রঙ কি কেবলই ক্যানভাসে বিছিয়ে রাখা নিছক উপাদান, নাকি তা মানুষের অবচেতন মনের গোপন রূপকথা? ইট-কাঠ-কনক্রিটের নগরে যখন যান্ত্রিক ব্যস্ততা মানুষকে নিঃশ্বাসের অবকাশ দেয় না, ঠিক তখনই শিল্পের ছায়ায় কিছুটা সময় থমকে দাঁড়ানোর আকুলতা তৈরি হয়। আজ থেকে শুরু হচ্ছে প্রদর্শনী — ‘আকাশ মাটি জল’। লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি কেবল দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্যের মেলা নয়, মানুষের সত্তা, অবচেতন আবেগ এবং প্রকৃতির শাশ্বত উপাদানের এক গভীর রূপক আখ্যান।
গ্যালারিতে প্রবেশের পর দর্শকদের প্রথম দৃষ্টি কাড়ে এর ভাস্কর্যগুলো, যা মানবমনস্তত্ত্বের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুকে চমৎকারভাবে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি ভাস্কর্যে দেখা যায়, এক চপল বালিকা বাতাসের আনন্দে পোশাক উড়িয়ে দুটি ছোট ছাগলছানাকে সাথে নিয়ে অদম্য গতিতে ছুটে চলছে। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই শৈশব ও চঞ্চলতা হলো মানুষের আদিম, নিষ্পাপ অবচেতন মন-যেখানে কোনো মানসিক জটিলতা, সামাজিক শৃঙ্খল বা প্রাপ্তবয়স্কতার দায়ভার নেই; আছে কেবল অদম্য স্বাধীনতা আর জীবনের জীবন্ত স্পন্দন। অথচ ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অপর ভাস্কর্যটি এক থমকে যাওয়া বিষাদের গল্প বলে। কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে বসে থাকা এক নারী, যার মাথা ক্লান্তি আর অবসাদে পেছনের দিকে হেলে পড়েছে, আর কোলে বা হাতে থমকে আছে একটি বই। এটি যেন আধুনিক নগরজীবনের তীব্র একাকীত্ব, মানসিক ক্লান্তি এবং বাহ্যিক জগতের কোলাহল ছেড়ে নিজের ভেতরে গুটিয়ে যাওয়ার এক করুণ মনস্তাত্ত্বিক রূপচিত্র। একই উপাদানে একদিকে জীবনের অপ্রতিরোধ্য গতি, অন্যদিকে অস্তিত্বের নিস্তব্ধতা-ভাস্কর্য দুটির এই তুলনামূলক বৈপরীত্যই দর্শককে এক গভীর দর্শনের সামনে এনে দাঁড় করায়।
ভাস্কর্যের কাঠিন্য পেরিয়ে ক্যানভাসগুলোর দিকে তাকালে মানুষের সুপ্ত চেতনার অন্য এক রূপ উন্মোচিত হয়। গভীর বেগুনি, মেজেন্টা আর সবুজের অপূর্ব মেলবন্ধনে গঠিত একটি ক্যানভাসে জ্যামিতিক নকশার মাঝে ভাসমান মাছ ও লতাপাতার ছবি দেখা যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘মাছ’ হলো মানুষের অবচেতন বা সুপ্ত মনের গভীরতার প্রতীক। জ্যামিতিক রেখার কাঠিন্য ও জৈবিক রূপের এই সহাবস্থানে শিল্পী মানুষের যুক্তি ও আবেগের চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশেই ঝুলে থাকা অন্য এক ক্যানভাসে রাজত্ব করছে গাঢ় সবুজ ও আলোর এক মহাজাগতিক চক্র বা ‘মান্ডালা’। সবুজের অসীম গভীরতায় এক-চতুর্থাংশে ঠিকরে বের হওয়া হলুদ আলো আর ভেসে থাকা পাতা যেন জীবন, সময় ও পুনর্জন্মের শাশ্বত নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি, কাঠখোদাইয়ের নরম ছাপচিত্রে ফুটানো হলুদ ফুল ও সবুজ পাতা দর্শককে নগর সভ্যতার ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির আদিম স্নিগ্ধতায় ফিরে যাওয়ার পথ দেখায়।
দেশের সাতজন প্রতিভাবান নারী শিল্পীর যৌথ প্রয়াসে এই অনন্য শিল্পযজ্ঞ প্রাণ পেয়েছে। জোছনা মাহবুব, হোসনে বানু ছোটনা, জেসমরিনা হক, মণিদীপা দাসগুপ্ত, মুক্তি ভৌমিক, ফাহমিদা এনাম কাকলি এবং নার্গিস আক্তার পুনম-এই সাত শিল্পীর নিপুণ তুলি ও ভাবনায় আকাশ, মাটি আর জল হয়ে উঠেছে মানুষের ভেতরের সত্তাকে চেনার মাধ্যম।
আজ শুক্রবার বিকেলে চিত্রশিল্পী কনকচাঁপা চাকমা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিল্প সমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও শিল্পানুরাগী গীত্যারা দেবপ্রিয় দত্ত। ভূমি গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান সাইফুর রহমান লেলিনের সুনিপুণ আয়োজনে চিত্রকলার এই অনুষ্ঠানটি নিছক দেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ভাবনার এক খোরাক জোগায়। ‘আকাশ মাটি জল’ তাই কেবল প্রদর্শনী নয়, এটি নাগরিক ক্লান্তি ভুলে নিজের ভেতরের হারানো শৈশব আর নিভৃত একাকীত্বকে ছুঁয়ে দেখার এক কাব্যিক নিমন্ত্রণ।
আজ ৯ অক্টোবর প্রদর্শনীর প্রথম দিন। প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।