বিশ শতকের যেসব লেখক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, আশরাফ সিদ্দিকী তাদের একজন। তিনি বিচরণ করেছেন সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। কবিতার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ হলেও সব পরিচয় ছাপিয়ে যায় তাঁর লোকবিজ্ঞানী পরিচয়। আমি তাসনিম সিদ্দিকী, তাঁর তৃতীয় সন্তান। আমি আমার পরিবার এবং আমার বাবার গুণগ্রাহীরা দারুণভাবে আনন্দিত এবং গর্বিত। কারণ, বাবা এ বছরে সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬- এ ভূষিত হয়েছেন।
আর স্বাধীনতা পুরস্কার পাবেন নাইবা কেন, তিনি রচনা করেছেন পাঁচশরও অধিক কবিতা। চল্লিশের দশকে তরুণ কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ তাঁর, তালেব মাস্টার বা সম্রাট শাহজাহানের মতো সাধারণ মানুষের জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে উপজীব্য করে লেখা কবিতার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের ভেতরে অবিভক্ত বাংলায় বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ‘গলির ধারের ছেলেটি’ বা ‘রাবেয়া আপা’র মতো ছোটগল্প লিখে তিনি মন কেড়ে নিয়েছিলেন বহু বিদগ্ধ পাঠকের। তিনি যখন ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে দ্বিতীয় মাস্টার্স করতে যান তখন বিদেশে বসেই রচনা করেন ‘ভোম্বল দাশ দ্য আংকেল অব লায়ন’। ১৯৫৮ সালে ম্যাকমিলান প্রকাশনী বইটি বের করে এবং সেটি সে বছরের শিশুসাহিত্যে বেস্ট সেলারের মর্যাদা পায়। বইটি শুধু আমেরিকার বিভিন্ন স্কুলে পাঠ্য ছিল তাই নয়, তা আরও ১১টি ভাষায় অনূদিত হয়। অর্থাৎ বাংলার লোকগল্পকে তিনি পৌঁছে দেন বিশ্বদরবারে। ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন’ আজও ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ “বেঙ্গলি ফোকলোর অ্যান্ড স্টাডিজ ডিউরিং দ্য ব্রিটিশ পিরিয়ড” যা প্রথমে প্রকাশ করেছিল বাংলা একাডমি এবং পরে মুক্তধারা, তা এখনও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকসাহিত্যের মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে পঠিত। বাবার কাজ সম্পর্কে অল্পবিস্তর সবাই জানে। আমি এই লেখার মধ্য দিয়ে জানাতে চাই সাহিত্যিক আশরাফ সিদ্দিকী কীভাবে নির্মিত হয়েছিলেন। কেন তিনি গ্রাম্য পাঠশালার তালেব মাস্টার বা পুরান ঢাকার বজ্ঞিটানা শাহেব আলীর বাস্তবতা এত নিপুণভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন? কীভাবে তিনি অনবরত লিখতে পেরেছিলেন আবহমান বাংলা, লোকায়ত বাংলা, কিংবদন্তির বাংলার মতো সব বই, যা বাংলার আচার, অনুষ্ঠান, লোকগল্প, গীতিকার তাত্ত্বিক ব্যাখ্য সহজ ভাষায় তুলে ধরেছে পাঠকদের কাছে।
আশরাফ সিদ্দিকীকে বোঝা যাবে যে পারিপার্শ্বিকতায় তিনি বড় হয়েছেন তা অনুধাবনের মাধ্যমে। আশরাফ সিদ্দিকী জন্মেছিলেন ১ মার্চ ১৯২৭ সালে নাগবাড়ি গ্রামে। গ্রামটি বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার অন্তর্গত। বাবা আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী ছিলেন স্বরাজ আন্দোলনের কর্মী। মা সমীরণ নিসা ছিলেন জমিদার কন্যা। তিনি কবিতার ভাষায় রামায়ণ, মহাভারত, বিষাদ-সিন্ধু, কাসাসুল-আম্বিয়া বা সোনাভানের কিস্সা অনর্গল বলে যেতে পারতেন। বহু বিচিত্র ছড়া, প্রবাদ বিয়ের গীতি ছিল তাঁর কণ্ঠস্থ।
যে গ্রামে আশরাফ সিদ্দিকী জন্মেছিলেন, সে গ্রামের বর্ণনা বিভিন্ন লেখায় তিনি নিজেই দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন “আমাদের গ্রামটি খুব সবুজ, এখানে যেমন পর্যাপ্ত ফসল ফলে, তেমনি তা সবুজ বৃক্ষরাজিতে ঘেরা। গ্রামটিকে আদরিণী কন্যার মতো চারদিকে ধরে রেখেছে বংশাই নদী, তরলা বিল, নলীন বিল ও বড় বিল। শুকনো সময় সেখানে বিলের পাশ দিয়ে যেমন ফলে ফসল থাকে সবুজের সমারোহ, বর্ষায় পদ্ম শাপলার বনে বিচিত্র সব দূরাগত লক্ষ লক্ষ পাখিদের মেলা বসে”। এই প্রকৃতিকেই তিনি ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায়, উপন্যাসে বা ছোটগল্পে।
শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী থেকে আশরাফ সিদ্দিকী ১৯৪৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং পরে শান্তিনিকেতনে ইংরেজি ভাষাতত্ত্ব এবং বাংলা সাহিত্যে অনার্স কোর্স সম্পন্ন করেন। শান্তিনিকেতনের জীবনাচরণও তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ওই সময় অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তেতাল্লিশের মন্বন্তর এবং সাতচল্লিশের দাঙ্গা। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে সরকারি কলেজে যখন বাবা অধ্যাপনা শুরু করেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে নিয়ে এসে বাংলার প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য সাহিত্য সংগ্রহের কাজ দেন। বাবা, মীর মশাররফ হোসেনের গাজী মিয়াঁর বস্তানী এবং জমিদার দর্পণের মতো বইয়ের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে তা সম্পাদনা করে পুনর্মুদ্রিত করেন। লোকসাহিত্যকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বনির্ভর ব্যাখ্যাদানের সক্ষমতা তিনি অর্জন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ড. ডরসনের অধীনে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করার মধ্য দিয়ে।
গ্রামবাংলার প্রকৃতি এবং বিভিন্ন উৎসব ঘিরে যে সাংস্কৃতিক আবহ, গ্রাম্য পাঠশালা ও মাইনর স্কুলের শিক্ষাগুরুদের জীবনমুখী পাঠদান, মাধ্যমিক পর্যায়ে ময়মনসিংহকেন্দ্রিক সাহিত্যজগতে বিচরণ, শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতা এবং ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রাপ্ত তাত্ত্বিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে আশরাফ সিদ্দিকীর সাহিত্য দর্শন। জীবনাচরণ এবং সাহিত্য সৃষ্টিতে তিনি হয়ে ওঠেন ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধ মানবিক এবং প্রকৃতিপ্রেমী এক সাহিত্যিক।