সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শামসুর রাহমান: টাইটানের ‘আশ্চর্য বিষাদ’

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার ‘পোয়েতা মাগনুস’, কবিকুলশ্রেষ্ঠ। এটা নেহাত কথার কথা নয়, সত্যবাচন। একই সঙ্গে তাঁকে বলা যায় ‘পোয়েতা ইনদিভিদুয়ালিতাতিস’ বা ব্যক্তিসত্তার কবিও। আমাদের এখানে আধুনিক কবিতা লেখার তিনিই প্রথম চিন্তাস্থপতি। একই সঙ্গে বলা বিধেয় যে, তিনিই প্রথম ‘পোয়েট্স পাবলিক পানসোনা’ বা জনগণের নিকট কবিসত্তার প্রকাশিত রূপ, যা পরবর্তীকালের প্রজন্মকে কবিতামুখী করার অনেকটা দায়িত্ব পালন করেছে। সুতরাং শামসুর রাহমান একজন yeitgeist বা যুগন্ধর কবি।
অনেকদিন আগে, সেই ১৯৬৩ অব্দে প্রকাশিত ‘রৌদ্র করোটি’ কাব্যগ্রন্থে তাঁর একটি কবিতা আছে ‘দুঃখ’ নামে, যেখানে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এক ‘রোমান্টিক বহিঃস্থিত’ কবিকে, যিনি রোমান্টিক ও আধুনিক কবিতার সীমান্তভূমির অন্তিম নীরবতায় স্থানু হয়ে বসে থাকেন কোনো অভাবিত বোধের বিচ্ছেদে নয়, বরং বিষণ্ণতা ও অসুস্থতার একটি ধ্রুব রংকে উন্মোচন করতে, যা তাঁর শিরায়-শোণিতে ধাবমান অশ্বের মতো
দৌড়ে যেতে চায়। প্রকৃতই আমরা অনুধ্যান করি সেই ব্যক্তিক যন্ত্রণাবোধকে যার, চেতনাটি রোমান্টিক আর উদঘাটনটি আধুনিক। রোমান্টিকরা দুঃখকে মহিমাময় ভাবতেন, ভাবতেন কবির জন্মই হয় দুঃখকে বরণ করা ও মহিমান্বিত করার জন্য; আর আধুনিকতাবাদীরা দুঃখকে বিষাদে পরিণত করেন, রূপায়িত করেন যন্ত্রণাকে ফলাফলহীনতার তীব্রতম অনুভূতিতে। এ দুঃখ বিষাদময় ও নীল, জলরঙে যেন আঁকা হয়েছে তার চেহারা ও সমগ্র
অবয়ব। একটি ফলাফলহীনতা, যা বিমূর্ত কিন্তু অনিবার্য, অদৃশ্য অথচ অন্তর্গত। দুঃখকে মনে হয় ব্যাপ্ত ও বিধুর, এ যেন কবির অন্তঃপুর ও অন্তস্তলে প্রসারিত; আমরা বুঝি এর দুর্মর অবশ্যম্ভাবিতা, যার ঘনিষ্ঠ ছায়ায় ঘুরে ওঠে আধুনিক মনের প্রপেলারটি:
কখনো না-দেখা দূর আকাশের
মিহি বাতাসের
সুন্দর পাখির মতো আমার আশায়
হৃদয়ের নিভৃত ভাষায়
দুঃখ তার লেখে নাম।
আসলে এসবই পূর্বনির্ধারিত নিয়তি, লেখক-জীবনের এক অস্তমিত অনুরাগ, যেখানে তিনি স্বাভাবিক ও স্বতশ্চল। এর গভীরেই তাঁর বিস্তার ও উড্ডয়ন।
এ হলো সেই মহান ইকারুসের পূর্ববোধ, যা প্রতিটি বিশুদ্ধ কবিরই কাঙ্ক্ষিত। লেখক-জীবন ইকারুসের মতোই এক উড্ডয়ন ও আত্মধ্বংসের জীবন, যেখানে আনন্দের  স্বাধীনতার ভেতরে জন্ম নেয় দুঃখ ও পতন। শামসুর রাহমান তা জানতেন আর তাই তিনি দুঃখকে দেখেন স্ফটিক-সৌন্দর্যে, জীবাশ্মের রূপে মহনীয় অনস্বীকার্যতায়। শৈল্পিক জীবনের শুরুতেই তিনি এই সম্ভাবনাসূত্রটিকে ধরতে পেরেছিলেন। তাই প্রথম কাব্যগ্রন্থের ‘অপাঙ্‌ক্তেয়’ কবিতায় বলে দিয়েছিলেন সেই মহৎ মীমাংসিত বাণীটি, যা প্রতিটি কবিরই এক প্রতিজীবনী:
জীবনকে সহজ নিয়মে নেওয়া যেত প্রথমত,
কিন্তু তবু জ্যামিতির নেপথ্যে মায়াবী গুঞ্জরণে
মজেছি স্বতই দুঃখে অর্থ থেকে অর্থহীনতায়।
খুব অসাধারণ সরলবাচনের মধ্যে আমরা কূটাভাস লক্ষ্য করেছি, যা লীন হতে চাচ্ছে ভ্রান্তিহীন পরম ব্যঞ্জনায়। প্রথমেই বলেছেন তিনি সাধারণ জীবনকে পরিত্যাগের কথা, যা নিজেই ভাস্বর করে দেয়

কবিজীবনকে, যে জীবন গাণিতিক অগ্রগমন ও নিয়মে বন্দি নয়,—তা ব্যতিক্রম ও বেদনাজনকভাবে অন্যরকম। কিন্তু দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিটি আপাত দুর্বোধ ও হেঁয়ালিময় মনে হতে পারে: ‘জ্যামিতির নেপথ্যে মায়াবী গুঞ্জরণে’ মজার অর্থ আর কিছুই না ব্যতিক্রম জীবনের অসহনীয় আবর্তে মজা, কারণ তিনি ত্যাগ করেছেন গাণিতিক জীবন, যা পুনঃপুন ধারাবাহিকতায় আবর্তিত ও ক্লিন্ন। জ্যামিতিক প্রচ্ছায় হলো স্বনির্মিত অর্থহীনতার আবর্তন—যখন ব্যক্তিজীবনের উদ্ভটত্বের শিকার হয়। খুব সম্ভবত কবিতাটি লেখার সময় রাহমান আক্রান্ত হয়েছিলেন আলব্যের কামু কথিত অ্যাবসার্ডিটিতে, যার ফলাফল হিসেবে দানা বাঁধে এই নান্দনিক অর্থহীনতা। জীবন সম্প্রসারিত হচ্ছে, স্থানান্তরিত হচ্ছে; আমরা সবাই দণ্ডিত পুরাণের সিসিফাসের মতোই, যা নিষ্ফল নয় আবার ব্যর্থও নয়, তা আসলে ফলাফলহীন। আমরা খুব সফলভাবেই সক্ষম হই বুঝতে যে, শামসুর রাহমান এ বঙ্গে বীজ বপন করেছেন আধুনিকতার, এবং এর অনুপূরক কয়েকটি প্রপঞ্চের: অস্তিত্ববাদ ও নিরর্থকতাবাদের।
আমরা জানি অধিকাংশ জীবন, জীবনের নিয়মনীতি কিছুরই অর্থ প্রকাশ করে না। আসলে আমরা বেঁচে থাকি মূল্যহীনতার মূল্যারোপ করে। এ এক সংবেদনা—যেখানে কবিরা অসহায়, তারা বুঝে ফেলেন সেই তাৎপর্য ও বেদনাকে, যাকে ঘিরে স্থির অনিবার্যতায় দোল খায় জীবন। কবি প্রশ্নমুখী হন:
আমাকে গ্রহণ করো তোমাদের নিকানো উঠোনে
নারী আর শিশুর ছায়ায় আঁকা রক্তকরবীতে।
আমার জীবনে নেই তৃপ্তির গৌরব, আর আমি
অর্থ খুঁজি চক্রে চক্রে, সমর্পিত মহাশূন্যতায়।

কী অর্থ নিহিত তবে নিপতিত গাছের পাতায়?
উপর্যুক্ত কবিতাটির অনেক পরে লেখা ১৯৮২ অব্দে প্রকাশিত ‘ইকারুসের আকাশ’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনামধারী কবিতাতেই দেখি এই নিয়তিনির্দিষ্ট ভ্রমণের কথা, যাকে তিনি বলেছেন ‘আমার নিজস্ব পরিণাম’, এটা আসলেই কবির পরিণামিতা, যখন তিনি বস্তুগত অদৃশ্যমানতার বশবর্তী হন কবিতাকে শিরোধার্য করে। তা জীবনকে এক অর্থে স্বউদ্যোগে ব্যর্থ করে দেওয়া, অস্বাভাবিক ও অসুস্থ করে দেওয়া, এক মনোবিকলনিক উৎসারের দিকে সবেগে ঠেলে দেওয়া। তিনি তা করেছেন মুহুর্মুহুভাবে, তাই আবারও বলেছেন:
কখনো মৃত্যুর আগে মানুষ জানে না
নিজের সঠিক পরিণতি। পালকের ভাঁজে ভাঁজে
সর্বনাশ নিতেছে নিশ্বাস
জেনেও নিয়েছি বেছে অসম্ভব উত্তপ্ত বলয়
পাখা মেলবার, যদি আমি এড়িয়ে ঝুঁকির আঁচ
নিরাপদ নিচে উড়ে উড়ে গন্তব্যে যেতাম পৌঁছে
তবে কি পেতাম এই অমরত্বময় শিহরণ?
আমরা শুরুতে বলেছিলাম অনুক্তজ্ঞানের আধিকারিক হিসেবে কবিদের কথা, যে জ্ঞানের উপযোগিতা নির্ভর করে সমাজ বা সভ্যতার অনুশীলনময় প্রস্তুতি-জ্ঞানের ওপর। যে সমাজ অগ্রবর্তী থাকে তার কাছে এই জ্ঞান উপযোগ ও অবলম্বন নিয়ে ধরা দেয়, আর পেছানো সমাজের কাছে তা থাকে অধরা। শামসুর রাহমান এই দ্বন্দ্বটিকে ধরতে পেরেছিলেন, তাই তিনি এ ব্যর্থতার যুক্তিকে প্রতিপন্ন করতে চাইছেন এইভাবে:
এই বলিদান, শুধু অভীপ্সার ক্ষণিকের গান
গেলাম নিভৃতে রেখে ঝাঁ ঝাঁ শূন্যতায়।
অর্জন করেছি আমি অকাল লুপ্তির বিনিময়ে
সবার কীর্তনযোগ্য গাথা,
যেহেতু স্বেচ্ছায়
করেছি অমোঘ নির্বাচন
ব্যাপ্ত জ্বলজ্বলে, ক্ষমাহীন, রুদ্র নিজস্ব আকাশ।
ঠিক এই মোড়ফেরা বিন্দুটিকে শনাক্তকরণের সাথে সাথেই রাহমানের বৈশিষ্ট্যটিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়, যা এ অঞ্চলের পরম্পরাশ্রিত কাব্যভাষার সাথে নতুন ও ভবিষ্যতের কবিতার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়। ভাষার যে মনোজগৎ, সময়ের যে লুপ্ততা, ভাবের যে বিষমতা— এই তিনটি অন্যোন্য বিবেচনায় শামসুর রাহমান প্রত্যাখ্যান করেন তাঁর অব্যবহিত কবিতাকে, এবং তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন সেই প্রস্থানবিন্দুটির ওপর, যেখান থেকে বাংলা কবিতা এতদিনকার সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপটিকে ভেঙে-গুঁড়িয়ে নতুন উদ্ভিন্নতায় আত্মপ্রকাশিত হয়। এই এন্ট্রপি আধুনিকতার এক মহৎ বৈশিষ্ট্য যার বীজ রোপিত হয় রাহমানের দ্বারা, এ অঞ্চলে, প্রথমবারের মতো। কিন্তু এর অন্তর্বাহী রূপটিকে খোঁজ করা জরুরি।
আধুনিকতার দুটি প্রত্যয় রয়েছে, একটি হলো এর অনুশীলন আর অন্যটি হলো সাঙ্গীকরণ। সময়ের অগ্রসরমানতাকে বুঝেও একটি বিবেচিত হয় ‘সমসাময়িক’ হিসেবে অন্যটি বিবেচিত হয় ‘আধুনিক’ হিসেবে। এই দুইয়ের যোগসূত্র থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। পাউন্ড জোর দিয়েছিলেন ‘নতুন’ হওয়ার ওপর; এই পৃথক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তা না হলে চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াটির অনুপস্থিতি দেখা দিতে পারে। সুতরাং প্রয়োজন নতুন কাব্যধারণার, ও শৈলীর। আধুনিকতা অনেকটা স্তম্ভিত এক অনন্য আন্দোলন, যা তার ইতিপূর্বেকার সাহিত্য-আন্দোলনগুলোর সাথে সমঝোতা না করেই বেরিয়ে আসে। আধুনিক লেখকরা দাবি করেন আধুনিকতা, এবং ব্যক্ত-ও করেন আধুনিকতা। শামসুর রাহমান বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম সার্থক কবি—যিনি ধরতে পেরেছিলেন আধুনিকতার দ্ব্যর্থক, উদ্বিগ্ন, এবং নান্দনিক খণ্ডীকরণ ও অস্তিত্ববাদী অর্থহীনতার বিষয়গুলোকে। আর তিনি অনতিবিলম্বেই সচেতন হয়ে উঠেছিলেন এর ভিত্তিতে সংগঠিত চেতনাকে কবিতায় প্রতিষ্ঠা করতে। প্রধান কবিকে সৃষ্টি করতে হয় কবিতার জলবায়ু, যেখান থেকে অসংখ্য সৃষ্টিশীলতা দেখা দিতে থাকবে, অসংখ্য কবি ও কবিতার জন্ম হতে থাকবে। কবিতায় অনেক কিছু গুরুত্বপূর্ণ: ভাষা, ব্যঞ্জনা, বোধ, লোকজতা, চিত্রকল্প, উপমা, চেতনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এর জন্য প্রধানকে নিতে হয় দায়িত্ব কারণ বীজতলা নির্মাণের দায়ভার। শামসুর রাহমান আমাদের কবিতা লেখার বীজতলা। তিনিই সেই কবি, যাঁকে দেখে ঝাঁক বেঁধে কবিরা কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন একদা!
কবির জীবন কোনো ‘দলচে ভিতা’ নয়। নয় অলসগমনপরিণত। পক্ষান্তরে প্রতিটি মহৎ কবির জীবনই এক সুগভীর অতলান্তিক, যার ওপরে অজস্র-বিশাল তরঙ্গরাশি আর অন্তস্তলে সুপ্তিময় রত্মরাজি। কবির এই দুটি রূপ তাঁর ব্যক্তিসত্তা আর কবিসত্তার প্রতিভাস হয়ে দেখা দেয়। তিনি গভীর-গোপনে ধরে রেখেছেন মণিমুক্তা, যা উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজন ডুবুরির। প্রচলিত অর্থে কোনো ‘ডিফিকাল্ট’ কবিতাও রাহমান লেখেননি, কিন্তু তাঁর কবিতা, প্রকৃতপক্ষে, পঞ্চাশের দশকের আমাদের যে আধুনিকতার অভিজ্ঞতা, তাকে সংগত করে। আমরা বুঝতে পারি, ভাব ও ভাষা বদলে যাচ্ছে, আসছে নতুন চেতনা, কবি হয়ে উঠছেন ব্যাপক, বিশাল, অপ্রত্যক্ষ, ইঙ্গিতময়, যখন ভাষা তার অর্থের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। আর এই বদলের, এই আধুনিকতার ঠিকুজিকার হলেন শামসুর রাহমান।
শামসুর রাহমানের কবিতা যেন এক বিষমমাত্রিক সম্মিলনস্থল—melange adultere de tout; এখানে মিলেছে অতীত, বর্তমান, বোধ, মেধা, মিথ, রাজনীতি, সমাজ, স্বাধীনতা, তথ্য, সম্পর্ক, প্রেম, যৌনতা, চেতনা, বা বলা যায় কী নয়! আর এ জন্য তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে বহুলপঠিত, নানা স্তরের ও নানা মাত্রার পাঠকের কাছে। এই পাঠ সাধারণগোছের নয়, বরং সমীহউদ্রেগকারী; শিল্পমান ও জনপ্রিয়তার প্রচলিত ভেদরেখাকে তা ঘুচিয়ে দিয়েছিল, এবং কবিতা ও জীবন যে একটি অপরটির আধার এবং উৎসস্থল হয়ে উঠতে পারে তার সম্বন্ধকে আমাদের কাছে উদ্ভাসিত করেছিল।
কবিতাকে নতুন হতে হয়, র‍্যাঁবোর মতে কবিতাকে হতে হয় ‘সম্যকভাবে আধুনিক’, যেন তার পরিসীমা চিহ্নিত করে আত্ম-অবনয়নকে, যেখানে কবিতা আত্মমুখী, যেখানে নতুনের সংবেদনে কবিতা শিহরিত হতে থাকে। শামসুর রাহমান এই আত্মমুখী কবিতার নতুন স্বরের অন্যতম প্রধান স্রষ্টা। কিন্তু রোমান্টিকতা বা নির্বেদ নয়, পরবর্তীকালে তিনি প্রসারিত হয়েছিলেন প্রতিরোমান্টিকতা ও সদর্থকতার সার্বভৌমত্বে—যেখানে জীবনের ও জগতের মঙ্গলভাবনায় ব্যক্তিলেখক সামাজিক-লেখকে পরিণত হয়। শামসুর রাহমান এই দুই ধারার এক ঝুলন্ত সেতু, এবং তিনি এই বহমানতার এক সবল উদাহরণ হয়ে আছেন বাংলা কবিতায়; মৃত্যু অবলুপ্ত করে উপস্থিতি আর উজ্জ্বল করে উপস্থিতি—এ এক রহস্যময় কূটাভাস, যা আমার মনে এসেছে রাহমানের মৃত্যুবিভাবে। কবিতার বড় শত্রু হতে পারে এই উপস্থিতি, যে উপস্থিতি ব্যক্তির, তার বর্তমানতার; কারণ কবি যখন থাকেন শারীরিক তখন তার সৃষ্টি দ্বন্দ্বের ও বিতর্কের আবর্তে পড়তে পারে। তিনি অপঠনের ও অপপঠনের অক্রিয়তায়ও পড়তে পারেন। কেননা, ব্যক্তিসত্তা, রাজনীতি, সমাজভাবনা অনেক সময় আড়াল করে রাখে তাঁর সৃষ্টিশীলতার উৎস-আধারকে। আবার ব্যক্তিসত্তা ভুলভাবে প্রযত্নায়িতও করে নিজ সৃষ্টিকে। ফলে ব্যক্তির মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির যথাযথ মূল্যায়নের বাধাকে অপসারিত করে এক অর্থে। বস্তুত মৃত্যুর পরই শুরু হয় লেখার নিরপেক্ষ ও সৎ মূল্যায়ন। মৃত্যু লুপ্ত করে জীবন কিন্তু উন্মোচন করে তার সৃষ্টির বৈভব। যে কবিতা ছিল শ্বসিত তা উড়তে শুরু করে আর যে কবিতা ছিল অশ্বসিত তা নড়াচড়া শুরু করে দেয়। মৃত্যু বিনাশকারী কিন্তু পুনর্জীবন দান করে কবিতার। বড় ও প্রধান কবির জীবনই অনেক সময় তাঁর কবিতার প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, প্রতুল লেখা, অতি প্রাতিষ্ঠানিকতা ও সমাজসম্পৃক্তি সৃষ্টি করে এক অন্তরাল—যেখান থেকে সৃষ্ট মহৎ-পঙ্‌ক্তিগুলো বেরিয়ে আসতে পারে না। এই অর্থে মৃত্যু আমাদের নৃতত্ত্ব বিষয়ে ভূমিকাশীল করে। আমরা প্রকৃতিবিজ্ঞানীর মতো খুঁজে বের করি সেই উদ্ভিদটিকে, যে লোকচক্ষুর আড়ালে গন্ধ ছড়ায় রাতে আর নক্ষত্রের সাথে নিবিড়তায় আশ্লিষ্ট হয়।
দীর্ঘ জীবনপ্রবাহের নানা অন্ধ বিন্দু, বিবিধ ত্র্যহস্পর্শের ভেতর দিয়ে তিনি এগিয়েছেন। এই যাত্রাপথে অন্তর্বর্তী সময়কেই তিনি স্পর্শ করেছেন। নানা রাজনৈতিক কালধারায় চূর্ণিত তাঁর জীবন-স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বোবা নীরবতার ব্যূহ ভাঙতে হয়েছে তাঁকে। কবি হিসেবে এ তাঁর এক দুরারোগ্য ব্যাধির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম, অন্তিম বিনাশের আগে এক অনন্যসাধারণ সম্পাদন, যা তাঁকে মানবতার অবিকল্প যোদ্ধার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। তাঁর জীবন ও সৃষ্টি অন্যোন্য এবং অবিচ্ছেদ্য, এই পার্থিব ভ্রমণের প্রতিটি শূন্যতায় ও অস্বস্তিতে তিনি এক অতিমানবীয় গরিমায় নিয়োজিত ছিলেন মূঢ়তা ও নির্বোধতার দুঃসহ অবস্থাকে অতিক্রম করতে, যা প্রতিটি মানবিক মানুষের অসীম প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁর এই অর্জন অনিবার্যভাবেই ছিল নানা হুমকি, অস্তিত্বসংকট, আত্মবিসর্জনের তীব্রতম দহন ও সংরাগে উন্মথিত। এ এক ‘আশ্চর্য বিষাদ’, যার ধারক ছিলেন তিনি। এলিঅটের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ভ্যালরি স্বামী সম্পর্কে বলেছিলেন: He felt he had paid too high a price to be a poet, that he had suffered too much। মনে হয় শামসুর রাহমানের জন্যও তা যথাযথ। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্নে, কবিতার জন্যও তাঁকে দিতে হয়েছে চড়া মূল্য।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com