বিদ্রোহী কবি হিসেবে তাঁর সর্বাধিক পরিচিতি। তবে তিনি প্রেম, সাম্য ও মানবতার অসামান্য কবিও।অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য কণ্ঠস্বর তিনি। শোষণ-বঞ্চনা, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর সৃষ্টিকর্ম যুগ যুগ ধরে মানুষকে সাহস জুগিয়ে আসছে, দেখাচ্ছে মুক্তির পথ। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ই ভাদ্র জীবনপ্রদীপ নিভে অসীমের যাত্রী হন তিনি।কিন্তু নিষ্প্রভ হয়ে যায়নি তাঁর সৃষ্টির আলো। মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ আর মানবমুক্তির বাণীতে তিনি বেঁচে আছেন বাঙালির মননে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ১২ই ভাদ্র বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবস।
কবির প্রয়াণ দিবসে দেশের মানুষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করবে।
কাজী নজরুল ইসলামের সক্রিয় সৃষ্টিকাল ছিল মাত্র ২৩ বছর। সময়ের হিসাবে এটি মোটেও দীর্ঘ নয়। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যুক্ত করেছেন বিস্ময়কর শৈল্পিক সুষমা। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও সুরসৃষ্টির বহুমাত্রিক সৃষ্টিভুবন নির্মাণ করেছেন তিনি। তাঁর কবিতা ও গান বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে নতুন জাগরণ সৃষ্টির পাশাপাশি ভাষা ও শিল্প প্রকাশে যোগ করেছে নতুন স্বর ও স্বাতন্ত্র্য।
সাংবাদিকতায়ও নজরুল ছিলেন সাহসী ও আপসহীন। ‘ধূমকেতু’, ‘নবযুগ’ ও ‘গণবাণী’র মতো পত্রিকায় তিনি ব্রিটিশবিরোধী সম্পাদকীয় লিখেছেন। এ জন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। কিন্তু কারাগারও তাঁর কণ্ঠ থামাতে পারেনি। জেলে বসেই তিনি লিখেছিলেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, যা আজও প্রতিবাদের এক অনন্য দলিল।
১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার পর ধীরে ধীরে নির্বাক হয়ে যান নজরুল। কিন্তু ব্যক্তি নজরুল স্তব্ধ হয়ে গেলেও তাঁর রচনা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। আজও তাঁর গান গাওয়া হয়, কবিতা উচ্চারিত হয়, আর সাম্যের বাণী মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যজীবনে নজরুল যে অফুরন্ত শিল্প সৃষ্টি করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যকে যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধির পথ দেখাবে।
সময়ের আবর্তনে নতুন নতুন প্রশ্ন ও বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে। প্রজন্ম বদলেছে, সময় বদলেছে, সমাজের সংকট ও সংগ্রামের ভাষাও বদলেছে; কিন্তু মানুষের মুক্তি, সাম্য, প্রেম ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। এ কারণে নজরুলের সৃষ্টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান জীবন্ত।
কর্মসূচি : জাতীয় কবির ৫০তম প্রয়াণ দিবসে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে স্মরণ করতে ‘আমারে দেবো না ভুলিতে’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এ অনুষ্ঠানের প্রথম দিন আগামীকাল ২৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করা হবে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দ্বিতীয় দিন ২৮ আগস্ট একই সময়ে জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া কবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করবে আলোচনা, সংগীতানুষ্ঠান, আবৃত্তি ও নানা স্মরণানুষ্ঠান।
দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ। কাল সকাল সাড়ে ৬টায় উপাচার্য ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জমায়েত হবেন। সেখান থেকে সকাল পৌনে ৭টায় তাঁরা শোভাযাত্রাসহকারে কবির সমাধিতে যাবেন। এরপর সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হবে।