সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ধ্বংসের পথে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভিটা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

কীর্তিমান ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো আজ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার উদ্যোগ নেই । রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে এই কৃতীপুরুষের জন্মভিটা। এখানে একটি স্মৃতি জাদুঘর বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি এই সুরসম্রাটের জন্ম ও মৃত্যু দিবসও সঠিকভাবে পালন করা হয় না। উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল আলম। পিতা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁ এবং মাতা সুন্দরী খানম।

বিশ্বমঞ্চে শাস্ত্রীয় সংগীতকে মহিমান্বিত করে তিনি সুরসম্রাট পদ্মভূষণ দেশীকোত্তমসহ দেশি-বিদেশি অজস্র সম্মাননায় ভূষিত হন। পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আলী আকবর খানের মতো বিশ্ববরেণ্য শিষ্য তৈরি এবং মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা এই মহান সাধকের কল্যাণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও নিজ জন্মভূমিতেই তিনি চরম অবহেলিত। সম্প্রতি নীরবে-নিভৃতে পার হয়েছে এই ক্ষণজন্মা সাধকের ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো বড় আয়োজন ছিল না। কেবল স্থানীয়ভাবে সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ ডিগ্রি কলেজের উদ্যোগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা হয়।

আশির দশকে শিবপুরে আলাউদ্দিন পল্লি গড়ার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের নামে ২২ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হলেও সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও কেবল পরিদর্শনের নথিতেই আটকে আছে। ওস্তাদজির নিজ হাতে শিবপুর গ্রামে ১৮৯৮ সালের ৭ মার্চ নির্মিত, খাঁ পাড়া জামে মসজিদ সংস্কারের অভাবে বিনষ্ট এবং পৈতৃক ভিটা ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও আলী আকবর খানের উদ্যোগে ঐতিহাসিক কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। অথচ সেই মহান সুরসাধকের স্মৃতিকেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক মানের মিউজিক একাডেমি গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের দাবি আজও অধরা। তার পিতা ও ভাইয়রাও সংগীত সাধনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সোনাউদ্দিন খাঁ, আফতাব উদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ এবং আয়েত আলী খাঁ এই পরিবারের তিনজন শাস্ত্রীয় সংগীতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বড় ভাই আফতাব উদ্দিন খাঁ ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক ও বহুমাত্রিক বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, ময়লা গানের সুরকার, যার কাছে শৈশবে আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতে হাতেখড়ি হয়। শিবপুরে তার বাবা-মা ও বড় ভাই আফতাব উদ্দিনের কবর রয়েছে। ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারে এই মহান সাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকার স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঠিক ইতিহাস জানে না। ২০১৫ সালে একদল দুষ্কৃতকারীর তাণ্ডবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন ও জাদুঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যা তার স্মৃতি সংরক্ষণে একটি বড় আঘাত ছিল। সরকারিভাবে নবীনগরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিন পালন না হওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ একাডেমির সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো জন্ম তারিখের সর্বসম্মত নথি নেই। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি জাদুঘর বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাজের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি দল এসে স্থান দেখে গেছেন। তখন আমরা সহায়তা করেছি। পরবর্তীতে কোনো আপডেট তথ্য আমাদের জানা নেই। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এলেই আমরা দায়িত্ব পালন করব। উপজেলা প্রশাসনও চায় শিবপুরে স্মৃতি জাদুঘর বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠুক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আরজু বলেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা নবীনগরের নন। তিনি পুরো উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক আলোকোজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তিনি আমাদের অহংকার। তাকে অবহেলা করা মানে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে অস্বীকার করা। স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই কিংবদন্তির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এখন সময়ের দাবি।

নবীনগর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু কামাল খন্দকার বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বলা হয় সংস্কৃতির রাজধানী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলোÑএই মাটির কীর্তিমান সন্তান ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো আজ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে ধ্বংসের মুখে। তার জন্মভিটায় একটি স্মৃতি জাদুঘর বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। শিবপুরে তার জন্মভিটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিক একাডেমি এবং স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে দেশ-বিদেশের গবেষক ও শিল্পীরা আসতে পারেন এবং নতুন প্রজন্ম ওস্তাদজি সম্পর্কে জানতে পারে। নবীনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি হোসেন শান্তি আক্ষেপ করে বলেন, সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো বিশ্বখ্যাত সংগীতসাধকের স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের কাজ বিলম্বিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য বড় ক্ষতি। এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি দৃশ্যমান।

ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ স্মৃতি সংসদের সভাপতি রানা শামীম রতন বলেন, নবীনগরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিন ৮ অক্টোবর বহু বছর আগে থেকেই পালিত হয়ে আসছে। এবারও মসজিদে দোয়া করানো হয়েছে। সরকারিভাবে জন্মদিন পালন না করা বেদনাদায়ক এবং নিজ জন্মভূমিতে ওস্তাদজির প্রতি এমন অবহেলা অত্যন্ত দুঃখজনক।

খুঁজুন

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com