শীতকাল কখন আসে? কেউ কেউ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলবেন, এ আবার কেমন প্রশ্ন? বর্ষাকাল ফুরিয়ে শীত আসে। আশ্বিনে গ্রামে কুয়াশা পড়তে শুরু করে। আকাশে সন্ধ্যাবেলা মৃগশিরা নক্ষত্র জেগে থাকে। পায়ের নিচে ঘাস ভিজে যায় শিশিরে। শহরে অবশ্য আরেকটু দেরি করে আসে শীত।
সবই তো ভূগোল বইয়ের মুখস্থ কথা। আবহাওয়া অফিসের যন্ত্রপাতি আর নানা গূঢ় যান্ত্রিক কৌশল ঠাসা বাড়িটা আমাদের জানায় শীতকাল কবে আসবে। কিন্তু আমার কাছে শীতকাল অন্যভাবে আসে। ক্লান্ত এই শহরে আচমকা যখন কোনো নির্জন গলিতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পাতা পোড়ানোর বাদামি ঘ্রাণ টের পাই। দেখি আজও কোনো মধ্যবিত্ত বাড়ির ছাদে লাল রঙের লেপ ঘুমায় রেলিংয়ে, যখন রাত করে চায়ের কাঠের দোকানের বেঞ্চিতে কিছু লোক ঝুঁকে গভীর হয়ে বসে চায়ের কাপের কিনারায় অজানা দ্বীপ খুঁজে পায়, ঘাট ছেড়ে যাওয়া স্টিমারের বাঁশি অনেক অনেক দূরে নদীর হৃৎপিণ্ডে জমা কুয়াশার খবর জানায়, সিনেমা হলের বড় হোর্ডিংয়ে আগামী সপ্তাহের নায়ক আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো কোনো একলা রাতে তখন শীত আসে আমার কাছে।
শীতকাল কেমন স্মৃতিজাগানিয়া এক ঋতু। গলির মোড়ে অভিভূত কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে পড়ে কারও আবছা মলিন স্মৃতি গত শীতেও বাড়ি ফেরেনি। হারিয়ে গেছে যত্নে রাখা লন্ড্রির স্লিপ, কারও হাতে বোনা নীল সোয়েটার।
সেবার চা গাছের সবুজ দিয়ে ঘেরা ছোট্ট মফস্বল শহরটায় গিয়ে শীত খুঁজে পেলাম না আমরা কয়েকজন। শীত নেই। নভেম্বর রেইনও নেই। শহরের সরু রাস্তায়, কোনো জানালায় অথবা খোলা ছাদে পাওয়া গেল না সুপর্ণাকেও। তাই টি-বোর্ডের বারান্দায় গোল হয়ে বসা রাতের আড্ডায় মান্না দে আর গরলই আমাদের ভরসা। অনেক রাতে বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ হয়ে গিয়ে মান্না দে-কে ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দিল। আমরা কয়েকজন নিঝুম নির্জনতায় বসে থাকতে থাকতে টের পাই টিনের চালে টুপটাপ শব্দ করে কী যেন ঝরে পড়ছে। হিম? শীতের আগমন কালের রাতে গাছের পাতার শরীরে জমে থাকা ধুলোর আস্তরণের ওপর মৃদু তরলের পতনে চারপাশের ঝোপজঙ্গল সচকিত হয়ে উঠল? নাকি কোনো সাপ?
অলস শরীর মেলে বুকে ভর দিয়ে এগিয়ে চলেছে তার শীতনিদ্রার আয়োজনের দিকে? টের পেলাম, পাশের জঙ্গলের কোনো অচেনা গাছের শরীরে হয়তো মেঠো মাকড়সা জাল বুনতে শুরু করেছে। ওই বোনাটুকু ছাড়া তার তো আর কোনো কাজ নেই। একদিন ভোরবেলা শিশির জমে তার ওই সাধের জালটা ছিঁড়ে গেলে এ জন্মের কীর্তি শেষে শীতঘুমে যাবে সে-ও।
পাশে বসা এক বন্ধু দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করে। প্রথম কাঠিটার মাথায় প্রজ্বলিত আগুন দপ করে নিভে যায়। ঠান্ডা হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় শীতের খোঁজে আসা কয়েকজন মানুষকে। সামনের চেয়ারে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকা এক বন্ধু বলে ওঠে, ‘শীতের হাওয়ার শরীরে কেমন একটা ঘ্রাণ আছে; টের পাচ্ছিস?’
শীতের হাওয়ার শরীরে কীসের ঘ্রাণ? কোনদিক থেকে আসছে হাওয়া; ওদিকে কি সুপর্ণাদের বাড়ি? মাথা ঠোকাঠুকি করে কখনও অনেক প্রশ্ন উত্তর খুঁজে না পেয়ে। আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে গেছে ছোট্ট শহরের জীবন। শহরের পরে ছড়িয়ে যাওয়া গ্রামগুলোও। অতি বয়স্য যারা, যাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু কঠিন শীতকাল তারা কি আবার যত্নে গুছিয়ে রাখবে কাশির ওষুধ, সবুজ রঙের মাফলার; ডাক্তারের কাছে গিয়ে নানা প্রশ্ন করে তার কান ঝালাপালা করবে? কী জানি … জগতে সব প্রশ্নের তো উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। শীতের ভাবনার ভেতরে জড়িয়ে যাই আমরা সবাই। মফস্বলে শীত খুঁজতে এসে চোখ বন্ধ করে টের পাই, কবেকার পুরোনো এক ভোরবেলা শিশির ঝরে পড়ছে বড় বড় ফোঁটায়। মাঠে শক্ত হয়ে বসে আছে কুয়াশা। একলা একা কোনো খেজুর গাছের গলায় বাঁধা মাটির কলস; খেজুরের গাঢ় সোনালি রস গড়িয়ে নামছে তাতে। শীত খুঁজতে আসা শহুরে কয়েকজন মানুষ টের পায় শীত নেমেছে মাঠে মাঠে। চোখ বন্ধ করে তারা দেখতে পায়, কোথায় যেন এক গ্রামের জীবনে শীত নেমেছে। তাঁতিপাড়ায় শীত উপেক্ষা করে অবিশ্রান্ত চলছে তাঁতকল। ঘরের ভিতরে হারিকেনের নিভুনিভু চোখেও শীতের ঘুম। জীবনানন্দ দাশ হয়তো এমনি সব শীত-রাতের কথা ভেবে লিখেছিলেন, ‘‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;/ বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা।’’
ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার আগে গত শীতে যে পরিযায়ী পাখির দল বলে গিয়েছিল, আবার দেখা হবে তারা নিশ্চিত এই ভীষণ হাড়কাঁপানো শীতে কি ফিরে আসবে? গত পিকনিকে প্রেমিকাকে ছুঁতে চাওয়া হাত এবার সফল হবে? কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে অনেককাল পরে। কড়া লিকারের দুধ চা নিয়ম ভেঙে ঢুকে পড়বে গল্পে। হাই তুলবে পথের কুকুরটাও গভীর আলস্যে। মিষ্টির দোকানে হাত নেড়ে মাছি তাড়ানো লোকটা জানাবে, শীতে কোন মিষ্টি ভালো লাগে খেতে।
উনিশ শ উনসত্তর অথবা সত্তরের শীতকাল এ রকম ছিল না। তখনকার রেসকোর্সের কুয়াশাময় নীল মাঠে জমে থাকত শীত। আকাশি নীলরঙা পুলওভার গায়ে ভোরবেলা স্কুলে যাওয়ার পথে কালো, ধূসর অথবা ছাই রং রেসের ঘোড়াগুলোকে ছুটে আসতে দেখতাম। ঘোড়ার জকিরা একটু ঝুঁকে বসে ঘোড়াগুলোকে ছুটিয়ে নিয়ে যেত। নাকমুখ দিয়ে সাদা ধোঁয়া বের করতে করতে আমি টের পেতাম শীতকাল তার বিষণ্ণ ছুরিতে গেঁথে ফেলবে আমাদের। পঁচাত্তর পয়সা রিকশা ভাড়া অথবা টিফিনে ক্যান্টিনের শিঙাড়া শীত থেকে মুক্তি দেবে না আমাদের।
এখন নিদারুণ শীত বয়ে চলেছে এই শহরের স্নায়ুতন্ত্রীতে। আবহাওয়া অফিসের ঘুম নেই। তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে। কবে ষাটের দশকের কবি ভাস্কর চক্রবর্তী কবিতায় প্রশ্ন করেছিলেন, শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা? কবি আবুল হাসানের ‘স্বাতীর সঙ্গে এক সকালে’ কবিতায় আছে এ রকম লাইন, ‘‘বোকা বোকা একটি লোক/ কমলালেবু হাতে দাঁড়িয়েছে বারান্দায় স্বাতীর সম্মুখে!’’
স্বাতী অথবা সুপর্ণা কি কমলালেবু ভালোবাসে? মৃত্যুশয্যায় জীবনানন্দ দাশ কমলা খেতে চেয়েছিলেন। কমলালেবু শীতের অদ্ভুত ঘ্রাণ বয়ে নিয়ে আসে আমার কাছে। এই নগরীতে এখন শীতে ঝলমল করে দামি সব কেক-পেস্ট্রির দোকান। সুশোভন কফিশপ ডালপালা বিস্তার করে তরুণ-তরুণীদের ডেকে নিয়ে যায় হৃদয়ের কাছে। অথচ একদা ঠোঁট পোড়ানো চায়ের গরম চায়ের কাপ আর টং দোকানই ছিল ভরসা। শীতের সকালগুলো এই শহরের পাড়ায় পাড়ায় জেগে উঠত মাঠাওয়ালাদের হাঁকডাকে। কমলালেবুর ঝাঁকা মাথায় সেই লোকটার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম আমরা। শীত এগিয়ে আসত। নতুন পাঠ্যবই, রং পেন্সিল কত কী অপেক্ষা করত আমাদের জন্য নিউমার্কেটে।
শীতে মৃত্যু উপেক্ষা করে লিখে চলেছি, শীতে দুঃখ অতিক্রম করে অক্ষর গেঁথে চলেছি … মানুষের শরীর শীতে জমে শক্ত হয়ে আছে মৃত কাঠের মতো। খবরের কাগজ ছেপে চলেছে তাপাঙ্ক ক্রমশ নেমে যাওয়ার খবর। মানুষের দুঃখকষ্টের খবর, দুর্ঘটনার খবর। এই তীব্র শীতে ফুটপাতে ঘুম ভেঙে ওঠে বসে যে শিশুটি তার এখন রোদ চাই, অনেক কমলা রঙের রোদ চাই। তার চোখে-মুখে জেগে থাকে শীতের ছুরির আঘাতের দাগ; পাকস্থলীতে লেখা হয় ক্ষুধাবিষয়ক উপন্যাস। শীতকাল তার কাছে কখনও আরব্য রজনীর গল্পের মতো নয়। তার কাছে এই দেশে আজও সূর্যই ভরসা।
শীতের আয়ু খুব দীর্ঘ নয় এই ক্রান্তীয় সূর্যের দেশে। কয়েকটা মাত্র স্লিপে লেখা থাকে আমাদের শীতের গল্প। কার্তিকের নীল কুয়াশায় আমাদের ঝরে যাওয়ার গল্প লেখেন কবিরা, কথাশিল্পীরা। আমরা তাই কবিতার চরিত্র সুপর্ণার কাছে জানতে চাই শীতকালের কথা। আচ্ছা, সুপর্ণা কি শীতের ঈশ্বর? কোথায় থাকে এই অদৃশ্য নারী? কবিতা থেকে বের হয়ে এক মস্ত কাঠের জাহাজের মাস্তুলে ওড়ে কি শীতে সুপর্ণার ধূসর হয়ে যাওয়া শাড়ি? নাকি আজও সে বুনে চলেছে অনন্ত কারও জন্য এক সোয়েটার? উলের বলে জড়িয়ে গেছে তার একটু উষ্ণতার গল্প।
শীতকাল উষ্ণতার গল্পের হাতও ছেড়ে যায় না। মাঠে মাঠে আগুন জ্বালে কারা যেন। শহরের ফুটপাতে। এই দেশে তো ঘরহীন মানুষ আগুনকে শেষ সম্বল জেনে আজও জ্বেলে রাখে। পথের পাশে পিঠার দোকানে পোড়া কাঠ আর গুড়ের মৃদু ঘ্রাণ ডুবন্ত যাত্রীর মতো হাত-পা নাড়ে এই তীব্র শীতে। সংবাদপত্র অফিসে রাতের পালার কোনো রিপোর্টার একমনে লিখে চলে শীতের গল্প। আবহাওয়া অফিস তোলপাড় করে জেগে ওঠা হাড় হিম করা শীত যেন আর কাটতে চায় না। সানশেডে ভোরবেলা একা বসে থাকা ছোট্ট চড়াইয়ের ঠোঁট থেকে ঝরে পড়ে শীতে তার ভবঘুরে হওয়ার গল্প।