সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার শিল্পভাষা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

কোনো কোনো শিল্পপ্রদর্শনী শেষ হয়ে যায় নির্ধারিত দিনক্ষণে, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো গ্যালারির দেয়াল পেরিয়ে দীর্ঘদিন দর্শকের ভেতরে থেকে যায়। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত দলীয় শিল্পপ্রদর্শনী ‘সার্চ সোল, সয়েল (মৃত্তিকার সন্ধানে)’ ছিল তেমনই একটি আয়োজন। গত ২৮ জুলাই পর্দা নামলেও প্রদর্শনীটি যেন আরও গভীরভাবে মনে করিয়ে দেয়- সভ্যতার সমস্ত অগ্রগতির পরও মানুষের শেষ আশ্রয় মাটি, আর সেই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে হারিয়ে যায় স্মৃতি, সংস্কৃতি, এমনকি ভবিষ্যৎও।
কিউরেটর কুন্তল বাড়ৈর পরিকল্পনায় আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন সমকালীন সাত তরুণ শিল্পী- বনানী সিমলাই, দীপ্র বণিক, খাইদেম সিথি সিনহা, লুৎফা মাহমুদা, মো. ফাইজুল ইসলাম, মো. হাশেম এবং রূপশ্রী হাজং। প্রদর্শনীর প্রতিটি কাজ যেন আলাদা আলাদা ভাষায় একই প্রশ্ন উচ্চারণ করেছে- মানুষ কি এখনও প্রকৃতির অংশ, নাকি সে নিজেকেই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে?
প্রদর্শনীতে প্রবেশ করতেই দর্শককে স্বাগত জানিয়েছে এক বিস্তৃত ইনস্টলেশন। গ্যালারির মসৃণ সাদা মেঝের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কাঁচা মাটির স্তর। সেই মাটির বুকে বৃত্তাকারে সাজানো অসংখ্য পোড়ামাটির চাকতি-কোথাও শস্যদানা, কোথাও শুকনো বীজ, কোথাও পাতা, কোথাও আবার জীবাশ্মের মতো ছাপ। মাঝখানে গহ্বরের মতো সাদা ভাস্কর্য, যেন পৃথিবীর ক্ষতচিহ্ন, আবার একই সঙ্গে নতুন জন্মের সম্ভাবনাও। দর্শককে দূর থেকে নয়, বরং চারপাশ ঘুরে এই কাজের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। শিল্পকর্মটি যেন মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মাটির বুকেই লেখা থাকে।
বনানী সিমলাইয়ের এই কাজ খাদ্য, মাটি এবং মানবজীবনের পারস্পরিক নির্ভরতার কথাই নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি দেখিয়েছেন, খাদ্য কেবল পুষ্টি নয়,এটি একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি, একটি ভূগোল, একটি জীবনদর্শন। মাটির ছোট ছোট চাকতিগুলো যেন মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে পৃথিবীর গভীর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।
গ্যালারির আরেক কোণে দীপ্র বণিকের ‘ভ্যানিশিং ইমপ্রিন্টস’ দর্শকের দৃষ্টি আটকে রাখে। দেয়ালে ঝুলে থাকা পশু-পাখির মুখাবয়ব-গরু, পাখি, শিয়াল, বানর যেন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নিচে ছড়িয়ে রয়েছে মাটির অসংখ্য ছাপ, পদচিহ্নের মতো গোলাকার ফলক। মনে হয়, পৃথিবীতে প্রাণীরা একসময় ছিল, তাদের অস্তিত্বের স্মৃতি হয়তো কেবল এই ছাপগুলোতেই রয়ে যাবে। শিল্পী এখানে পরিবেশ ধ্বংসের ফলে হারিয়ে যেতে বসা জীববৈচিত্র্যের নীরব ইতিহাস লিখেছেন। শব্দহীন এই কাজ দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে- মানুষ কি একদিন কেবল স্মৃতির মধ্যেই প্রাণিজগতকে খুঁজবে?
প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে আরেকটি ভিন্ন ভাষা নির্মাণ করেছেন খাইদেম সিথি সিনহা। বাঁশের কাঠামোয় ঝুলিয়ে রাখা দীর্ঘ সবুজ বস্ত্রে ফুটে উঠেছে হরিণ, প্রজাপতি, ফুল, নদী, নৌকা এবং বিভিন্ন লোকজ প্রতীক। মণিপুরি ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের নান্দনিকতা ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতি কোনো আলাদা সত্তা নয়,এটি একটি জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উত্তরাধিকার। শিল্পকর্মের প্রতিটি মোটিফ যেন লোকজ স্মৃতির ধারক।
রূপশ্রী হাজংয়ের সূচ-সুতার কাজগুলো প্রদর্শনীতে এক অন্যরকম আবহ তৈরি করেছে। কাপড়ের ওপর সূচিকর্মে ফুটে উঠেছে হাজং জনগোষ্ঠীর নারীরা, গাছপালা, শস্য, লোকজ মোটিফ এবং সামষ্টিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ। উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার কাজগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুললেও ভেতরে লুকিয়ে আছে আদিবাসী সমাজের হারিয়ে যেতে থাকা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তাঁর শিল্পে সূচ-সুতা কেবল অলংকরণ নয়; এটি স্মৃতি সংরক্ষণের একটি মাধ্যম।
লুৎফা মাহমুদার ইনস্টলেশন দর্শককে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। দেয়ালে অসংখ্য ছোট ছোট বাসার মতো গোলাকার কাঠামো। কোথাও ফাঁকা, কোথাও অসম্পূর্ণ। মনে হয়, পাখির বাসা, আবার মানুষের ঘরও। শিল্পী অভিবাসন, স্থানচ্যুতি এবং ‘বাড়ি’ ধারণার মানসিক অভিঘাতকে অত্যন্ত সংযত ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। পৃথিবীজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মানুষ যখন ঘর হারাচ্ছে, তখন এই ছোট ছোট বাসাগুলো হয়ে ওঠে এক গভীর প্রতীকের ভাষা।
মো. ফাইজুল ইসলাম শিল্পায়নের অন্ধ দৌড় এবং পরিবেশ দূষণের নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। তাঁর কাজে অ্যাসিড বৃষ্টি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের উন্নয়ন-চিন্তার আত্মবিনাশী দিকের প্রতীক। শিল্পের ভাষায় তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতির ওপর মানুষের প্রতিটি আঘাত শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে মানুষের কাছেই।
মো. হাশেম পাহাড়, ভূমিক্ষয় এবং উর্বর মাটির ধ্বংসকে স্মৃতি ও প্রতিরোধের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। তাঁর কাজে ক্ষয়ে যাওয়া ভূমি কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বসংকটেরও রূপক। পাহাড় কেটে ফেলা, নদী ভরাট, বন উজাড়-এসবের ভেতর দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের নিজেরই ভবিষ্যৎ।
এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, এটি পরিবেশ সংকটকে কোনো স্লোগানে পরিণত করেনি। বরং শিল্পীরা তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, লোকজ সংস্কৃতি, উপকরণ এবং নান্দনিক ভাষা ব্যবহার করে এমন এক শিল্পভুবন নির্মাণ করেছেন, যেখানে দর্শক নিজেই প্রশ্নের মুখোমুখি হন। মাটি এখানে কেবল উপাদান নয়, এটি স্মৃতির ধারক, পরিচয়ের ভিত্তি এবং ভবিষ্যতের প্রতীক।
উদ্বোধনী আয়োজনে স্থপতি শামসুল ওয়ারেস, শিল্পী মঈনুদ্দীন খালেদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক রশীদ আমিনের উপস্থিতি প্রদর্শনীটির গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এই আয়োজনের প্রকৃত মূল্য ছিল শিল্পকর্মগুলোর সম্মিলিত সংলাপে। সাতজন শিল্পী সাতটি আলাদা শিল্পভাষায় একই সত্য উচ্চারণ করেছেন- প্রকৃতিকে বাঁচানো মানে কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়; মানুষের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com