কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে সূর্য ওঠার দৃশ্য, ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরকণায় সূর্যকিরণের ঝিলিক, শজনের ডালে ঘুঘুর নিঃশব্দ অপেক্ষা–এমন সব মুহূর্ত ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়েছে। বিল থেকে ডাঙায় উঠে আসছে হাঁসের পাল, গুল্মলতায় সারি বেঁধে বসে আছে প্রজাপতি, কোথাও সবুজ পাতার ওপর স্থির ফড়িং, কোথাও কাশবনে ঘেরা চরের মাঝে কৃষকের কুঁড়েঘর, সবুজ মাঠে একাকী খেঁকশিয়াল–প্রতিটি ছবি যেন এক একটি গল্প।
এ ধরনের দারুণ সব ছবি নিয়ে গতকাল শুক্রবার বনানীর বাতিঘর আর্ট স্পেসে শুরু হয়েছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রয়াত অভিনেতা আলী যাকের স্মরণে ‘মঙ্গলদ্বীপ’ এর আয়োজন করেছে। প্রদর্শনীর জন্য সারাদেশ থেকে জমা পড়ে ১ হাজার ৩০০টি আলোকচিত্র। বাছাইয়ের পর ৫০টি ছবি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচন করা হয়। প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনের অদেখা দিকগুলো তুলে ধরাই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন মেহেদী হাসান। তাঁর ‘মাতৃস্নেহ বাধা মানে না’ শীর্ষক ছবিটি। বাচ্চাকে নিয়ে এক মা বানরের কাঁটাতারের বাধা ডিঙ্গানোর দৃশ্য। দৃশ্যটি রচিত হয়েছে এই শহরেরই বারিধারায়। দ্বিতীয় হয়েছেন শোভন প্রসাদ আচার্য, তাঁর ‘দ্য নাইট ব্লুমার’ ছবির জন্য। তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছেন অনিক চন্দ্র, ‘অপেক্ষা’ নামের ছবির জন্য। ‘পাতার জানালা’ ছবির জন্য বিশেষভাবে মনোনীত হয়েছেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন ইরেশ জাকের, শংকর সাজওয়াল, সেফায়েত হোসেন এপোলো। প্রদর্শনীর কিউরেটর ফারজানা সেতু। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি’র নির্বাহী পরিচালক জুবায়ের আহমেদ বাবু।
প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী মেহেদী হাসান বলেন, ‘নগরজীবনে এখনও বানর টিকে আছে–বিষয়টি অনেকেই খেয়াল করেন না। বারিধারার ডিওএইচএস এলাকায় একটি মা বানর ও তার সন্তানকে কাঁটাতারের দেয়াল টপকানোর সময় মা বানর যেভাবে সন্তানকে আগলে রেখেছে, সেটিই আমি ক্যামেরাবন্দি করেছি। এখানে মাতৃস্নেহ যে কোনো বাধা মানে না–এ বার্তাটি রয়েছে।’
প্রদর্শনীতে চাকরিজীবী মনিরুল ইসলামের একটি ছবি স্থান পেয়েছে। শখের বশে ছবি তোলা এ আলোকচিত্রী জানান, দুই বছর আগে বোটানিক্যাল গার্ডেনে কচ্ছপের ছবি তুলেছিলেন। ছবিটি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হওয়ায় তিনি আনন্দিত।
স্নাতক পড়ুয়া সাজ্জাদ হোসেন দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে ছবি তোলেন। বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার নেশায় কোনো কোনো জায়গায় তাঁকে একাধিকবার যেতে হয়েছে। প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি ছবি স্থান পেয়েছে–একটি লালকাঁকড়া, অন্যটি সাপ ও প্রজাপতি। সাপের ছবিটি তুলেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে, আর লালকাঁকড়ার ছবি সুন্দরবনে।
বিচারক শংকর সাজওয়াল বলেন, ‘আলোকচিত্র সমাজকে শিক্ষা দেয়–এটাই এর বড় গুণ। এ শিল্পকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু বৈঠকখানা বা প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকলে লক্ষ্য পূরণ হবে না।’ বিচারক সেফায়েত হোসেন এপোলো জানান, ‘প্রথমে ৩০টি ছবি প্রদর্শনের পরিকল্পনা থাকলেও অনেক ভালো ছবি বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে ৫০টি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়।’
প্রদর্শনীর কিউরেটর ফারহানা সেতু বলেন, প্রতিটি ছবি আলাদা হলেও এগুলোকে একটি সামগ্রিক বয়ানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রদর্শনীটি আগামী ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত
চলবে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা এবং শুক্র ও শনিবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।