অথচ বৃষ্টির গল্প
নাসির আহমেদ
আয়নায় বিম্বিত ছবি দেখে
বিস্ময়ে তাকিয়ে জানি– মনে মনে বলো
এ মুখ আমার নয়! অন্য কেউ, অন্য কারও ছায়া।
কার? নিরুত্তর ঘামে শুধু অস্তিত্ব তোমার!
সেই থেকে তুমি আর আয়নাই দেখো না।
মুখ আর মুখোশের জটিলতা খুঁজে
কেটে গেল জীবনের এতটা সময়!
চিনতে পারোনি আজও নিজেকেই নিজে।
এমন শুভ্রতাময় পোশাকের অন্তরালে
এত কালিঝুলি! বোঝার উপায় নেই।
অথচ কী প্রবল প্রতাপে
শুভ্রতার পক্ষে কথা বলো প্রতিদিন!
তোমার অস্তিত্ব সে তো খরাপোড়া চৈত্রের জমিন
অথচ বৃষ্টির গল্পে সর্বদা মুখর!
তোমার উৎসবে
মারুফ রায়হান
উৎসবে মিলিনি বটে, দুঃসময়ে প্রথম সাক্ষাৎ
সমস্যাসঙ্কুল ছিল দিন, রাতগুলো গিরিখাত
এখন তোমাকে ঘিরে আন্দোলিত আমার উৎসব
যদিও ভুলিনি আজও নির্লিপ্ততা, পাপড়ির শব
যখন সুদূরে তুমি, উৎসবের উল্টোদিকে বাস
তখনও তোমার বৃত্তে আমার আনন্দ অভিলাষ
তোমার উৎসবে আছি কাছাকাছি— অদৃশ্য আড়ালে
আমার আনন্দদিন পূর্ণ হবে দু’হাত বাড়ালে
আমাদের উৎসবের উন্মীলিত দু’টি উৎস-মুখ
মিলবে কি মোহনায়— বটমূল ভাবিত উন্মুখ
পদরেখা
শাহাবুদ্দীন নাগরী
কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে এলে তুমি
খুলে গেলো আকাশের ভাঁজ,
বুকের কষ্ট হয় চোখে জল,
গোলাপেরও রক্ত ঝরে আজ।
আমাদের করতলে ঝরাপাতা
বাহুতে দেখি কালশিটে দাগ,
ছিঁড়ে গেছে তানপুরার তার
কতো শিল্পীর সুললিত রাগ।
ছাই হলো সবুজ বনভূমি
শিকড়ের কান্না শুনি কানে,
ব্যর্থতার সকল দায়ভার
কেউ কি একক নিতে জানে ?
আমাকে দাও বন্দির কারাগার
শত্রু চেনার নিশ্চিত এক গৃহ,
যেটুকু বুঝেছি তোমার কথায়
মানুষ কীভাবে হয়ে যায় অপ্রিয়।
দিন ফুরিয়েছে, আমাদের শেষ দেখা,
সব মুছে দিক, থেকে যাক পদরেখা।
মধুগন্ধি বৈশাখ
রাজু আলীম
চৈতালী মেঘের ডাকে মধুগন্ধি সুন্দরী বৈশাখ
অনার্দ্র বাতাসে ওড়ো তুমি; রাখিও না রাখ ডাক।
দুরন্ত ঝড়ের বেগে নিষ্প্রাণেরে প্রাণ দিতে এসো
বিবর্ণ প্রেমের বৃক্ষ ভাঙো, নতুনেরে ভালবেসো।
ছাইরঙা মন আজ পুড়ে যাক, দূরে থাক জ্বরা
কাঁচা সবুজের ঘ্রাণে ঘুচে যাক দীনতা ও খরা।
নতুন ঋতুর গন্ধে প্রকৃতিরা আবার নাচুক
ধুলোমলিনের রংমাখা প্রেম উচ্ছাসে হাসুক।
ঘূর্ণি বিকেলের কানে কানে কারা যেন বলে যায়
আকাশপুরের খুব কষ্ট দীণতার গান গায়।
দূরের নির্জনতাকে ভালবাসে শিরিশের ফুল
আসন্ন জৈষ্ঠ্যের কানে শোভা পায় বৈশাখের দুল।
নিসর্গের দৃষ্টি নিয়ে বৃষ্টি আসে সৃষ্টির উল্লাসে
কৃষ্ণচূড়া বালিকারা ভর দুপুরের মতো হাসে।
দূরের স্বপ্নেরা হাঁটু সোজা করে দিগন্তে হাটুক
পুরনো দুঃখেরা প্রেমজলে আজ সাঁতার কাটুক।
বিপন্ন কান্নার ভাষা অনুবাদ হোক তৃষ্ণা চোখে
রোদেরা সর্বস্ব দেয় বৃষ্টিস্নাত মৃত্তিকার শোকে।
শীর্ণ বাতাসের স্বপ্ন আলুথালু আকাশে উড়ছে
সাজানো বাগানে চৈত্র খাঁ খাঁ বৈশাখ পুড়ছে।
ফিনফিনে বাতাসের গন্ধে মুগ্ধ বৈশাখ সুন্দরী
তোমার আলোর জ্যোতি আমি একা পান করি।
কার্পাস তুলোর মতো তুমি ওড়ো হও বিবর্তনা
চিরায়ত চিন্তা করে ভেঙে দাও গোখরার ফণা।
সন্তান
মাহী ফ্লোরা
আমার যে সন্তান হয়েছিল নর্মদা নদী,
অতীত খুলেছিল পরতে পরতে, যাকে ডেকেছিলাম বিভিন্ন নামে। হতে পারতো সে সাহসী লতানো কথা বলা গাছ। অথচ সে জলে মিশে গেল।
ভাঙা ভাঙা রক্তে।
তুমি তাকে চাইলে না। আমি তাকে চাইলাম না। আমাদের সন্তান সীমান্তের কোনও পাহাড় হয়ে দাঁড়ালো।
এইসব কুয়াশায় ভাবি
নদী, সমুদ্র, ঘন বন পেরিয়ে আমি আজ পাহাড়েই যাব। যে কোনও গাছ, যে কোনও নদী, যে কোনও পাহাড় অথবা মাড়িয়ে যাও যে ঘাস-
হয়ত সে আমাদেরই সন্তান!