ওপরের এই ভাবুকটা তোমাদের অনেক ভালোবাসতেন। তোমাদের জন্য লিখেছেন রাজ্যের ছড়া-কবিতা ও গল্প। নাম তাঁর সুকুমার বড়ুয়া। প্রিয় এই লেখকের জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি; চট্টগ্রামের রাউজানে। প্রিয় এই লেখক, প্রিয় এই ভাবুক ভাবতে ভাবতে আকাশের দেশে চলে গেলেন ২ জানুয়ারি ২০২৬। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই ভাবুকটার প্রতি রইলো পৃথিবীর সব ফড়িংয়ের পক্ষ থেকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। চলো, প্রিয় এই লেখক সম্পর্কে জানি। আর তাঁর নিজ হাতে লেখা সর্বশেষ অপ্রকাশিত ছড়াটি পড়ি…
পাঠ্যবইতে নিশ্চয়ই তাঁর ছড়া পড়েছো। না পড়লে কিছুদিন পরেই পড়বে। সুকুমার বা অতিকোমল এই মানুষটি শৈশবে মানুষের বাসায় কাজ করতেন। একবার তাঁর শৈশবের কথা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি একেবারে সাদাসিধা ছিলাম শৈশবে। খুব সহজ-সরল আর হাবাগোবাও বলা যায়। সবাই শুধু কাজের ফুটফরমাশে খাটাতে চাইত। কেউ মারলেও কিছু বলার সাহস ছিল না। গ্রামের সবাই আমাকে বিলাতি ডাকতো। বাবা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর কিছুদিন মামার বাড়ি থেকেছিলাম। মামিমা তখন নাম দিয়েছিলেন– সুকুমল। মামিমার দেওয়া সেই সুকুমলকে পরে আমি করেছি সুকুমার। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বংশগত বড়ুয়া। এছাড়াও নামের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চায়ের দোকানে কাজ করার সময় সুনীল, মাটি কাটার সময় অনিল, মুসলিম হোটেলে কাজ করার সময় নোয়ামিয়া…।’
বলছিলাম এই নোয়ামিয়া মানে আমাদের সুকুমার বড়ুয়ার জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিনাজুরি গ্রামে। পড়েছেন গ্রামের তিনটা স্কুলে। তাও সব মিলিয়ে আড়াই ক্লাস। শুরুটা করেছেন মামার বাড়ির স্কুলে। তারপর দিদির বাড়ির রাম মোহন এম. এ স্কুলে। সবশেষে পশ্চিম বিনাজুরির সোনাইমুখ উচ্চ বিদ্যালয়ে। এটাই শেষ! মোটামুটি অক্ষরজ্ঞান পাওয়ার পর স্কুল ছেড়ে কাজে বের হয়ে যান। তবে পড়া ছেড়ে যখন যে বাড়িতে, যে দোকানে কাজ করতেন সেখানে কোনো কাগজ পেলেই তা কুড়িয়ে পড়তেন। এমনকি মসলার প্যাকেটও হাতে নিয়ে খুব যত্ন করে পড়তেন। পড়তেন রাস্তার সাইনবোর্ডও। একবার তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘মানুষের বাসায় যখন কাজ করতাম তখন স্বপ্ন দেখতাম, আমি কিছু একটা হবো। সে সময় রাত জেগে পুঁথির গল্প শুনতাম। এসব শুনে শুনে নিজেকে কল্পনার রাজপুত্রও ভাবতাম। ছড়া লেখাটাও মাথায় এসেছে পুঁথি শুনতে শুনতেই। আমি যে বাসায় কাজ করতাম, সে বাসায় সুনির্মল বসুর হুলস্থুল বইটা পেয়ে তা প্রায় মুখস্থই করে ফেলেছিলাম। মাঝেমধ্যে বাসার সবাইকে বই থেকে মুখস্থ শোনাতাম। তারা তো অবাক হতো। এভাবে একদিন আমার লেখার ভাবনা মাথায় আসে। সেই ভাবনা থেকেই লেখা শুরু।’
ছড়া লিখে পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমিসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তাঁর বইগুলো হচ্ছে–পাগলা ঘোড়া, ভিজে বেড়াল, চন্দনা রঞ্জনার ছড়া, এলোপাতাড়ি, নানা রঙের দিন, চিচিং ফাঁক, কিছু না কিছু, ঠুসঠাস, নদীর খেলা, ঠিক আছে ঠিক আছে, কোয়াল খাইয়ে, ছোটদের হাট ও লেজ আবিষ্কারসহ এত্তো এত্তো বই।
২ জানুয়ারি তারা হয়ে যাওয়া প্রিয় এই লেখকের সর্বশেষ লেখা ও অপ্রকাশিত ছড়া পড়ি আর তাঁকে আকাশের দেশে খুঁজে বেড়াই, চলো–