আগামী বছর থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে একই বিষয়ের পরীক্ষা হবে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ (আইসিটি) আবশ্যিক বিষয় এবং বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অভিন্ন বিষয়গুলোতে একই প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী আগের মতোই আলাদা প্রশ্নপত্র থাকবে।
জানতে চাইলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সমকালকে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করা এবং সব শিক্ষার্থীর যোগ্যতা একই মানদণ্ডে মূল্যায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একটি রাষ্ট্র, একটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং একই সিলেবাস হওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন বোর্ডে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডকে এক সুতায় বেঁধেছি, একক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ক্ষেত্রেও বাংলা, ইংরেজির মতো সাধারণ বিষয়গুলোর পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে।’
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জিপিএ বেশি পাওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আগামী দিন থেকে মাদ্রাসা ও স্কুল একই প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে। আলাদা হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব জায়গায় ভর্তি হয় একই বিষয়ে, একই প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়। তাই আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তারপর দেখব, মাদ্রাসায় কেন বেশি জিপিএ পায়।’
এবার ৯টি সাধারণ বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছর থেকে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ কার্যকর করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয়গুলোও অভিন্ন প্রশ্নপত্রের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা ও কারিগরি– তিন ধারার শিক্ষার্থীদের অভিন্ন বিষয়গুলোর মূল্যায়নে একই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও আইসিটির পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো অভিন্ন বিষয়েও একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে। ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের অভিন্ন বিষয়গুলোও এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সিলেবাস অনুসারেই প্রশ্ন করা হবে।
ফলাফলে বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য
শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একই বিষয়ে বিভিন্ন বোর্ডে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে প্রশ্নের ধরন ও কঠিনতার মাত্রায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের অর্জিত নম্বর ও ফলাফলের তুলনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু হলে সব বোর্ডের শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। ফলে মূল্যায়নে সমতা এবং ফলাফলের তুলনাযোগ্যতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশ্নপত্র অভিন্ন করলেই শিক্ষার সব বৈষম্য দূর হবে না। পাঠদানের মান, শিক্ষক সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতিও ফলে প্রভাব ফেলে। তাই অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রেও সমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মনিনুর রশীদ সমকালকে বলেন, একই প্রশ্ন হলে একই ধরনের মান যাচাই করা যাবে, এটা এক অর্থে সত্য। তবে তার আগে দেখতে হবে, স্কুলের মতো মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই মানের শিক্ষক আছেন কিনা। আমরা সবাই জানি, মাদ্রাসাগুলোতে সাধারণ শিক্ষাধারার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য শিক্ষকের তীব্র সংকট। সেখানে শিক্ষা উপকরণসহ রিসোর্সেরও অভাব। সুতরাং শুধু একই প্রশ্ন করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য দূর হয়ে যাবে না; মূল্যায়নও একই মানের হতে হবে। সে জন্য বিষয়ভিত্তিক একটি মূল্যায়ন মানদণ্ড (রুব্রিক্স) তৈরি করে তার ওপর পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী বছর থেকে পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন বিষয়গুলোর মূল্যায়নে বড় পরিবর্তন আসবে। তবে কোন কোন বিষয় অভিন্ন প্রশ্নপত্রের আওতায় থাকবে এবং সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরীক্ষা পরিচালনায় কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় আগেভাগেই স্পষ্ট করতে হবে।