ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকের দেয়ালে এখন নিভৃতির ফিসফাস। সেখানে রঙেরা কথা বলছে, আলোছায়ায় মগ্ন সুর ভাসছে। শিল্পী আজওয়াদ আহমেদের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘নিভৃতির আলোকিত ছায়ায়’ ছবি শুধু দৃশ্য নয়, বরং অনুভবের সাধনা। তুলি শুধু আঁকছে না, আত্মার অন্তর্লোককেও উন্মোচিত করছে।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিত্রকলায় শিক্ষা নেই। তবু আজওয়াদের রং ব্যবহারের দক্ষতা ও অভিব্যক্তির গভীরতা প্রশংসা কুড়িয়েছে শিল্পবোদ্ধাদের কাছ থেকে। উদ্বোধনী বক্তব্যে শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, “আমার কাছে ভালো লেগেছে তার রঙের ব্যবহার। বাস্তবতার দিকেও খানিকটা যাওয়ার ইচ্ছা আছে মনে হয়। তাকে উপদেশ হিসেবে বলি—তুমি যেভাবে কাজ করছো, সেইভাবেই করো। আধুনিকতা সবদিক থেকেই হতে পারে। বাস্তবতাও আধুনিকতা হতে পারে, সেমি–স্ট্রাকচারও হতে পারে। তুমি নিজের ভাষাতেই কাজ করবে, আর সেই দিকটাকেই আলোকিত করবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক ডিন, প্রদর্শনীর কিউরেটর অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, “আজওয়াদের ছবিগুলো শুধু ছবি নয়, এক ধরনের মেডিটেশন। যেন প্রতিটি ক্যানভাস একেকটি সাধনার আসন। এখানে উপাসনা আছে, সাধনা আছে। নিজেকে প্রশ্ন করে জানার যে ভ্রমণ, তা আজকের অস্থির সময়ে বিরল। দ্রুত শিল্পী হতে চাওয়ার আগে মনে রাখতে হবে, শিল্প প্রথমে ধ্যান, তারপর প্রকাশ। সর্বোপরি সাধনার বিষয়।”
আজওয়াদের জন্ম ১৯৯৫ সালে। নিভৃতচারী স্বভাবের কারণে তার প্রতিভার সন্ধান পেতে স্বজনদের বেগ পেতে হলেও, পরিবারের সমর্থনে শিল্পযাত্রা পেয়েছে ভিত্তি। দর্শন ও শিল্পকলায় উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার সময় তিনি বিমূর্ত প্রকাশবাদী ধারার রং, রেখা ও অনুভবের মুক্ত বিন্যাস দিয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। এর সাহসী ছাপ স্পষ্ট তার ক্যানভাসে। প্রদর্শনীতে স্থান পায় সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা তার প্রায় ৪০টি চিত্রকর্ম।
নিভৃতির ছায়া থেকে উঠে আসা আলো এখন আর একা হাঁটে না। দর্শকের চোখে, গানে, কথায়, প্রশংসায় বহুরঙে প্রতিফলিত হয়। আজওয়াদের বিভিন্ন রঙের মিশেলে তৈরি ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের জন্ম নিভৃতিতে, কিন্তু এর সার্থকতা মানুষের মাঝে পৌঁছানোর অভিযাত্রায়। সেই যাত্রায় রঙই তার ভাষা এবং আলোছায়াই তার দর্শন। তবে শিল্প গুরুমুখী ও শিল্পের পথযাত্রার শেষ নেই। আজওয়াদ মূলত এখানে তার প্রতিশ্রুতির স্মারক রেখেছেন। দর্শক ও সমালোচকরা বিশ্বাস করেন, আগামীতে চিত্রশিল্পের ভুবনে তাঁর অনুধ্যান নিবিড়তর হবে, এবং আমাদের তিনি গভীরতর শিল্পকর্ম উপহার দিতে পারবেন। অবয়বের কাঠামো ও বিন্যাস সুচারুতা ও স্বকীয়তার পথে আরও এগিয়ে যাবে। রং ও আলোছায়ার একমাত্রিকতাকে তিনি ছাপিয়ে গেছেন। ক্রমশ তাঁর চিত্রচিন্তায় ভূয়োদর্শনের ছাপ পড়বে, অভিব্যক্তি বহুস্তরে বিন্যস্ত হবে। পৃথিবীর মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর ছবির সম্পর্ক হয়ে উঠবে আরও দৃঢ়মূল।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের পর্দা তুলেছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ও দেশবরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ও শিল্পসমালোচক জাভেদ জলিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছেন বিশিষ্ট শিল্পসমালোচক অধ্যাপক মইনুদ্দিন খালেদ। উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য কলাতাত্ত্বিক, শিল্পী,পরিবারের সদস্য ও বহু দর্শক। ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল গ্যালারি।