পাখিদের মৃত্যু হ’লে/ কোথায় যায় পাখি?/ তাদের মেধাবী সাদা হাড়, হাড়ের ভিতর/ বাতাসের অবিরাম খেলাধুলা,/ কখন কীভাবে শেষ হয়?/ পাখিদের শরীরের প্রতি শিকারির প্রবল উৎসাহ/ খাদ্যবিলাসীর লোভ পিপাসার রূপ নিয়ে ঝরে।/ সব মাংস মানুষের কাজে আসে?/ মাংসভোজী পশুদের?/ নাকি তারাও তৃণের মতো মিশে যায়?/ মানুষের মতো মাংসপ্রিয় শকুন, কুকুর/ পাখির নরম মাংস নিয়ে জিভ দিয়ে খেলা করে?
পৃথিবীতে কত কত পাখি ছিল।/ এই সব পাখি হয়েছে কি মাটির আহার?/ ভীষণ ক্ষুধার্ত মাটি অতিরিক্ত লোভী,/ নদীও নিয়েছে টেনে মৃত পাখি উজানে, ভাটিতে।/ ইদানীং মৃত পাখিগুলো আমাকে পেয়েছে বাগে।/ আমাকেই মানুষের যোগ্য ভেবে নিয়ে/ কেবল আমাকে অনুযোগ, নালিশ শোনায়,/ আমি বলি,/ ‘আমিও পাখির মতো ছাড়পত্রহীন,/ ঠিকানাবিহীন উড়ে যাব অনন্তের পথে।’/ পাখিরাও হাসতে পারে, হেসে ওঠে অবিকল মানুষের মতো।/ দক্ষিণের নিরামিষভোজী জনৈক ব্রাহ্মণ/ এই গল্প করেছিল গত পূর্ণিমায়।
কবিতাটি অনেকগুলো প্রশ্ন তৈরি করে। গবেষণাবিমুখ আমাকে প্রায়শই কোনো কোনো কবিতা গবেষক হয়ে উঠতে বলে। আমি সামাজিক গবেষণা, গুণগত গবেষণা ওসবের কথা ভেবে পালাতে থাকি দূরে, বহুদূরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমাকে খপ করে ধরে ফেলেন তবক দেওয়া পানের রচয়িতা কবি আসাদ চৌধুরী। আমি সসম্মানে তাঁকে বিদায় জানাই যদিও তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া বড়ই মুশকিলের কাজ। দ্বিধান্বিত আমাকে বুঝতে পেরে কিছুটা আড়াল নেন কবি। কিন্তু ততোধিক ঢাল, তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে আসে কবিতা, হাতকড়া পরায় হাতে পায়ে। এমন দিনের সংখ্যা কম নয়, কেননা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি তো লেখা হয়েছে কবিতাই। অদ্যকার প্রধান কবিতা ‘পাখিদের মৃত্যু হ’লে’। সপ্তর্ষি মণ্ডলের মতো সাতটি প্রশ্ন আছে এই কবিতায়। অদৃশ্য আছে ততোধিক। জিজ্ঞাসাগ্রস্ত বোধের ক্যানভাসে যথেষ্ট ক্ষত অথবা ডটচিহ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় কবিতাটির শিরোনাম। এই যে এত এত পাখির কোলাহল প্রেম বেদনাবিধুর বউ কথা কও, টুকটুকে লাল ঠোঁটের টিয়ে– খোকা বাবুর বিয়ে হবে টোপর মাথায় দিয়ে, এই যে সুন্দর থেকে সুন্দরতম মৌটুসি, চড়ুই, কাকাতুয়া, নীরব নির্জনতায় গুণটানা ঘুঘু, অপেক্ষায় অধীর দীঘল বিলের বুকে কুঁজবক ভালো বাস না তুমি ওদের বলো, বাসই তো। আছে নাকি কেউ পাখিকে বাসেনি ভালো এ জগতে। জীবনের অমৃত সুধারসে সিঞ্চিত মাধুরীকে তো শেষ পর্যন্ত পাখি নামেই ডাকো। লালন সাঁইজির ভাষায় ‘পাখি কখন জানি উড়ে যায়, একটা বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়…’; গানটি শুনতে থাকলে যেন আপন জীবন পাখিটিকে অদৃশ্য সীমানায় উড়ে যাওয়ার অনুভূতি উপলব্ধ হয়। শব্দের সীমাবদ্ধতায় সেই সুর আমি শোনাতে পারছি না বটে তবে কথা কি জানো, তুমিও তো একটা সুন্দরতম পাখি। মানুষ যেন পাখিরূপটাকেই বেশি কল্পনায় ধরে, তাইনা। ও পাখি পাখি কই যাও তুমি? কবি পাখি বলো তো তুমি কোথায় চলে গেলে? পাখি হবার এই একটা সুবিধা, উড়াল দেওয়া যায় যে কোনো সময়। আর উড়াল না দিতে পারা পাখির বেদনাও তো কম নয়। মায়া অ্যাঞ্জেলোর কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘আই নো হোয়াই দ্য কেইজ বার্ডস সিংস’; মুক্ত আর বদ্ধ পাখির ডাকশব্দের সূক্ষ্ম হৃদয় হন্তারক কারণ তুলে ধরা হয়েছে এই কবিতায়। বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের ‘চরাচর’ সিনেমায় দেখানো হয়েছে বনের পাখিকে বুদ্ধি খাটিয়ে কী করে শিকার করা হয় এবং সেই শিকার করা পাখি বিক্রেতার চক্র যে কোনো কালোবাজারি চক্র অপেক্ষা অধিক অন্ধকারাচ্ছন্ন। বনের পাখিকে খাঁচায় পুরে রাখার বিনোদনে মানুষকে নিরুৎসাহিত করে চলচ্চিত্র ‘চরাচর’। যে কথা বলছিলাম, কবি জিজ্ঞেস করেছেন, ‘পাখিদের মৃত্যু হ’লে কোথায় যায় পাখি?’ একটা অনিবার্য প্রশ্ন অথচ এতকাল কি কারও মাথায় আসেনি? আসলেই তো কোথায় যায় পাখি? কেউ কি জানেন, এই যে ঝাঁক ঝাঁক পাখি একা পাখি, দোকলা পাখি শেষ জীবনে ওরা কোথায় গিয়ে মরে যায়? পাখি কি খুব অভিমানী? সে কি খুব গোপন কোনো জঙ্গলের শেষ সীমানায় গিয়ে সমর্পণ করে নিজেকে? কোনো পাহাড়ের গুহায় নাকি কোনো সাগরের বুকে? জানি তুমিও দেখোনি কোনো পাখির শব মৃতদেহ। বিজ্ঞ গবেষকরা বলেন আবেগ দিয়ে গবেষণা হয় না। তাতে আমিও একমত। আবেগ দিয়ে গবেষণা হয় না। কিন্তু এর দায় কেবলই কবির। ঐ যে বোধের ক্যানভাসে কবিতার একটিমাত্র লাইন অজস্র প্রশ্নবোধক ডট নিয়ে ভাবনায় যে দ্যোতনা তৈরি করে তার কোনো বিহিত ব্যবস্থা করতে আমি অপারগ।
‘তাদের মেধাবী সাদা হাড়, হাড়ের ভিতর/ অবিরাম খেলাধুলা, কখন কীভাবে শেষ হয়?’
পাখিদের হাড় মেধাবী হয়, এ কথা কে কবে ভেবেছিলেন আমার জানা নেই। ‘হাড়ের ভিতর বাতাসের অবিরাম খেলাধুলা ’…শব্দবন্ধ, ভাব ও চিত্রের এক অপূর্ব বৈভব সৃষ্টি করতে সমর্থ হয় পাঠকের মনে। পাঠক এগিয়ে যেতে থাকে পাখিদের সাথে। একটি পাখি থেকে একাধিক পাখির গান, বসে থাকা, ফড়িং খুঁটে খাওয়া, মাছের জন্য অপেক্ষা, বাচ্চার ঠোঁটে খাবার উগলে খাওয়ানো অথবা বিচিত্র দৃশ্যের জাঁতাকলে ফেলে ঘোরাতে থাকে তোমাকে। তারপর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের ডিসেকশন করেন কবি। মানুষের লোভ আর লালসার কাছে, আকাঙ্ক্ষার কাছে মুক্ত নয় কোনো কিছু। কবি বলেন, ‘সব মাংস মানুষের কাজে আসে?/ মাংসভোজী পশুদের?/ নাকি তারাও তৃণের মতো মিশে যায়?/ মানুষের মতো মাংসপ্রিয় শকুন, কুকুর/ পাখির নরম মাংস নিয়ে জিভ দিয়ে খেলা করে?’…
নিজের গায়ের মধ্যে রিরি করে ওঠে, পেটের ভিতর থেকে উগলে আসে বমি। তুমি কি পারবে আর কোনো দিন কোনো শিকারি পাখির মাংস তুলে নিতে পাতে অথবা মুখে। হয়তো পারবে না। যদি পারো তো ব্যর্থ কবিতার কবি ও কবিতা। ব্যর্থ মানুষের মনুষ্যত্ব। পাখিদের প্রতিনিধিরা কবির কাছে তাদের অভিযোগ জানায়, নালিশ জানায়। অন্তরে বেজে ওঠা পাখি ও প্রকৃতির বেদনায় স্থির থাকতে পারেন না তিনি। কবি তখন বলেন, ‘আমিও পাখির মতো ছাড়পত্রহীন,/ ঠিকানাবিহীন উড়ে যাব অনন্তের পথে।’…
খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি শুনতে পাচ্ছি তোমার শেষ নিঃশ্বাসের গান। অনেক রোদ্দুরের ভিতর ভোঁ ভোঁ করে ছুটে গিয়েছিলাম। তোমার কাছে। আর কোনোদিন যাওয়া হবে না। এমন করে ডাকও পাব না কোথাও কোনোখানে। তোমাকে উদযাপনের নেশায় নাকি অন্য কিছু জানা নেই। তুমি তো তোমার কবিতার মতো আদর্শ মুমূর্ষু হয়ে উঠেছিলে স্বজনের কাছে, সন্তানের কাছে এবং বাংলাদেশের কাছে। হয়তো তুমি ঘুমিয়ে আছো পৃথিবীর অন্য কোনো মমতালয়ে তাতে ক্ষতি নেই। তোমার সাদর সম্ভাষণ রচনা চলছেই প্রিয় কবি…
‘রাতের তন্দ্রা চমকে ওঠে/ কে যেন নেই।/ গাছের পাতা ঘুমিয়ে পড়ে/ ভালো-মন্দের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে/ মনের মধ্যে নড়েচড়ে শতেক কথা,/ সাদাসিধে এই মানুষটা/ হঠাৎ কেমন চলে গ্যালো।’…
তোমার কবিতার লাইনের মতো করেই তুমি কেমন করে চলে গেলে তাই ভাবি। ভাবি তুমি আছো। আসাদ চৌধুরীর কবিতায় কোনো গিমিক নাই, কলাকৌশলের দৌরাত্ম্য নেই; যা আছে তা হলো খণ্ড খণ্ড মুহূর্তকে গভীর মমতায় বিস্তৃত করার প্রয়াস। শিকার হওয়া পাখির মর্মবেদনা,
মানুষের ভয়াল অমানবিকতা, মৃতদেহদের অব্যক্ত কথোপকথন, একটি তৃণের নিরহংকার শুভ্রতার বিপরীতে অথবা মানুষের অকার্যকর অহংবোধকে তিনি উপস্থাপন করেন যথাযথ বিবেচনামতো; ঠিক যে রকম মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন। সে রকমই রইলেন কবিতায়। যেন তাঁরই প্রতিনিধি গেয়ে উঠছে গান এমত ভাষায়,
‘কিছুই থাকে না, না মানুষ, না কীর্তিকলাপ মানুষের।/ অথচ কী অহংকার মানুষের স্পর্ধা ও দর্পের সামনে প্রকৃতি ভীষণ অসহায় হয়ে আছে।’ …
‘মেঘের জুলুম, পাখির জুলুম’ কাব্যগ্রন্থের ১. পাখিদের মৃত্যু হ’লে, ২. রাতের তন্দ্রা চমকে ওঠে, ৩. মৃতদেহ চুপচাপ থাকে, ৪. কিছুই থাকে না— কবিতা চারটি থেকে উদ্ধৃত লাইনগুলো নেওয়া হয়েছে।