নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় এস্টাবলিশমেন্টের নৈতিক অবমাননা উদোম করে দিয়েছে। কোটিপতিদের অনুদান, মিডিয়ার সংশয়, ইসলামবিদ্বেষ, পক্ষান্তরে তাঁর প্রতি নিজ দলের নেতাদের বিদ্বেষের বিরুদ্ধে মামদানির এ জয় হয়েছে। তাঁর জয় একটি সংকেত– সম্পদ ও প্রভাবের পুরোনো পাটিগণিত আর ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না।
কয়েক দশক ধরে ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় অভিজাতরা অর্থদাতা ও লবিস্টদের অগ্রাধিকার প্রদানে সহানুভূতির ভাষায় নিজেদের জড়িয়ে রেখেছে। মামদানির প্রচারণা স্পষ্টতা ও সাহসের সঙ্গে সেই দ্বন্দ্ব উদোম করেছিল। তিনি বিমূর্ততার কথা বলেননি, বরং নাগরিক জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে এমন মৌলিক প্রশ্নের কথা বলেছেন, যা সহজে বোধগম্য। তিনি বলেছেন, এই শহরে বসবাসের সামর্থ্য কে রাখতে পারে? তাঁর উত্তর ছিল সহজ ও নৈতিকতাসম্পন্ন। তিনি জনসাধারণের জন্য নির্মিত আবাসন, ভাড়াটিয়াদের মর্যাদা সুরক্ষা দেওয়া, সর্বজনীন শিশুযত্ন ও বিনামূল্যে সিটি বাসের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, শহরটি তাঁর নাগরিকদের; কেবল ডেভেলপার, ব্যাংকার ও দাতাদের নয়।
যখন কুওমোর সমর্থকরা মামদানিকে সমাজতান্ত্রিক বলে সমালোচনা করেছিলেন, তখন পুরোনো ভয় দেখানোর কৌশল ব্যর্থ হয়েছিল। নিউইয়র্কের ভোটাররা বুঝতে পেরেছিলেন, ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বরা যাকে মামদানির ‘কমিউনিজম’ বলে বর্ণনা করেছেন, অথচ তা জনসাধারণের সম্পদ, যাতে জনসাধারণের চাহিদা পূরণ করে, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।
গাজায় ইহুদিবাদের সমালোচনা এবং ইসরায়েলি নৃশংসতার নিন্দা করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও আনা হয়েছিল। এই অভিযোগ এতটাই অবাধে প্রয়োগ করা হয়েছিল, এর নৈতিক ওজনও কমে গেছে। ভোটাররা এর নেপথ্যে কী ছিল তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
উভয় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিউইয়র্কবাসী দেখিয়েছেন, নৈতিক স্পষ্টতা ও বাস্তব সহানুভূতি রেডিক্যাল কিছু নয়; বরং এগুলো প্রয়োজনীয়। কুওমো এবং তাঁর সহযোগীরা প্রকাশ্যে বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের জন্য সূক্ষ্ম বিষয়াদি ত্যাগ করেছেন। মামদানির বিজয় তাদের জন্য একটি তিরস্কার হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যারা তাঁর বিশ্বাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন। আর নির্বাচকমণ্ডলীর জন্য একটি প্রমাণ হিসাবে দাঁড়িয়েছে, যারা ভয়ে অটল এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে কুসংস্কারে ক্লান্ত।
মামদানি এমন কিছু করেছিলেন, যা খুব কম মার্কিন রাজনীতিবিদই করার সাহস দেখিয়েছেন। তিনি স্থায়ী বৈষম্যের ওপর নির্মিত ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের ধারণাকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেন। গাজায় আক্রমণকে গণহত্যা হিসেবে তিনি নিন্দা করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, কেবল কিছু মানুষের জন্য ন্যায়বিচার হতে পারে না। বিপরীতে কুওমো সুবিধাবাদের ইঙ্গিতে জোরালোভাবে গণহত্যার জন্য বিচার হলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে রক্ষা করার প্রস্তাব দেন।
মামদানির বিজয় হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বিদ্রোহের চূড়ান্ত পরিণতি। তরুণ ও প্রগতিশীলরা এই কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন– ব্যবস্থাটি অসম্পূর্ণ হলেও তাকে মেনে চলতে হবে। তারা তাদের ভবিষ্যৎ ছাত্র ঋণের কাছে বন্ধক দেওয়া, তাদের বেতন ভাড়া দিতে দিতে গিলে ফেলা এবং তাদের আদর্শ নৈতিক আপসকে প্রজ্ঞার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা রাজনীতিবিদদের দ্বারা প্রত্যাখ্যান হতে দেখেছেন। তারা আর প্রতীকী উদারনীতি বা ভাগ করা মূল্যবোধের খালি শব্দভান্ডারে সন্তুষ্ট নন। তারা এমন একটি রাজনীতি চান, যা সত্য কথা বলে এবং তার ওপর কাজ করে। তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই রয়েছে নবায়নের সূচনা।
মামদানিকে নির্বাচিত করে নিউইয়র্কবাসী তাদের গণতন্ত্রকে যারা বিক্রি করেছিল, তাদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করেছে। তারা জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছে– নীতি এখনও ক্ষমতাকে পরাজিত করতে পারে; বিবেক এখনও পুঁজিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং যে দল ওয়াল স্ট্রিটের সেবা করে এবং সত্যকে ভয় পায়, তারা জনগণের পক্ষে কথা বলার ভান করতে পারে না। যদি এই বিজয় ডেমোক্রেটিক প্রতিষ্ঠানকে তার নৈতিক ঘুম থেকে জাগিয়ে না তোলে, তবে এটি তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলবে।
জিয়াদ মোতালা: হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-এর আইন বিভাগের অধ্যাপক; আলজাজিরা
থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম