বাকস্বাধীনতার সংকট নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের সংকটে পরিণত হয়। একজন নাগরিক হিসেবে আপনার অধিকার যখন লঙ্ঘিত হয়– তা রাষ্ট্র, সরকার বা কোনো পরিষেবা প্রদানকারী (যেমন– একটি বেসরকারি কোম্পানি); যার দ্বারাই হোক– তখন তার বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার মানুষের থাকে। মতপ্রকাশের অধিকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার। যদি বিশেষ করে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার না থাকে, তবে তা এক ধরনের অবরুদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি করে। মানুষ যখন নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারে না, তখন সে নির্ভয়ে প্রতিনিধিও নির্বাচন করতে পারে না। তখন নানান প্রভাবে সে প্রভাবিত হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো ভয়– এই ভয় যে, আমি বিশেষ কাউকে ভোট না দিলে হয়তো আমার প্রতি অন্যায় আচরণ বা সহিংসতা করা হবে।
সীমার ঊর্ধ্বে নয়
বাকস্বাধীনতারও একটি সীমা আছে। আমি কি কারও সম্পর্কে যা ইচ্ছা তা-ই বলতে পারব? মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে যদি আপনার মানহানি হয়, চাকরি চলে যায় বা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তবে তা একটি অপরাধ। আমার কথা বলার স্বাধীনতা ততটুকুই, যতটুকু আপনার স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব না করে। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, একটি গণঅভ্যুত্থানের পর যখন কথা বলার স্বাধীনতা অর্জিত হলো, তখন এর অপব্যবহার শুরু হয়েছে। যা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে অসত্যের পরিমাণ অনেক এবং অন্যের ক্ষতি করে এমন কথা ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে। সীমা লঙ্ঘন করে গালাগাল, জঘন্য মিথ্যাচার, কুৎসা রটনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছে। কারও রাজনৈতিক মতাদর্শ পছন্দ না হলে, তাকে রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, ব্যক্তিগত আক্রমণ দিয়ে নয়। সব ক্ষেত্রেই সীমার জায়গাটিতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে– হয় সীমাটা জানা নেই, নয়তো জেনেও ইচ্ছা করে লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত পরিসরের প্রশ্ন
যখন ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বত্র বিরাজমান মনে করে অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়া শুরু হয়, তখন তা মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘন করে। যেমন– কে কী পোশাক পরল– হিজাব, প্যান্টের দৈর্ঘ্য ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা হয়রানি করা। গত শাসনামলে যেমন হিজাব পরা নিয়ে হয়রানি হয়েছে, তেমনি আজকে হিজাব না পরা বা অন্য পোশাক নিয়ে বৈষম্য বা সহিংস আচরণ করলে তা আসলে পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়া। হিজাব পরা যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, হিজাব না পরাও তেমনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। পোশাকের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা– এই মৌলিক জায়গাগুলোতে অনুপ্রবেশ বাড়ছে।
একটি জনগোষ্ঠীকে অগ্রসর হতে হলে নানান তর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আপনি যদি বলে দেন, কেবল এটুকুই বলা যাবে, তবে তো জ্ঞানের চর্চা বন্ধ হয়ে যাবে। একাডেমিক চর্চার জায়গা থেকে এটি অগ্রহণযোগ্য। সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো, সমাজের নানান মানুষ– নানান ধর্ম, জাতিসত্তা, লিঙ্গ পরিচয় ও যৌন অভিমুখিতার মানুষ নিয়ে আলোচনা করা। বৈষম্য, অসমতা কেন সৃষ্টি হয়, তা না পড়াতে পারলে আমি আমার কাজের ক্ষেত্র ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার করব। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো, যেখানে নানান জ্ঞান, এমনকি যে জ্ঞানের সঙ্গে আপনি একমত নন, তা নিয়েও কথা বলার জায়গা থাকা।
মেরূকরণের রাজনীতি
গণঅভ্যুত্থান সাধারণত কিছু বস্তুগত কারণ নিয়ে হয়। চব্বিশের গণআন্দোলনেও তা পরিষ্কার ছিল– বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি এবং মানুষের ওপর নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ। পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার নৈতিক ও সব ধরনের অধিকার হারানোর পরই মূলত অভ্যুত্থান সফল হয়। কিন্তু এত বড় গণআন্দোলনের পরপরই সমাজে বিভাজন এবং মেরূকরণ খুবই সাধারণ ঘটনা। কারণ কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো সমাজের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে তাদের নিজস্ব একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রকে মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সেই প্রতিষ্ঠান যখন ভেঙে পড়ে, তখন শূন্যস্থান পূরণের জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান বা নিয়মকানুন থাকে না। তখন এক ধরনের দখল-বেদখলের রাজনীতি শুরু হয়– যেখানে যার যার বয়ানকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলে। এই পরিস্থিতি ঠেকানোর জন্য মধ্যপন্থি উদার রাজনৈতিক দলগুলোর যে রাজনৈতিক প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল, তা ছিল অনুপস্থিত। এর বিপরীতে ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাংগঠনিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তাদের এক অংশের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চললেও একটি অংশকে নানাভাবে পুরস্কৃত করে শান্ত রাখা হয়। এই দমন-নিপীড়নের ভয় সবাইকে ঠান্ডা রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, আর অন্যদিকে এলিট অংশকে টাকা দিয়ে বশ করা হয়েছে, যে টাকা তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এর বিপরীতে বামপন্থি ও প্রগতিশীল অংশটি সংখ্যাগতভাবে অনেক দুর্বল, তবে বয়ান তৈরিতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরও একটি বড় অংশ পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে থাকায় তাদের সংখ্যা আরও কমেছে। অভ্যুত্থানের পর যারা ‘মুজিববাদী বাম’ নন, সেই তরুণ প্রজন্মের বামপন্থিদের একটি বড় সুযোগ আছে। তাদের গড় বয়স কম; কিন্তু তাদের মধ্যে ইনক্লুসিভ এবং সহিষ্ণুতার রাজনীতি চর্চার সুযোগ রয়েছে, যা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু করতে পারে।
প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ অন্তর্বর্তী সরকার
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যারা সরকার গঠন করেছেন, তারা কোন মানদণ্ডে এসেছেন, তা পরিষ্কার নয়। এটি বিপ্লবী সরকার বা জাতীয় সরকার নয়; বরং পরিচিত মানুষজনকে নিয়ে গঠিত একটি সরকার। অভ্যুত্থানে নেতৃত্বকারী মাত্র তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি সরকারের অংশ হওয়ায় অভ্যুত্থানের শক্তি বিভক্ত হয়ে যায়। এর ফলে আহত, শহীদ পরিবারসহ সবার দাবি ও প্রত্যাশা ব্যক্তিনির্ভর হয়ে যায়– কে কত টাকা পেল, কে কত ক্ষমতাশালী হলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের যারা দায়িত্ব নিলেন, তারা বিশেষজ্ঞ হিসেবে ক্ষমতায় বসলেও বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। আমার মনে হয়, সরকার দুর্বল নয়; বরং দুর্বলতার ভান ধরে– যাতে তাদের বেশি দায়িত্ব নিতে না হয় বা বিতর্কের বোঝা বহন করতে না হয়। কিন্তু দেশ চালাতে গেলে বিতর্ক হবেই। উপদেষ্টামণ্ডলীর ভেতরে রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য থাকায় তা সরকারের মধ্যে এক ধরনের টানাটানি তৈরি করেছে।
এক অভূতপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দিনগুলো ছিল এক কঠিন সময়, বিশেষত পার্শ্ববর্তী দেশের ভূমিকা এবং তাদের প্রভাব বিবেচনায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা একটি অভূতপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করেছি। এই সময়ে খুব জরুরি ছিল– ১. অভ্যুত্থানের আহতদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। ২. পূর্ববর্তী সরকারের ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই সরকার সেই বিচার নিয়ে গড়িমসি করেছে এবং অভিযুক্তদের অনেককে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে দিয়েছে। কীসের বিনিময়ে এমনটা হয়েছে, তা জনগণের জানার অধিকার আছে। যতদিন এত বড় হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না ততদিন জনগণের আস্থা তৈরি হবে না।
নারী প্রতিনিধিত্ব এবং বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি
জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কমিশন বা সরকারের বিভিন্ন স্তরে নারী প্রতিনিধির অভাব হতাশাজনক। ক্ষমতায় আসার পর ঐকমত্য কমিশন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছে, নারী প্রতিনিধি বা অন্য সিভিল সোসাইটির সঙ্গে বসেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর দেউলিয়াত্ব এখানেও স্পষ্ট; তারা সংরক্ষিত আসন বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীর জন্য সামান্যতম ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতেও রাজি ছিল না। যে অভ্যুত্থানে ৬৫ শতাংশ নারী সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছেন বলে ধারণা করা হয়, সেই অভ্যুত্থানের পর নারীদের সাইবার বুলিং, হয়রানি ও গালাগাল করে রাজনীতিকে নারীদের জন্য একটি নোংরা জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। কিন্তু এর ফলস্বরূপ নারীদের কোটা বাতিল হয়ে যাওয়া বা কমে আসা একটি ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। কারণ দেশের সব নারী ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নন। গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে আনতে ইতিবাচক ভূমিকা জরুরি। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাঁর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রয়োজন। তাঁর সম্পত্তিতে সমান অধিকার নেই, আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম এবং তিনি বেশির ভাগ সময়ই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক। এই অর্থনৈতিক বাধা দূর করতে নারীদের মনোনয়ন খরচ রাষ্ট্র বহন করুক– এই প্রস্তাবও করা হয়েছিল। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও এনজিওকর্মীদের নিয়ে গঠিত এই কমিশনগুলো তা না করে কেবল টিওআর বা টার্মস অব রেফারেন্সের দোহাই দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় তো কারও টিওআর ছিল না যে তারা জীবন দেবে!
আশার আলো: জুলাই প্রজন্ম
বর্তমান সরকার ও বিদ্যমান ব্যবস্থা মূলত আগের এলিট সিস্টেমেরই ধারাবাহিকতা। শুধু যে এলিটরা আগে সরকারের সঙ্গে ছিল না, তারা এখন বসেছে। এক বছর আগের তুলনায় আমার কনফিডেন্স কমে গেলেও আমার শেষ আশা হলো জুলাই প্রজন্মের ওপর। তারাই বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলেছিল।
এই নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার প্রত্যাশা, তারা যেন অন্তত সহিষ্ণুতার সঙ্গে একে অপরের কথা শুনতে শেখে। তারা যেন শুধু একটি ন্যারেটিভ বা বয়ান নির্মাণে ঝাঁপ না দিয়ে বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করে। যারা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নে একমত; যারা সহিষ্ণুতার রাজনীতি করতে চায়; তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার। তা না হলে সমস্ত অর্জন ব্যর্থ হবে। v