আনিফ রুবেদ
এক.
‘কার কবর রে এটা, হাঁইটা হাঁইটা যায়? কবর হাঁইটা হাঁইটা যায় ক্যান কইরা?’ বোজা বোজা চোখ থেকে জড়তা দূর করতে করতে লালমোহর আলি বলে ওঠে। যদিও উত্তর দেবার মতো তার আশপাশে কেউ নেই। কেউ তার আশপাশে সাধারণত থাকে না; অথচ তার ছেলেমেয়ে আর পোতা-পুতি বা নাতি-নাতনি-নাতবউয়ের পরিমাণ কম নয়; তারা তাদের তকতকে ত্বক নিয়ে থাকে; উজ্জ্বল চোখ নিয়ে উজ্জ্বল কিছুর দিকে তাকায়; লালমোহর আলির বলিরেখার ভাঁজে চোখ রাখে না; তাদের চোখ বুঝি করকর করে ওঠে; বলিরেখা কি বালিরেখাও তাদের কাছে!
তার বয়স আশি কি আটশ কি আট হাজার তা তার আর মনে নেই; অবশ্য এত বয়স পার করার পর বয়সের কথা বলা বা বয়সের হিসেব রাখার কোনো মানেও হয় না। মানুষের বয়স তিরিশ-চল্লিশ পার হয়ে গেলে; পঞ্চাশ-ষাট পার হয়ে গেলে তখন আর বয়সের কোনো দাম নেই; আশি বা আটশ সমান; তখন কবর আর বিছানা সমান; জীবন আর মরণের মান সমান।
হেঁটে যাওয়া কবরই লালমোহর আলির কথার উত্তর দেয়, ‘হামি জি বাপু; যে কবরকে হাঁইটা যাইতে দেখছ সেটা হামারই কবর; হামিই আছি এ কবরের ভেতর। জ্যাতা মানুষ যেমন পোশাকের ভেতর থাকে মৃত মানুষ তেমন থাকে কবরের ভেতর; কাফন হলো মৃত মানুষের স্যান্ডো গেঞ্জি আর মূল পোশাক হলো কবর।’
লালমোহর আলির মেজো ছেলে দলিলুর আলি মারা গেছে ছ’বছর আগে; আজ কেন তার কবর হেঁটে যাচ্ছে; হাঁটছে তো হাঁটছে কিন্তু কোনদিকে হাঁটছে; কেনইবা তার হাঁটার দরকার পড়ল! মনের ভেতর এসব কথা তৈরি হলেও লালমোহর আলি চুপ থাকে; মাথার ওপর বিশাল আকাশ; বিশাল আকাশে জায়গার কোনো অভাব নেই।
সে আকাশের দিকে তাকায় না; মাটির দিকে তাকায়; মাটির কলজে, মাটির হৃৎপিণ্ড, মাটির ফুসফুস ভেদ করে যেন তার চোখের দৃষ্টি ঢুকে যায় আরও গভীরে; একেবারে পৃথিবীর কেন্দ্রে। এভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের ভেতরে আবার জড়তা বাসা বাঁধে; ঝিম ধরে তার দেহে, চোখে। তার চোখের ভেতর শকুন শকুনি গৃধিনী মিছিল শুরু করে; দাবি আদায়ের মিছিল; দাবি আদায়ের মিছিলও ঠিক নয়, মিছিলটা হলো জানতে চাওয়ার মিছিল; ক্ষোভের মিছিল; তারা জানতে চায়, আজ যা করা হলো তা ছ’বছর আগে করলেও তো হতো? তাহলে এভাবে আমাদের মরতে হতো না। এই কাক শকুনগুলো হলো সেই কাক শকুন যারা ছ’বছর আগে না খেতে পেয়ে মারা গেছিল। যে কোনো একটা মরা গরু বা মহিষ বা মানুষ পেলেই তারা বেঁচে যেত।
এসব শকুন্ত কথা ভেদ করে আবার কবরের কথা ঢুকে লালমোহর আলি কানে, ‘হামি এখন নিরুদ্দেশ হয়ে যাব; এখানে থাকব না; জ্যাতা মানুষেরই যেখানে থাকার জায়গার সংকুলান হয় না সেখানে মৃত মানুষের মূল ডিহিতে বাস করা বিলাসিতা জি বাপু!’
‘কেনে রে ব্যাটা, এ রকম কহছিস কেনে? তোর ডিহিমাটি তো এত ছোটো লয়!’ লালমোহর বুড়া প্রশ্ন করলেও কবরটা আর কোনো উত্তর দেয় না, হাঁটতে থাকে। লালমোহর বুড়ার চোখ দিয়ে জলের বদলে হতাশা বের হয়, হতাশা বের হয়ে উড়ে যায় কোন দূরদিগন্তে; কোন বকের পাঁতির সাথে মিশে।
তার উড়ন্ত হতাশাপাঁতির দিকে তাকিয়ে থাকি আমি কিছুক্ষণ তারপর চলে যাই। লালমোহর আলির এসব একা একা বকবকানি শোনার সময় আর হচ্ছে না। মানুষ চলছে জামগাছের দিকে; আমাকেও যেতে হচ্ছে সেদিকেই; ওদিকে সম্ভবত কোনো ঘটনা ঘটে আছে; ঘটনার প্রতি মানুষের অসীম আগ্রহ; যদিও সব মানুষেরই জীবনের যোগফল কিন্তু ঐ ঘটনাই অথবা জীবন মানেই ঘটনা; জীবন মানে জঘন্য ঘটনার সমাহার বললেও খুব একটা খারাপ হবে বলে মনে হয় না।
দুই.
বিশাল জামগাছ। জামগাছের বিশালত্ব এতই যে এই বিশালত্বের আগে আরও কয়েকবার বিশাল লিখতে হবে; অন্তত এমন লিখতে হবে– বিশাল বিশালত্ব তার। এ গাছ নিয়ে আমাদের স্মৃতিসংবহনতন্ত্রে অনেক স্মৃতি জমা হয়ে আছে। ভোর হলেই আমরা গিয়ে হাজির হতাম ঐ জামগাছের তলায়। নিজের স্বভাবেই বয়স্ক জাম ঝরত অথবা জাম ঝরিয়ে ফেলত পাখিরা ঠুকরে ঠুকরে। আমরা কুড়িয়ে খেতাম।
প্রায় সারাদিনই জামগাছের নিচে কেটে যেত। জামের রঙিন আঁটিতে ভরে থাকত জামতলা। একটা জাম পড়লেই যতজন থাকতাম সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম জামের ওপর। কখনও কখনও অনেকের চাপাচাপিতে গলে যেত জামের মধু মাংস; মাংসহীন জামের হাড়ই মুখে পুরে চোষণ চলত। কখনও কখনও আস্ত জাম পেলেও সেটার ধুলো মুছে মুখে পোরার সময় পেতাম না; সাথে সাথে মুখে পুরতে হতো ধুলোসহ। তবু কত স্বাদ; অমৃত, অমৃত! বাড়ি ফেরার পথে, পথের মধ্যেই জিহ্বা বের করে দেখাদেখি করতাম, কার জিহ্বা কতটা রঙিন হয়েছে। সেসব কথা ভাবলে এখনও জল চলে আসে জিভে।
এখন বড় হয়েছি। জামতলাতে জাম কুড়াতে যাই না। এখন এও বুঝে গেছি যে, জামবাটি মানে জাম খাওয়ার বাটি নয়; জামবাটি মানে কাঁসার বড় বাটি। এখন ইচ্ছে হলেই বাজার থেকে জাম কিনে নিয়ে আসি; আশ মিটিয়ে খাই; বাড়ির লোকজনও খায়।
তবে ঐ জামতলাতে এখনও এখনকার শিশুদের জাম কুড়ানোর দৌড় জারি আছে। প্রতিদিন ভোরে ওখান দিয়ে গোসল করতে যাবার সময় দেখতে পাই জামতলায় জড়ো হয়ে আছে শিশুর দল। কী কী সব খেলা খেলছে। পাকা পাকা থোকা থোকা জাম রঙিন মধু হয়ে ঝুলছে; পাখিরা কিচিরমিচির করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। তাদের ঠোকরে কখনও কখনও ঝরে পড়ছে জাম। জাম পড়লেই সব শিশু ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদের এভাবে জামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে পাখিরা হাসাহাসি করে; হায় রে মানুষ উড়তে পারে না; উড়ে এসে ডালে বসে তাজা জাম খেতে পারে না। কখনও বাতাসও জাম ফেলে দুচারটে আর শিশুরা ঝাঁপিয়ে পড়ে; তখন বাতাস হেসে ওঠে; হায় রে মানুষ ‘থাকবে কিন্তু থাকবে না; থাকবে কিন্তু দেখা যাবে না’ এমন হতে পারে না; যেমন– এই যে আমি বাতাস, আছি কিন্তু নাই, আছি কিন্তু দেখা যায় না। পাখিদের হাসাহাসি, বাতাসের হাসাহাসি তাদের শিশুদের চোখে পড়ে না, কানে পড়ে না; শিশুদের গায়ে রঙিন ঘাম; ঘাম থেকে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে জামের সবুজ পাতায় পাতায়, বাতাসে বাতাসে।
এখন যখন জামতলায় এলাম তখন অবাকমাখা ব্যাপার ঘটে আছে দেখলাম। জামগাছের নিচে হিকমত ভাজাওয়ালা বসে আছে; আয়তন যতটুকু ছোট করে শামুক হয়ে বা গোল হয়ে থাকা যায় ততটুকু হয়ে। না, সে বারোভাজা বেচছে না এখন। হিকমত আলি লালমোহর আলির পোতা; তার যে ছেলে ছ’বছর আগে মরে গেছে; যার কবর কিছুক্ষণ আগে হেঁটে চলে গেছে তার চোখের সামনে দিয়ে সেই ছেলের ছেলে। সে গ্রামেই থাকে আর হাটে বাজারে গঞ্জে বারোভাজা বিক্রি করে।
হিকমত আলি এমনভাবে বসে আছে যেন পৃথিবীর ভেতর আর কিছু নেই; যা তাকে আকৃষ্ট করতে পারে বা বিকৃষ্ট করতে পারে। ভাবলেশহীন; ভাবশেষহীন দৃষ্টি যেন তার। শরীরের মাংসের ভেতরে থাকা রক্তের উত্তেজনা যত সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো ঘাম হয়ে বেরিয়ে শুকিয়ে গেছে; লবণের সাদা স্তর শরীরের কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে। লোকজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন কী কী কথা বলতে আছে। সে কিছুই বলছে না। সে কাজটা ঠিক করেনি ভেবে বসে আছে, না ক্লান্ত হয়ে বসে আছে তা তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে না।
তিন.
লালমোহর আলির সেই ছেলে দলিলুর, যার কবর কিছুক্ষণ আগে হেঁটে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল তার কয়েক ছেলে গ্রামেই থাকে আর কয়েক ছেলে বাইরের জেলায় থাকে। যারা এখানে– গ্রামেই থাকে– তারা ঝগড়া করে প্রায় রোজ; যারা দূর জেলাগুলোতে থাকে তারা খুব কম আসে। উৎসব-অনুষ্ঠানে আসে হয়তো মাঝে মাঝে। তাদের তকতকে চকচকে চামড়ার জেল্লায় গ্রামের চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে; তাদের শহুরে কথা শুনে লোকজনের কান হাঁ হয়ে যায়; তাদের গায়ের পোশাকের ঝলক দেখে তারা চোখ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
এবার তারা সকলেই এসেছে; জমিজমা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া দরকার। এসব পোতাপুতির কেউ খুব একটা দেখাও করেনি তাদের দাদা লালমোহরের সাথে; কেউ কেউ দুএকটা আপেল-কমলা বিছানার কোলে রেখে এসেছে অথবা দুএকটা কথা বলেছে মাত্র। এসব নিয়ে লালমোহরের আর কোনো অভিযোগ নেই, জীবন্মৃতের আবার অভিযোগ কী!
বাড়ির ডিহিমাটি ভাগও হয়ে গেল তিন-চার দিন আগে এবং যে যার জায়গায় ফিরে গেছে। কিন্তু হিকমত ভাজাওয়ালা ভাগ হওয়ার এই তিন-চার দিন পর বুঝতে পারল, তার ভাইয়েরা তাকে ঠকিয়েছে অথবা জিতিয়েছে। তার ভাগের জায়গায় পড়েছে তার বাপ দলিলুর আলির কবর। ব্যাপারটাকে জিতিয়েছে এই অর্থে ধরা যেতে পারে যে, হিকমত ভাজাওয়ালার কপাল ভালো যে, তার বাপের কবর তার ভাগে পড়েছে। কিন্তু ঠকেছে এই অর্থে যে, এই কবর বাদ দিয়ে বাড়ি বানাতে গেলে বাড়ি খুবই ছোট হয়ে যাবে। ব্যাপারটাকে হিকমত আলি ঠকে যাওয়া হিসেবেই নিয়েছে এবং তার ভাইদের ব্যাপারটা জানালেও তারা কর্ণপাত করেনি কেউই।
রাগে ক্ষোভে দুঃখে হিকমত আলি তার বাপের কবরের বেড়া ভেঙে ফেলেছে; কবরের গায়ে লাত্থি মেরেছে; লাঠিপেটা করেছে। কবরের রক্ত থাকলে রক্তের বন্যা হতো খুব। রক্তের বন্যায় তার ভাইদের বাড়ি ভেসে যেত; তার যে ভাইয়েরা অন্য জেলায় থাকে সেসব জায়গাতেও রক্তের রক্তোচ্ছ্বাস গিয়ে ভাসিয়ে দিত। কিন্তু কবরে রক্ত থাকে না; তাও ছয় বছরের পুরোনো কবর।
এই জামতলা থেকেও লালমোহর বুড়াকে দেখা যাচ্ছে; এসব ব্যাপারে সে কিছু জানে কিনা; জানলেও এসবের গুরুত্ব আছে কিনা কে জানে। সে বসে আছে একটা ছাতিম গাছের তলায়। তার কাছেই চলে যাওয়া ভালো বলে মনে হলো আমার; হিকমত আলি সম্পর্কিত এসব কাহিনি শোনার কোনো মানে হয় না।
চার.
লালমোহর বুড়া তার আশি বছর নিয়ে বা আটশ বছর নিয়ে বসে আছে; তার মাথার ওপর ছাতির মতো ছাতিম গাছ। ছাতিমের ছাতার তল থেকেই সে তাকিয়ে আছে জামগাছের মাথার দিকে। জামগাছের মাথার সাথে সে কথা বলছে গোড়ার সাথে নয়। জামগাছের গোড়ায় মানুষের গ্যাঞ্জাম; এখন জামগাছের গোড়ার সাথে কথা বলে লাভ নেই। জামগাছের চূড়াকে লালমোহর বুড়া জিজ্ঞাসা করে মানুষ সম্পর্কে। জামগাছের চূড়া বুড়ার কথার কোনো জবাব করে না, কারণ জামগাছের গোড়া বেশ ব্যস্ত আছে হিকমত ভাজাওয়ালা আর তাকে দেখতে আসা লোকজনকে নিয়ে; এবং চূড়াও ব্যস্ত আছে কী একটা নিয়ে যেন! লালমোহর আলি বুঝতে পারে না। সে জামগাছের গোড়ার সাথে বা চূড়ার সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। অনেকক্ষণ পর সে বুঝতে পারে, জামগাছের চূড়া কী নিয়ে ব্যস্ত আছে।
আমি যখন লালমোহর আলির কাছে পৌঁছেছি তখন আবার তার কথা শুনতে পেলাম। সে বলছে, ‘আহারে দলিলুরের কবর তুই কুন্ঠি একটু ঠাঁই পালি না; নিরুদ্দেশও হতে পাল্লি না, শ্যাষে গলায় ফাঁস দিলি।’ দলিলুরের কবর বলে ওঠে, ‘বাপুজি, মাটি নিয়ে, মাটির তলের বস্তু নিয়ে দুনিয়াতে যত কাইজ্জ্যা অন্যকিছুতে তেমন লয়; বাপুজি, হামার খালি মনে হছে, কেনে হামি জন্মেছিনু পিথীবিতে; কেনে হামাকে আন্যাছিল্যা এই মাটিতে!’ লালমোহরের চোখ পাথরের মতো; পাথর ফেটে টসটস করে জল ঝরছে।
আমাকে দেখতে পেয়ে লালমোহর আলি বলল, ‘বাপধন, তুমি কি দেখতে পাইছো জামগাছের সবচে উঁচু ডালটায় হামার দলিলুরের কবর ঝুলছে। হামার ছাইল্যার কবরটা মাটিতেও থাকতে পাইলে না।’
আমি জামগাছের দিকে তাকাই; কোনো কিছুই দেখতে পাই না। দেখতে পাই, সবুজ সবুজ জামের থোকা; ক’দিন পর পেকে বেগুনি রং ধরবে; দেখতে পাই, পাখি; পাখির বাসা; পাখির বাসায় গোডিম বাচ্চা চিঁউচিঁউ করছে।