রাষ্ট্রের শাসনে। রাষ্ট্রকে স্বৈরাচারী অবস্থানে রেখে সমাজ গণতান্ত্রিক হবে– এমনটি কখনোই এবং কিছুতেই সম্ভব নয়। সম্ভব হয়ও-নি। সমাজকে বদলাতে হলে রাষ্ট্রকেও তাই বদলাতে হবে এবং সে-বদলটি কেবল বহিরঙ্গের হলে চলবে না। তাকে অবশ্যই হতে হবে অভ্যন্তরেরও। সন্দেহ নেই, অভ্যন্তরের পরিবর্তনটাই অধিক জরুরি। নইলে দেখতে পাব মাতারূপী সমাজও রাষ্ট্রের মতো আচরণ করছে; পিতৃতান্ত্রিক হয়ে গেছে, যেটি আমাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে এবং যা যুগযুগান্তর ধরে আমাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে রয়েছে।
সমাজে সমস্যার অবধি নেই, কিন্তু প্রধান সমস্যা বৈষম্যের। এই বৈষম্য পুঁজিবাদী চরিত্রের। এরই ফলে মানবিক সম্পর্কগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। শ্রেণিতে শ্রেণিতে দূরত্ব তো বাড়ছেই, এমনকি একই পরিবারের সদস্যদের ভেতরও ব্যবধান বৃদ্ধি পাচ্ছে। খনার বচন কিনা জানি না, কিন্তু আমার মাকে বলতে শুনেছি, ‘নদীতে নদীতে তবু দেখা হয়; বোনে বোনে দেখা হয় না।’ বিয়ের কারণে বোনেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এখন কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে দেখা হওয়াটাও কঠিন, মাঝখানে যদি প্রাচীর উঠে থাকে বিত্তগত পার্থক্যের। যেটি উঠেছে এবং অবিরাম উঠছে। সমাজের নৈতিক সংকটসহ অন্য বহুবিধ বিপদ-আপদ শ্রেণিবৈষম্যের সঙ্গেই জড়িত।
এক সময়ে ঢাকা ছিল মফস্বলের অবহেলিত জনপদ। বলা হতো, এটি হলো গিয়ে বায়ান্ন বাজার ও তেপ্পান্ন গলির শহর। বাজার অনেক, গলি ততোধিক। তারপর এই শহর তিন তিনবার রাজধানী হলো, দুইবার প্রদেশের, তৃতীয়বার স্বাধীন রাষ্ট্রের। তাতে শহরের বিস্তর উন্নতি ঘটল। কিন্তু ওই যে বায়ান্ন বাজার তার তেপ্পান্ন গলি; তার কণ্টকাকীর্ণ আলিঙ্গন থেকে তো মুক্তি পেল না। ওই বাজার ও গলিগুলো শহরের উন্নতির চেয়েও দ্রুতগতিতে বেড়েছে; দালানকোঠা, গাড়িঘোড়া, ভোগবিলাস, বিদেশ ভ্রমণ; কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই। কিন্তু শহরের যত উন্নতি ঘটল, ততই সে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ল।
বাজার ছিল, গলি ছিল; কিন্তু বেশ কিছু খোলা জায়গাও ছিল। পার্ক ছিল। এলাকা ও রাস্তার নামের সঙ্গে বাগ-বাগিচা, এমনকি বনও যুক্ত ছিল। নামের দিক থেকে সংযোগটি এখনও আছে। কিন্তু গাছ নেই, পাখি নেই, আকাশও নেই। খোলা জায়গাগুলো বেদখল হয়ে গেছে।
এর কারণ কী? এই যে উন্নতি ঘটল, কিন্তু তাকে ছাপিয়ে জীবনের সমষ্টিগত মান নেমে গেল। এর ব্যাখ্যা করব কীভাবে? বললে হয়তো সরল শোনাবে, তবু বলতেই হবে যে। এর কারণ হলো অদূরদর্শী পুঁজিবাদী বিকাশ। রাষ্ট্রের সতর্ক পাহারা ও নিষ্ঠুর পরিচালনায় উন্নতি যা ঘটবার, পুঁজিবাদী লাইনেই ঘটেছে। রাষ্ট্রের যারা পরিচালক ও মহাপরিচালক ছিলেন, তারা শুধু নিজেদের কথাই ভেবেছেন, জনগণের কথা না ভেবে। ফলে তাদের গাড়িঘোড়া, বাড়িঘর, ভোগবিলাস সবকিছুই বাড়ল, কিন্তু মানুষের প্রকৃত উন্নতি ঘটল না।
অন্য দৃষ্টান্ত না দিলেও চলে। ঢাকা শহরে যানজট বৃদ্ধির ইতিহাসই বলে দেবে উন্নয়নের ধারণা ও পরিকল্পনা কতটা অদূরদর্শী ছিল। কেবল অদূরদর্শীই নয়, অপরিণামদর্শীও বটে। যারা ধনী হয়েছেন তারা কি স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন? শুনেছি, অধুনা ক্ষেত্রবিশেষে হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু হেলিকপ্টারের ওঠানামার জন্য উপযুক্ত স্থানের প্রাচুর্য আছে কি?
উন্নতির একটি নির্ভরযোগ্য নিরিখ হচ্ছে মেয়েদের অগ্রগতি। মেয়েরা অবশ্যই আগের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। বিবরণের প্রয়োজন নেই। অগ্রগতি দৃশ্যমান বটে। কিন্তু ওই যে উন্নতির নিচে সামাজিক অবনতি, সেটি ধরা পড়ে মেয়েদের জীবনে নিরাপত্তার অভাবের চিত্রে। যেমন ধর্ষণে। এটি আগে যে ছিল না, তা নয়। কিন্তু দলবদ্ধ ধর্ষণের কথা শোনা যেত না। ওই অত্যাচারটি একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা করেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে মেয়েরা নিজ দেশবাসী দুর্বৃত্তদের হাতে ব্যাপকভাবে লাঞ্ছিত হবে– এটি কারও মনে দুঃস্বপ্নেও ছায়াপাত করেনি। অথচ সেটিই ঘটছে। কেবল দলবদ্ধ নয়। পাকিস্তানি দস্যুরা যা করেনি, বাংলাদেশিরা তাই করছে। শিশুধর্ষণ। এবং ধর্ষণের পর শিশুদের হত্যা করা। আমাদের উন্নতির চিত্রের ওপর যে কালো ছায়াগুলো বিদ্যমান– নারীর নিরাপত্তাহীনতা তার ভেতর সবচেয়ে লজ্জাজনক।
আমরা অপরাধ ও ব্যাধিমুক্ত সমাজ চাই। চাই ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা। পাশাপাশি চাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও। অথচ রাষ্ট্র, সরকার মৌলিক অধিকারগুলো ক্রমাগত হরণ করে চলেছে বিনা বাধায়, বিনা প্রতিরোধে। কিন্তু তা তো পাচ্ছি না। দেশে অপরাধীদের শাস্তি হয় না। কেউ কেউ ধরা পড়ে, তারপর বেরিয়ে এসে আবার অপরাধ শুরু করে দেয়। এ ক্ষেত্রে তো রাষ্ট্র স্বয়ং অপরাধী হয়ে রয়েছে। তার অপরাধ সমাজের কাছে; মানুষকে সে নিরাপত্তা দিতে পারছে না বলে। আসলে সমাজ এবং রাষ্ট্র উভয়েই ব্যাধিগ্রস্ত। যে জন্য অপরাধী ও ব্যাধিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা কমে না, বাড়তেই থাকে। কজনকে শাস্তি দেব? কোন কারাগারে তাদেরকে আটক রাখব? কোন চিকিৎসাকেন্দ্রে রাষ্ট্র ও সমাজের চিকিৎসা চলবে?

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com