সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ঘরের ভেতর নীল আলো

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩১ বার পড়া হয়েছে

প্রতিদিন ভোরে শহরটি সংবাদপত্রের মতো খুলে যায়। ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসে অক্ষর, ছবি, রক্তের গন্ধহীন খবর। এই শহরে দুজন মানুষ ছিল, ওরা শব্দ নিয়ে কাজ করত। একজন দূরের অলিগলি থেকে শব্দ খুঁজে আনত। আরেকজন সেগুলো গুছিয়ে রাখত আলোর নিচে।
তাদের একজনের নাম আকাশ, অন্যজনের নাম ঝর্না। শহরে তাদের একটি ছোট্ট বাসা ছিল। জানালার কাঁচে জমত ধুলো। তবু ভেতরে আলো থাকত। রাতে কম্পিউটারের স্ক্রিনে নীল আলো জ্বলত–যেন ঘরের ভেতর একটি ছোট আলোর সমুদ্র। সেই সমুদ্রে শব্দের ঢেউ ছিল। ছিল সমুদ্র কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল।
তাদের একমাত্র শিশুটি তখন পাশের কক্ষে ঘুমোত। তার ঘুম ছিল স্বচ্ছ। সে জানত না, শব্দেরও শত্রু থাকে। সেদিন রাতেও নীল আলো জ্বলছিল। বাইরে তখন নিঃশব্দ চরাচর। দূরে কুকুর ডাকছিল। ফ্যানের ঘূর্ণনে ছিল বাতাসের একঘেয়ে সুর। হঠাৎ দরজায় একটি ছায়া। তারপর আরেকটি। দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল– তবু ভেতরে ঢুকে পড়ল অন্ধকার। অন্ধকারের কোনো শব্দ ছিল না। শুধু ভয়ংকর উপস্থিতি ছিল। শিশুটির ঘুম ভাঙার আগে ঘরের ভেতর শব্দের দিক বদলে যায়। নীল আলো কেঁপে ওঠে। একটি চেয়ার উল্টে পড়ল। তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
ভোরে শহরটি আবার সংবাদপত্রের মতো খুলে যায়। এইবার প্রথম পাতায় দুটি ছবি। দুটি স্থির মুখ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে জমাট। পত্রিকা পাঠকরা পড়ে–‘হত্যা’।
‘তদন্ত’।
‘রহস্য’।
পড়শিরা ফিসফিস করে। কেউ বলে, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’।
কেউ বলে, ‘পেশাগত কারণ’।
কেউ বলে, ‘গভীর ষড়যন্ত্র’।
শিশুটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সে দেখে, যে দরজা পথে রাতের ভেতর অন্ধকার ঢুকিয়েছিল, সেই দরজা এখন খোলা। খোলা দরজার ভেতর শূন্যতা।
শব্দগুলো দ্রুত ছাপা হয়। কালি শুকায়। শহরটি শব্দ পছন্দ করে। কারণ, শব্দ থাকলে নীরবতা আঁচ করা যায় না। তদন্ত শুরু হয়। ফাইল খোলা হয়। ফাইলের ভেতর প্রশ্ন। প্রশ্নের ভেতর ফাঁক। একটি সংস্থা আসে। তারপর আরেকটি। ফাইল হাতবদল হয়। স্বাক্ষর বদলায়। কিন্তু নীল আলো আর জ্বলে না। কম্পিউটারটি টেবিলে পড়ে থাকে। স্ক্রিনে জমে থাকা ধুলোয় আঙুলের ছাপ কেউ খোঁজে না।
শিশুটি মাঝে মাঝে সেই টেবিলে বসে। সে কি-বোর্ডে চাপ দেয়। কোনো শব্দ ওঠে না। শহরটি প্রতিবাদ করে। মোমবাতি জ্বলে। মানববন্ধন হয়। ব্যানারে লেখা–‘আমরা চাই ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হোক’।
বাতাসে স্লোগান ভাসে। তারপর স্লোগান ক্লান্ত হয়। এক বছর যায়। দুই বছর। দশ বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ বদলায়। ফাইলের পাতায় সময় বাড়ে। তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ে। শিশুটি বড় হয়। সে জানে, দরজা বন্ধ থাকলেও অন্ধকার ঢুকতে পারে। সে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে–ঘরের ভেতর আবার নীল আলো জ্বলছে। মা হাসছে। বাবা কি-বোর্ডে শব্দ সাজাচ্ছে।
হঠাৎ স্বপ্নের ভেতর একটি ছায়া। সে চমকে ওঠে। জেগে যায়। ঘরে আলো নেই। শহরটি নতুন খবর নিয়ে ব্যস্ত। নতুন কেলেঙ্কারি। নতুন সহিংসতা। নতুন বিতর্ক। পুরোনো ছবিগুলো আর্কাইভে চলে যায়। তবু কিছু মানুষ ভুলে না। তারা প্রতিবছর সেই দরজার সামনে দাঁড়ায়। ফুল রাখে। ছবি তোলে। দরজাটি আর আগের মতো নেই। রং উঠে গেছে। কাঠে দাগ। দাগগুলো কথা বলে না। কিন্তু দাগগুলো মুছেও যায় না।
সময় গড়ায়। শিশুটি আর শিশু থাকে না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে স্মৃতিকাতর হয়। সে হাত রাখে কাঠের ওপর। তার মনে হয়, এই দরজা শুধু একটি ঘরের নয়–এটি একটি দেশের দরজা। যেখানে প্রশ্ন ঢুকে পড়ে, কিন্তু উত্তর ঢোকে না। সে ভাবে, শব্দের কি সত্যিই শক্তি আছে? যদি থাকে, তবে কেন শব্দেরা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না?
তার মনে পড়ে, নীল আলো কেমন ছিল। সাগরের মতো গভীর। রাতের মতো স্থির। সেই আলো এখন নেই।
শুধু স্মৃতি। শহরটি এখনও প্রতিদিন সংবাদপত্রের মতো খুলে যায়। প্রথম পাতায় নতুন মুখ। নতুন গল্প। কিন্তু কোথাও এক কোণে দুটি পুরোনো ছবি রয়ে গেছে। তাদের চোখে একটি অসমাপ্ত বাক্য। তদন্ত এখনও ‘চলমান’।
শব্দটি অদ্ভুত। এটি হাঁটে না, দৌড়ায় না। কেবল স্থির থাকে। শিশুটি–যে এখন বড়–নিজের ভেতর একটি দরজা বানায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, অন্ধকারকে নাম ধরে ডাকবে না। কিন্তু আলো জ্বালাবে। এক রাতে সে নিজের ঘরে একটি ছোট নীল বাতি জ্বালায়। স্ক্রিনে শব্দ লিখতে শুরু করে…
‘দরজা বন্ধ ছিল।’
‘অন্ধকার ঢুকেছিল।’
‘আলো নিভে গিয়েছিল।’
সে জানে, গল্প লিখলে মানুষ ভাবে এটি কল্পনা। কল্পনা হলে ভয় কমে যায়। কিন্তু কিছু গল্প কল্পনা নয়। বাস্তবের মতো কঠিন। শহরটি হয়তো একদিন ভুলে যাবে। ফাইল হয়তো ধুলোয় ঢেকে যাবে। প্রতিবেদন হয়তো আর আসবে না। তবু নীল আলো একবার জ্বলে উঠেছিল। এবং যে আলো একবার জ্বলে, তার স্মৃতি নিভে যায় না। দরজাটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কাঠের দাগে ইতিহাস লেখা।
রাত নামলে কখনও কখনও মনে হয় ভেতরে আবার কি-বোর্ডের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হয়তো সেটি বাতাস। হয়তো স্মৃতি। অথবা হয়তো–শব্দেরা এখনও কাজ করে যাচ্ছে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে। শহরটি প্রতিদিন খুলে যায়। প্রতিদিন বন্ধ হয়। কিন্তু সেই দরজা–যেখানে নীল আলো নিভেছিল–এখনও খোলা।
খোলা মানে ক্ষত। খোলা মানে অপেক্ষা।    এই অপেক্ষার যেন সমাপ্তি নেই।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com