সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

গণসার্বভৌমত্বের রাজনীতি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার পড়া হয়েছে

চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। জনগণ শুধু শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের সামষ্টিক অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ তারা বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবে গড়তে চায়, যার নীতি হচ্ছে গণসার্বভৌমত্ব কায়েম। এর তিন দিন পর ৮ তারিখ একটা সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটেছে– যা আমরা শুরু থেকেই বারবার বলেছি। এত বিশাল আত্মত্যাগের পরও কেন গণঅভিপ্রায় পূর্ণতা পায়নি তার কারণগুলো আমাদের কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

গণঅভ্যুত্থান লক্ষ্যে না পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে– এক. সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাৎপদতা। যেমন– আমাদের সমাজে রাষ্ট্র ও সরকারের ধারণা অত্যন্ত দুর্বল এবং সামগ্রিকভাবে গণসার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, রাষ্ট্রচিন্তা ও জনগণের পক্ষে সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল নির্মাণের কোনো শক্তিশালী ধারা নাই। জনগণের সামষ্টিক অভিপ্রায় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবিতা এবং গণসচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ সম্বন্ধ রয়েছে। জনগণের রাজনৈতিক চেতনার রূপান্তর বুদ্ধিজীবীদের দ্বারাই ঘটে। তাই জনগণ যে রাষ্ট্র কল্পনা করতে পারে ও বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়, সেটা সমাজের বুদ্ধিজীবিতার স্তর দ্বারাই ঠিক হয়। বুদ্ধিজীবিতার সঙ্গে রাজনীতির এই সম্বন্ধ আমাদের সমাজে এখনও অস্পষ্ট। দুই. রাষ্ট্র গঠন আর সরকার নির্বাচন– এই দুটো যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য, এটাও অস্পষ্ট। ফলে এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পরে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কর্তব্য জনগণের কাছে হাজির করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সহজ সত্যের উপলব্ধি ও সচেতনতা সমাজে কম। তাই পুরানা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা বহাল রেখে নির্বাচনের মাধ্যমে লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণিকে আবার ক্ষমতায় আনার চেষ্টা চলছে। ফলে ফ্যাসিস্ট ও লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণি দ্রুত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইছে।

রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা সমাজে যেমন অস্পষ্ট, তেমনি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজির হওয়া জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে কীভাবে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ দিতে হয় সে সম্পর্কে আমাদের সমাজে ধারণাও অত্যন্ত দুর্বল। সবার কাছে আমরা তা আশা করি না বা করিনি। কিন্তু সমাজে যারা শিক্ষিত, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা তথাকথিত বামপন্থি– তাদের মধ্যে এ অস্পষ্টতা প্রকট। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে তাদের চিন্তার দৌড় যে এত নিম্নমানের, সেটা এর আগে বোঝা যায়নি। গণঅভ্যুত্থান, জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা এবং নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়ার মারাত্মক অভাব। আর তত্ত্ব ও ব্যবহারিক রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার জন্য তরুণদের বিভ্রান্ত করা অত্যন্ত সহজ হয়েছে। একজন তরুণকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, সংবিধান ছাড়া রাষ্ট্র কী করে চলে?’ সে তো আসলে রাষ্ট্রতত্ত্বের বই সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণ সচেতন না। সে লড়েছে, বুক পেতে দিয়েছে বুলেটের সামনে। তাকে যখন বোঝানো হয়েছে, “না, না, যারা এই নতুন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে, তারা বিপ্লবের কথা বলে, তারা সহিংসতার কথা বলে, তারা নৈরাজ্যের কথা বলে। আমাদের এখন দরকার ‘স্থিতিশীলতা’।’’

এই ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দটাই চরম গণঅভ্যুত্থানবিরোধী ও গণবিরোধী ধারণা ও লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির মতাদর্শিক অস্ত্র। তাদের কাছে গণঅভ্যুত্থান হলো অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। অতএব দরকার তাদের শ্রেণির সাংবিধানিক শাসন ও নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ দরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা। আমাদের সমাজের লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির এই মূল মতাদর্শিক বয়ান ও প্রচারের বিপরীতে দাঁড়াবার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি জনগণের পক্ষে ছিল না। ফলে শেখ হাসিনার সংবিধান রক্ষা করে একটি সেনা সমর্থিত উপদেষ্টা সরকার গঠন করা সম্ভব হয়েছে। তাই লুটেরা-মাফিয়া ও ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে এই সাময়িক পরাজয়ের পর আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা বা বুদ্ধিভিত্তিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা সবার আগে জরুরি।

লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণি স্থিতিশীলতার পক্ষে যেমন মতাদর্শিক বয়ান তৈরি করেছে, তেমনি আরেক স্বার্থান্বেষী পক্ষ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের পক্ষে সংবিধান রক্ষা করে বিদ্যমান ব্যবস্থা যে কোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখবার কথা বলে– তাদের দাবি শেখ হাসিনার সংবিধানকেই রাখতে হবে, অর্থাৎ শেখ হাসিনা না থাকলেও তার ভূত থাকবে। তার মানে, পুরানা রাষ্ট্র ব্যবস্থাই আদতে অক্ষত রাখা হলো। শুধুমাত্র ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’-মার্কা রাজনীতিটাই বাস্তবায়ন করা হলো। সামরিক শাসক এরশাদকে সরিয়ে ঠিক যেমন করেছি, সেই পুরানা জিনিসই বাস্তবায়ন করা হলো।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যেটা আমরা খুব কম আলোচনা করেছি, সেটা হলো শ্রেণি এবং শ্রেণি রাজনীতির প্রশ্ন। এই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বের জায়গায় যারা ছিল বা যারা মূলত নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণি। বেকারত্বের জন্য তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের চোখের সামনে। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে, কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না, ফলে কোনো কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না।

তবে অর্থনৈতিক প্রশ্নটা পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে সম্পূর্ণ অপরিচ্ছন্ন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে আমাদের বিশ্বব্যাংক-আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কাছাখোলা অবাধ বাজার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণি সেই লড়াই করতে রাজি না। সে স্যুট-টাই পরে বহুজাতিক করপোরেশনের গোলাম হতে রাজি। নইলে তারা চায় রাষ্ট্রের চাকরি, কারণ আমলার চাকরি ঘুষ-দুর্নীতির জন্য লোভনীয়।

গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-তরুণদের বিপুল অবদান থাকলেও কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনে পেটি-বুর্জোয়া চেতনা ছিল, সেটা অস্বীকার করার জো নাই; আবার তার শক্তি ও সম্ভাবনাকেও অস্বীকার করা যাবে না। ৮ আগস্টের সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের পর এই প্রতিবিপ্লবী, পেটি-বুর্জোয়া চেতনাটাই আরও শক্তিশালী হয়েছে। শ্রেণির প্রশ্নটা বুঝলে গণঅভিপ্রায় কেন পূর্ণতা পায়নি তার কারণ আমরা খুঁজে পাব।

কিন্তু শ্রেণি প্রশ্নের আরেকটা দিক আছে। এই গণঅভ্যুত্থানে সত্যি সত্যি অনেক গরিব মানুষ যুক্ত ছিল– রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে একেবারে রাস্তার গরিব মানুষ যুক্ত ছিল। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বটা ছিল পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে। অন্যদিকে আন্দোলনে শ্রমিক এবং কৃষক অনুপস্থিত বা অদৃশ্য। ফলে এই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র গঠনের কর্তব্য বাদ দিয়ে সহজে একটি সেনা সমর্থিত উপদেষ্টা সরকার গঠন এবং নির্বাচনবাদী রাজনীতির ধারায় চলে গিয়েছে।

গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে মানুষের বক্তব্যে যা দেখছি, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দুটো ধারায় বিভক্ত। এই বিভক্তি ক্রমশ আরও স্পষ্ট হবে। একটি ধারার নাম হলো– গঠনের রাজনীতি, যাকে সহজ ব্যবহারিক রাজনীতির ভাষায় আমরা বলতে পারি গণরাজনৈতিক ধারা; আর আরেকটি ধারা– লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির নির্বাচনবাদী ধারা। এই দুই ধারার সংঘাতের মধ্য দিয়ে আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। জনগণ যদি তাদের অভিপ্রায়কে মূর্ত না দেখে, বাস্তবায়িত হতে না দেখে, তারা অবশ্যই থেমে থাকবে না। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা– জনগণ অবশ্যই তাদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নের ভিন্ন রাজনৈতিক পথ খুঁজবে। এটাই তো স্বাভাবিক।

দুই.

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সংকটে আছে। বাংলাদেশের সংকটের চরিত্র শুধু রাজনৈতিক না; বরং অর্থনৈতিক। এই দিকটার ওপর আমি বিশেষভাবে জোর দিতে চাই। বাংলাদেশ চাইলেও অর্থনৈতিকভাবে বিকশিত হতে পারবে না, যদি না এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা উৎখাত করে বাংলাদেশ গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের মধ্য দিয়ে একটা কৃচ্ছ্রসাধনমূলক অর্থনীতির মধ্যে প্রবেশ করে। বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং দ্বিপক্ষীয় ঋণ দ্রুত পরিশোধ করা যায় সেই দিকে মনোযোগ দিতে হবে। জাতীয় অর্থনীতিকে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের অধীনস্থ না রেখে লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির বিপরীতে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। এবং গণপ্রণোদনার ভিত্তিতে যেন শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। এমন একটা অর্থনীতি প্রবর্তনের চেষ্টা করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিকভাবে কায়েম থাকবে জনগণের সার্বভৌমত্ব আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে থাকবে ইকোনমিক ডেমোক্রেসি বা অর্থনৈতিক গণতন্ত্র; জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা বা গাঠনিক ক্ষমতার বলে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে একটা পরিকল্পিত বিকাশের পথে আমাদের যেতে হবে। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে আমাদের কাজ হবে অবিলম্বে সব প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে গঠন করা এবং এমনভাবে গঠন করা যেন আমরা একটা বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। আমাদের প্রতিটি জেলা যেন স্বাধীনভাবে তাদের বিকাশ নিজেরা করতে পারে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় বড় পরিকল্পনা জাতীয় ভিত্তিতে করলেও তার সুফল যেন প্রত্যেক নাগরিকের কাছে পৌঁছায়। এই ধরনের একটা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা আমাদের কায়েম করতে হবে। এই নতুন ধরনের সরকার হবে জনগণের সরকার।

ক্ষমতার দিক থেকে গণতন্ত্র মানে কী, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। সেটা হলো ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধী জনগণের গণতন্ত্র। জনগণ মানে সবাই অন্তর্ভুক্ত নয়। তথাকথিত অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র মোটেও তো নয়ই। যা আসলে ফ্যাসিস্ট শক্তি পুনর্বাসন ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মতাদর্শ ও রাজনীতি। এর বিপরীতে জনগণের গণতন্ত্র মানে ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি– গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে দমন করবার সামষ্টিক ক্ষমতা এবং দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত ও এই লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে জনগণের বলপ্রয়োগের ক্ষমতা, তাদের বিচার করবার গণক্ষমতা ইত্যাদি। গণআদালতে যেন তাদের বিচার হয়। বিচার করতে দীর্ঘ সময় যেন না লাগে। একই সঙ্গে পাচার করা অর্থ যেন আমরা দ্রুতবেগে ফিরিয়ে আনতে পারি।

এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মানে হলো ‘গণসার্বভৌমত্ব’ কায়েম। আর নতুন রাষ্ট্র গঠনের তিনটা নীতিগত ভিত্তি আমরা আগেই প্রস্তাব করেছি। প্রথম ভিত্তি হলো– সকল প্রকার ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করা। বলেছি, রাষ্ট্র এমন কোনো আইন করতে পারে না, যাতে ব্যক্তির অধিকার এবং ব্যক্তির মর্যাদা হরণ অথবা ক্ষুণ্ন হয়। দুই. প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রাণের বৈচিত্র্য– যার মধ্যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অন্তর্গত– একে ধ্বংস করে, ক্ষতি করে এরকম কোনো আইন কিংবা নীতি রাষ্ট্র প্রণয়ন করতে পারবে না। তিন. জীবন ও জীবিকা ধ্বংস করে এমন কোনো আইন কিংবা নীতি রাষ্ট্র গ্রহণ করতে পারবে না। এই তিনটা নীতির ভিত্তিতে আমরা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেছি। সেটা একটা গঠনতান্ত্রিক সভা বা রাষ্ট্র গঠন সভা বা যাকে ইংরেজিতে কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বলে, সেই ধরনের একটা গণপরিষদ সভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আলোচনা করতে পারে, রাষ্ট্রটা কেমন হবে। বাইরে থেকে অনেকে অনেক প্রস্তাব দিতে পারে। কিন্তু একমাত্র নির্বাচিত গণপরিষদের সদস্যরাই এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করবেন এবং এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তিন.

ছাত্র-তরুণদের মধ্যে একটা অংশ নির্বাচনবাদী হলেও বড় একটা অংশ গাঠনিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তারা চায়, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়িত হোক। তারা যে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা নির্মাণ করতে চাইছে, সেটাই হলো গাঠনিক রাজনীতি। ফলে কী করে গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের ধারণা কাজে লাগাতে হয়, রণকৌশল ঠিক করতে হয়, রণনীতি ঠিক করতে হয়– সেটা তারা রপ্ত করবে। সুতরাং অবশ্যই গণসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে আগামী দিনে রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে কিংবা বিদ্যমান দলের মধ্যেই রূপান্তর ঘটবে। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই তত্ত্ব ধারণ করলে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চও হতে পারে। সেখানে নেতৃত্বে আসতে পারে যারা সত্যিকার অর্থে একটা গণরাজনৈতিক ধারা বিকশিত করে জনগণকে পূর্ণ বিজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা ধারণ করে।
এ ক্ষেত্রে মতবাদী রাজনীতি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ আপনার মাথার মধ্যে একটা মতবাদ আছে, অথচ আপনার মতবাদের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নাই। আপনি বাস্তবতা দেখে আপনার মতকে বদলাবেন, তা না করে আপনি বাস্তবকে আপনার মতবাদের মধ্যে ফিট করতে চাচ্ছেন। এই যে বিভ্রান্তি, যেটা বামপন্থিদের মধ্যে প্রবল, ইসলামপন্থিদের ও প্রবল– এই মতবাদী বিভ্রান্তি বা অন্ধত্ব কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা বলি, মতবাদী রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, ধর্মতত্ত্বের যুগও শেষ হয়ে গেছে। এখনকার যুগ দর্শনের যুগ, পর্যালোচনার যুগ, ভাবের যুগ। সেই যুগে আমাদের প্রবেশ করতেই হবে। ধর্মতত্ত্ব হচ্ছে উপলব্ধির স্তর। ধর্মতত্ত্বের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে উপলব্ধির সত্যকে যুক্তির দ্বারা বোঝা এবং মানবেতিহাসের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারার ওপর আগামী দিনে আমরা কোথায় কীভাবে টিকে থাকব, নাকি থাকব না– সেটা নির্ধারিত হবে। আবার একই সঙ্গে এসেছে গরিব মানুষের রাজনৈতিক বা গণরাজনৈতিক ধারা বিকাশের যুগ। গরিব, বঞ্চিত, মজলুম– তাদের রাজনৈতিক ধারা বিকশিত হবে। এখানে গণরাজনৈতিক ধারা বিকশিত করবার পথ হচ্ছে তথাকথিত মতবাদী রাজনীতি থেকে মুক্ত হওয়া এবং গণমানুষের সঙ্গে মিশে, তাদের চিন্তা-চেতনা, তাদের দুঃখ-কষ্ট, তাদের ভাষা তাদের মতো করে বলা শিখতে হবে।
গণরাজনীতির যে ধারা, তাকে শক্তিশালী করার জন্যই আমি বলি, মতবাদের যুগ শেষ হয়ে গেছে। আমি আরও বলি, জাতিবাদের যুগ শেষ। তার মানে, রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের গঠনের যুগ হাজির। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের গঠন করার মধ্য দিয়ে গণমানুষের অভিপ্রায়– গরিব মানুষ, মেহনতি মানুষ, শ্রমিকের অভিপ্রায়কে গণমানুষের সামষ্টিক ও সর্বজনীন অভিপ্রায় হিশাবে হাজির করবার যুগ আমরা বাংলাদেশে বাস্তবায়িত করব। এটাই হবে আগামী গণঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তি। এটা আমি দেখে যেতে পারব কিনা, জানি না। কিন্তু আমি নিশ্চয়ই বলতে পারি, এটাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com