শহরের ফুটপাত বা সড়ক এখন আর শুধু পথচারী বা গাড়ি চলাচলের জন্য নয়; এটি যেন দখলদারিত্বের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে জমে ওঠা নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ, অবৈধভাবে বসে যাওয়া হাটবাজার, অস্থায়ী দোকানপাট কিংবা রিকশা-ভ্যানের অবাধ দাপট পথচারী ও চালকদের জন্য এক অন্তহীন দুর্ভোগ তৈরি করছে এবং প্রতিদিন তা বাড়ছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তা এমনিতেই চলাচলের অনুপযোগী।
গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতি কিংবা অকার্যকর সিগনালের কারণে পথচারী ও যানবাহন চলাচল করে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সিগনাল ভাঙা, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো—প্রতিদিনের দৃশ্য। এসব বেপরোয়া আচরণে প্রতিনিয়ত ঘটে দুর্ঘটনা, হতাহত হয় বহু নিরীহ মানুষ।
শহরের সড়কগুলোতে বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে চলাচল যেমন ব্যাহত হয়, তেমনই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে বহুগুণে। সম্প্রতি টঙ্গিতে এক মহিলার ম্যানহোলে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নগরজীবনের এমন করুণ বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে। উন্মুক্ত ও বিপজ্জনক ড্রেনগুলো প্রতিদিনই কারো না কারো জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার শেষ নেই।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ভিআইপিদের চলাচল তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু এ চলাচলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। অফিসগামী মানুষ, পরীক্ষার হলে যাওয়া শিক্ষার্থী কিংবা হাসপাতালে ছুটে চলা রোগী—সবাই তখন অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মৌলিক অধিকার এ সময় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এ এক অস্বস্তিকর চিত্রই বটে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরকার নয়, কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোরও। সম্প্রতি বিএনপি জনসভায় মনোযোগী না হয়ে বরং নগরীর খাল পরিষ্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে এক প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। জনদুর্ভোগ না বাড়িয়ে পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কাজ করা সব রাজনৈতিক দলের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত। অন্য দলগুলোরও উচিত হবে এ ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসূচি হাতে নেওয়া।
রাস্তাঘাটের অবৈধ দখলদারির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা অতি জরুরি। প্রয়োজনে হকারদের জন্য আয়ের ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, স্থায়ী পুনর্বাসন এবং শক্তিশালী আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঘিঞ্জি ও চিপা গলির সমস্যাটি ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য এক মারাত্মক অভিশাপ। পুরনো শহরের অলিগলিগুলো এতই সংকীর্ণ যে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও প্রবেশ করতে পারে না। এর ফলে সামান্য দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড হঠাৎ ভয়াবহ রূপ লাভ করে। শহর পরিকল্পনায় পুরনো এলাকাগুলো পুনর্গঠন তথা জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করতে হবে।
নির্মাণসামগ্রী ফেলে রেখে জনপরিসরের বেপরোয়া দখল, আর এর সঙ্গে রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা; যা শহরের সড়ক ব্যবস্থাকে আরো বিপর্যস্ত করে তুলছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়, সড়ক সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। উপরন্তু নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটে। কঠোর নিরাপত্তা বিধি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন লঙ্ঘনের জন্য অতি জরিমানার মাধ্যমে এই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
জলাবদ্ধতা এবং উন্মুক্ত ড্রেনের সমস্যা কোনো অংশেই কম ভয়াবহ নয়। এক অঞ্চলের জলাবদ্ধতা পুরো শহরের যোগাযোগে স্থবিরতা ডেকে আনে। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলে, উন্মুক্ত ড্রেন ঢেকে দিয়ে এবং নিয়মিত খাল ও জলাশয় পরিষ্কার করে আমাদের প্রাণপ্রিয় নগরীর জীবন বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ট্রাফিক সিগনালের অপর্যাপ্ততা ও সড়কের নিরাপত্তাহীনতা শিশু, নারী ও বয়স্কদের চলাচলকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলছে। উন্নত সিগনাল ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা, প্রশিক্ষিত ট্রাফিক পুলিশ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। রোড মার্কিংয়ে আরো বেশি যত্নশীল হতে হবে।
শহর পরিকল্পনায় জনগণের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বস্তিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ছাড়া এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই। উন্নত ও নাগরিকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা, দখলমুক্ত ফুটপাত, নির্মাণকাজের নিরাপত্তা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে শহরের সড়ক ব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিনের যাতায়াত মানুষের কাছে যে বিভীষিকা তা কোনো আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে মানানসই নয়। এখনই সময় শহর পরিকল্পনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনার, যেখানে মানুষের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তি থাকবে মূল অগ্রাধিকার।
লেখক : অধ্যাপক, গবেষক ও ট্রেজারার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও
সহযোগী অধ্যাপক, শিল্পী ও গবেষক, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়