সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

উড়ে যাওয়ার দিন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

আজ সারাদিন বৃষ্টি বৃষ্টিটা কমছে না, বাড়ছে না। একই ছন্দে গাছের পাতায় গুনগুনিয়ে পড়ছে। প্রকৃতিও স্থির। প্রায় চোখে পড়ে না এমন অবিরল ধারায় ঝরছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলি অদৃশ্য– কথাটা এভাবেও বলা যায় হয়তো।
স্থির প্রকৃতি। চান্টিংয়ের মতো একই লয়ের গুঞ্জনধ্বনি। চারপাশটা ধ্যানে মগ্ন যেন।
আমি ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে অবিরাম ঝরতে থাকা প্রায়-অদৃশ্য বৃষ্টিকণা দেখছি। ঠান্ডা বাতাসে লম্বা শ্বাস নিচ্ছি। আম্মা দরজার মুখে হুইলচেয়ারে। ঠোঁটে সারাক্ষণ ছড়া/কবিতা/প্রবাদ/পুঁথির ভগ্নাংশ।
এখন বাতাসের সামান্য ছোঁয়া পেয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলি লাফিয়ে লাফিয়ে ভিজা মাটিতে পড়ছে। কখনও সোজাসুজি, কখনও ত্যাড়াবেঁকা। একনাগাড়ে কোনাকুনি হানা দিলে আম্মাকে হুইলচেয়ারসমেত ঘরের ভিতরে আনি। এবার কাজের ছেলেটা দরজায় এসে দাঁড়ায়। বৃষ্টির মতিগতি বুঝতে চায়। কাল যে-বিষয়ে ওর পরীক্ষা, সেই বই দেড় মাইল দূরের এক ক্লাসমেটের কাছে। ভুলে হয়তো চলে গেছে– ওর অনুমান। বৃষ্টিবাদলার দিন। বেলাও পড়ে আসছে। ছাতা মাথায় ও বেরিয়ে গেল।
ঘণ্টাখানেক পর আমিও আরেকটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
ছেলেটা এখনও ফিরছে না। আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমা ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস’-এর মতো কিছু ঘটল নাকি! বন্ধুকে নোটবই পৌঁছে দিতে এক গাঁও থেকে আরেক গাঁও, আরেক গাঁও থেকে আরেক গাঁও…
বৃষ্টির মধ্যে এতিমখানার ছাদে কয়েকটা ছেলে দৌড়াদৌড়ি করছে। একটা রঙিন ঘুড়ি একঝলক দেখা গেল ছাদের ওপর ঝুঁকে-পড়া আমগাছের মগডালে। তাদের সঙ্গের একটি ছেলে লম্বা লাঠি নিতে নিচে নামে। আরেকটি ছেলে প্লাস্টিকের রঙিন জগ হাতে চাপকলের পানি আনতে যায়। আজ দুপুর থেকে কারেন্ট নাই। পল্লীবিদ্যুৎ অফিসও ফোন ধরছে না।
আমি ছাতা মাথায় আগে বাড়ি।
রাস্তাটা ফাঁকা। দুপাশে খোলা মাঠ। বিশাল আকাশ। সবুজ সজল প্রকৃতি। তালের সারির মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক কালো মেঘ উড়ে যাচ্ছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে হাঁটছি। মেঘ উড়ছে। আমি হাঁটছি। এক সময় ফিল করি– নিজের হাঁটার গতি মেঘের ওড়ার গতির সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। আমার পায়ের নিচে মাটি নাই। শরীরটাও নির্ভার। আরেকটু জোরে হাওয়া দিলে আমি ছাতা মাথায় আরও ওপরে উড়তে থাকব।

কুয়াকাটা
কুয়াকাটার কাউয়ার চরের ভোরবেলাটা মনে পড়ছে। ৩১/১০-এর ভোর। সূর্যটা পানির তল থেকে গলা তুলে ডিমের রাঙা কুসুমের আদলে ওপরে উঠতে থাকল। সবার মতো আমারও পলকহীন দৃষ্টি সেদিকে। পূর্ব দিগন্ত রাঙিয়ে সূর্যটা উঠছে তো উঠছে। ওঠা শেষ হলে এক টুকরা কালো মেঘ এর আধাটা গিলে ফেলল। হায় হায় রব উঠল আকাশে-বাতাসে-সমুদ্দুরে। আমি সৈকতের ভিড় ছেড়ে পায়ের পাতাপানি ভেঙে পুব দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমার গায়ে জলীয় বাতাসের ছোঁয়া আর উত্তাপহীন সূর্যের আলো। দৃষ্টিতে সোনারঙা মোহনীয় আকাশ। কানে দূরে সরে যাওয়া হইচই কোলাহল। আমার ডানপাশে ঝাউবন। বাঁয়ে সমুদ্র। বন আর সমুদ্র আমাকে মাঝখানে রেখে হেঁটে যাচ্ছে পুবে আরও পুবে, সাগরের মোহনার দিকে। বহুদিন আগে দেখা একটি মনোহর মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের মতো।

অসুখ
ঢাকায় এখনও ঈদের রেশ কাটে নাই। রাস্তা অসম্ভব ফাঁকা। অল্প সময়ে ধানমন্ডি থেকে গুলশান ইউনাইটেড হসপিটালে পৌঁছে গেলাম। আমার স্বামীর পেটস্ক্যানের অ্যাপয়েন্টমেন্ট তিন দিন পর পাওয়া গেল। তারপর রিপোর্ট পেতে আরও সাত দিন। যদিও বাইরের ডাক্তার দ্রুত রিপোর্ট পাঠাতে বলেছে, এখানে এ রকমই যেন হওয়ার কথা ছিল। তাই আমরাও মেশিনের মতো ধাপে ধাপে কাজ করছি।
যেমন আমরা ইউনাইটেড থেকে গেলাম জার্মান বুচার শপে। ঈদের ছুটিতে সাভার থেকে অরগানিক সবজি আসে নাই। জার্মান বুচারের ওপরতলায় টোকিও কিচেন। আমার স্বামী খাবার আইটেম সিলেক্ট করল স্যামন মাকি সুশি ও শোয়ু রামেন।
ও লাসিক্স (পেটের ফ্লুয়িড সরানোর ওষুধ) নিচ্ছিল বলে ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছিল। টোকিও কিচেনে ছেলেমেয়েদের আলাদা বাথরুম। তাও ছেলেদেরটায় সিঁড়ি ভেঙে নিচের তলায় নেমে যেতে হয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ওকে পেছন থেকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছিল।
আমার স্বামী কয়েক দিন ধরে বলছিল– টোফু কিনবে। ইউটিউবে এর রান্নার রেসিপি দেখেছে। টোকিও কিচেন থেকে বেরিয়ে আমরা বনানীর কোরিয়ান মার্টে গেলাম। ও টোফু কিনল, আমি নিলাম চাল-ভাজা ফ্লেভারের কোরিয়ান টিব্যাগ।
তারপর সংসদ ভবনের সামনে একটু ঘোরাঘুরি করে বাসায় ফিরলাম। দুজনে বলাবলি করছিলাম– আজ ঢাকা শহরে যানজট ছিল না। কত শান্তিতে ঘুরে আসলাম!
সামনে পেটস্ক্যান, এর রিপোর্ট কী আসে– তা যেন ভুলে থাকার এসব ছোট ছোট আয়োজন।

কাউ বেল্ট
প্রতিদিন এত এত ওষুধ কিনি! দোকানদার আসলে কী ভাবে? বুঝতে নিশ্চয় পারে– আমরা বাইরে থেকে এসেছি! তাদের দেশের লোক না, হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার দেখে অন্তত বোঝার কথা। কিন্তু বলে না কিছু। আমাদের দেশ থেকে শত শত রোগী আসে, ওরা মনে হয় তাতে ইউজড টু। ওষুধের দাম ফিক্সট। সব দোকানে টেন পারসেন্ট ডিসকাউন্ট।
গত সন্ধ্যায় ২১ নং সেক্টরের বাজার থেকে ওষুধ, রুটি, দুধ, ফ্রুটস কিনে ফিরছি। তখন গোধূলিই বলা যায়। শহরের গায় গোধূলির লাল ধুলার আস্তর। কয়েকটা গরু রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছে। হয়তো রাতের মতো ঘুমানোর জায়গা খুঁজছে। ওরা রাস্তায়ই চরে বেড়ায় সারাদিন। মনে হয় বেওয়ারিশ। তাহলে কী খায়? খাবার কই পায়?
আজ মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে দেখলাম– সামনের ছোট জঙ্গলে কয়েকটা গরু ঘুমাচ্ছে। তারপর ঘুমশয্যা থেকে হাঁটু ভেঙে উঠে আমার সঙ্গে হাঁটতে লাগল। আমরা পথশিশুদের চিনি। ওরা চঞ্চল আর দুষ্ট প্রকৃতির। কিন্তু পথগরু ধীরস্থির, শান্ত মেজাজের। রাস্তা পারাপারেও ট্রাফিক আইন মান্য করে। বিকালে গেস্টহাউসের সামনের নার্সারিতে দুটি গরু ঢুকল। একজনের জোড়া শিং পাক দেওয়া তাজা ফুল-পাতার মালা। আরেকজনের কপালে তিলক। দুটি সাজপাট করে জোড় বেঁধে বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়েছে। আমি তো ভাবলাম– আজ নার্সারির শিশুচারা, ফুল-টবের দফারফা। কিন্তু ওরা নার্সারির পায়ে চলা পথ ধরে বড় রাস্তায় উঠল। নাকে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ করে ফুটপাতের মরা ঘাস খেতে লাগল।
আমি গেস্টহাউসে ফিরে ছাদে কাপড় তুলতে গেলাম। পশ্চিমাকাশে হেলানো চাঁদটা ততক্ষণে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। দূরে গরু ডেকে ওঠে। রাতের জন্য খাবার না আশ্রয় চায়?

বাসাবদল
গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে বাসা শিফট করছি। বাসার সামনের রাস্তায় কতগুলি শূকরছানা পারাপার হচ্ছে। লিফটে জিনিসপত্র নামাচ্ছি আমরা। সকালে কেয়ারটেকারকে বকশিশ দিয়ে বলা হয়েছিল মালসামান নামাতে যেন হাত লাগায়। কিন্তু তার দেখা নাই। আর কালো পোশাকধারী দালালের তো ফোন বন্ধ গতরাত থেকে। ওর ভাড়া করা বাসা থেকে আমাদের চলে যাওয়া মানে ওর তীরের নিশানা থেকে ফসকে বেরিয়ে যাওয়া– তাই বোধ হয় এত গোসসা। কালো পোশাকধারী ঘণ্টায় ঘণ্টায় কী দরে যে আমাদের বিক্রি করেছে কেয়ারটেকারের কাছে! নামেই এয়ারবিএনবি, যখন-তখন রান্নাঘরের ঘটিবাটির ফর্দ ধরিয়ে দেয়। তার মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার, পানির ঝাড়ের মতো ওজনদার জিনিসও থাকে। কিন্তু সপ্তাহ শেষে যখন হাসপাতালের কাছাকাছি বাসা নিতে হবে, তখন কে গ্যাস সিলিন্ডার মাথায় বয়ে নিয়ে যাবে? বহুত টকরাটকরির পর সাব্যস্ত হয় কেয়ারটেকার তিন দিনের জন্য ব্যবহৃত সিলিন্ডার দেবে আর তার জন্য লাগবে সাড়ে ৪০০ রুপি। এর সঙ্গে তিন দিনের ক্লিনিংয়ের বিল আরও ৪০০ রুপি। যদিও ঘরদোর সাফসুতরো যা করার আমরাই করছি। দুই মাস এক সপ্তাহের সংসারের জিনিসে ঠাসা গাড়ি। উবার ড্রাইভারের চক্ষু গোল– এত মালসামান! হে হে আমরা তো আসলে বাসা শিফট করছি। কত জিনিসপত্র থাকে একটা সংসারে!
শহরের দক্ষিণ থেকে উত্তরে আশা-নিরাশায় দুলতে দুলতে যাচ্ছি। রাস্তা আর ফুরাচ্ছে না। লাসিক্স নিচ্ছিল বলে রাস্তায় আমার রোগীর ইউরিন চাপল। উবার চালক যেতে যেতে জুতসই জায়গা খুঁজছে। অবশেষে থামে রাস্তা মেরামতের ইট-কাঠ-পাথরের স্তূপের পাশে। সিলিকন ভ্যালিতে পেশাবের জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা মেলা ভার– বলতে বলতে আমার রোগীর পাশে ড্রাইভারও পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে যায়।
নতুন বাসায় এসে আমাদের স্বস্তি। বাসাটা হাসপাতালের কাছে। আর কালো পোশাকধারী দালালের মৃগয়া থেকেও জান হাতে পালানো গেছে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com