আকবর বাদশাহর শত ছেঁড়া জোড়াতালি আলখাল্লা থেকে কখনও বেরিয়ে আসে একটা সবুজরঙা আহত ফড়িং। দুষ্টু বালকের হাতে সুতোয় আটকে থাকে। কখনওবা বের হয়ে আসে একটা লালরঙা আজব সুন্দর মাছ, কখনো শ্যাওলা পড়া কালো কাঁকড়া। সবই সে ছেড়ে দেয়। যে চরের পাশে সে দাঁড়ানো থাকে তার পার্শ্ববর্তী জলে নয়তো মুক্ত স্বচ্ছ আকাশে। চরের বালু, শিশুদের চোখ আর বউদের কাচের চুড়ি চিকচিক করে। সামনে আগত নদীপারের কিছু দরিদ্র উৎসুক শিশু হাততালি দেয়। প্রাকৃতিক জাদুতে বিভোর। চোখ বন্ধ করে আকবর বাদশাহ একটু দম নেয়। হাত দুটো প্রসারিত করে ছন্দ তোলে পানির ঢেউয়ের মতো। ফের হাত প্রবেশ করায় আলখাল্লায়। এবার সেই শততালি দেওয়া রংবেরঙের আলখাল্লা থেকে বেরোয় একটা সাদা শোলার কদম ফুল। নয়তো ম্যাজেন্টা-রঙা ফিনফিনে কাগজের ফুল, একঝাড়। কখনও একমুঠো দুধসাদা বাতাসা। বাতাসা মুহূর্তেই বিলিবণ্টন হয়ে যায় সামনের খুদে দর্শকদের মাঝে। সে আবার চোখ বন্ধ করে জোরে দম নেয়। দুই হাত প্রসারিত করে পানির ঢেউয়ের মতো ছন্দ তোলে। এবার সামনের খুদে দর্শকদের উদ্দেশে নাটকীয় ভঙ্গিতে ডুগডুগি বাজানো শুরু করে। শরীর দুলিয়ে বলে–
“পাহাড়ের ঝরনা আছে,
বনের রাজা সিংহ আছে
আরে বাঘ-ভালুক সামনে নাচে,
দেখতে কত বাহার আছে।
ডানে বায়ে নজর করো,
সুন্দরবনে চইলা গেল…”
সামনে দাঁড়ানো শিশুদের সঙ্গে দু-এক সময় কোনো এক বাড়ির ঘোমটা দেওয়া বউও হয়তো জুটে গেছে। তাকে আর বাঘ-ভালুক, ঝরনা-পাহাড় দেখানো হয় না। তাকে দেখানো রহিম রূপবান। সেখানে হয়তো রহিমের একটা কান অনুপস্থিত অথবা রূপবানের বয়স বোঝানোর জন্য একটু বেশি-ই স্থূলকায়। তবু পারের বাড়ির বউ মুগ্ধ হয়েই তা দেখে।
রঙিন টিনের বায়োস্কোপের বাক্সের খেলা একসময় শেষ হয় প্রতিদিনের মতো। সে সবকিছু কাঁধে তুলে রওনা দেয় সেদিনের মতো। পারের খুদে শিশুরা তার পেছনে কিছুদূর হইহল্লা করে এগোয়। পারের বাড়ির বউ সেদিনের মতো ঘরে ফেরে, কিন্তু তার গল্প নতুন করে রচিত হয়। এক অচেনা জগতের অদেখা অসম বয়সের প্রেমের গল্প। রঙিন টিনের ভেতর মজুত প্রেমের গল্পের সঙ্গে বাস্তব, ধর্ম, সমাজ সবকিছু সে ভাবে বাকি দিন। এমনকি দুপুরের নিস্তব্ধতায় সে ফুলতোলা কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে ভাবে। ভাঙাচোরা কাঠের জানালা দিয়ে দৃষ্টি থাকে পারের সমতল বালু, পানির দিকে, দূরে। যেখানে বায়োস্কোপওয়ালা আকবর বাদশাহ দাঁড়িয়ে তার তেলেসমাতি সব কাণ্ডকারখানা দেখায়।
ওদিকে আকবর বাদশাহ যখন দুলে দুলে হেঁটে সেদিনের মতো হারিয়ে যায়। মিলিয়ে যায় অস্তমিত লাল সূর্যের ঠিক মাঝখানে আরেক জাদুর মতো।
পাশের মরে পড়ে থাকা শাখা-প্রশাখাযুক্ত যে গাছ, সেখানে বসে থাকতে দেখা যায় আরেক তরুণকে। এলাকায় নতুন আসা এই যুবককে কেউ চেনে না। তাকে কেউ ঘিরেও ধরে না। তার কাছে কোনো জাদু নেই।
২
মধ্যদুপুর। পথের পাশের বেগুনি রুয়েলিয়া ফুল এখানে খুব মলিন, রুক্ষ। ধুলোয় আসল রঙটাই হারিয়ে গেছে। অনেকদিনের ব্যবহৃত নীল পলিথিনের রং জ্বলে যেমন ফ্যাকাশে নীলচে হয়, মাথার ওপর আকাশটাও একদম ওরকম। সবকিছু ঠিক এখানকার মানুষগুলোর মতোই বিবর্ণ। হাতের ডানের পুকুরের পানি স্বচ্ছ হওয়ার বদলে ঘন সবুজ, কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা। চারপাশে আবর্জনায় ভরা। হাসপাতালের রোগীদের ফেলে রাখা প্যাকেট, পারের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্য। হাসপাতালের সামনে অনেক রিকশা, হলুদ অটো। এখানের ঠিক সামনে এসে বাস থামে যদি আগেই বলে রাখা হয়। এরপর বাসটা আরও সামনে এগোয়। ফেরির ঠিক আগে থামে। এবড়ো-থেবড়ো পথ পেরিয়ে সামনে হাসপাতাল। যাওয়ার পথেই বাঁ পাশে একটা টং চায়ের দোকান। মাথায় উঁচু চূড়া করা খোঁপা, দুহাত ভর্তি চুড়ি, সুডৌল স্তনের এক মহিলা বসে টাকা গুনছে। সবকিছু নিয়েই সে গর্বিত। অনেক রোগীর লোক, হাসপাতালের দালালরা এরই লোভে প্রতিবার এক কাপ চায়ের বদলে দুই কাপ খায় এবং রাতে নিদ্রাহীনতায় ভোগে। পরদিন একই আকর্ষণে সেখানে উপস্থিত হয়। হাসপাতালের অবিবাহিত চিকিৎসক তরুণদের একজনের সঙ্গে ইতিমধ্যে সে শয্যায় গিয়ে আরও গর্বিত। এমনই এক নাম সংজ্ঞাহীন দুপুরে, সবুজপানা পুকুর, সুডৌল স্তনের চা-ওয়ালিকে ছাড়িয়ে স্বাস্থ্যবান, বেলুন পেট নিয়ে একজনকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। একটু আগে তাকে ‘সোহরাব রুস্তম’ বাস নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে। তিনি আজ উপজেলা হাসপাতাল প্রধান হিসেবে যোগ দেবেন। এমনিতেই অস্থির, আজ আরও বেশি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই উপজেলায় তার বদলি হয়েছে। সরকার পতনের পর ওনাকে তেঁতুলিয়া পাঠানো হয়েছিল। তার ক্লিনিক ব্যবসা, রোগী দেখা ফাঁকে ফাঁকে, বাড়িঘর করে ভাড়া দেওয়া সবকিছু এদিকে। এদিকে আসার সবকিছু ব্যবস্থা করার পরেও বারবার বাতিল হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে এই উপজেলাটা একটু দূর হলেও তিনি এদিকে ফিরতে পেরেছেন।
হেমন্তের এই দুপুরে তিনি আসার পথে তার উপজেলার আওতায় যা সামনে পেয়েছেন, নেমে দেখে এসেছেন যোগদান করার আগেই। কাজের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সানন্দে নানা খাতে টাকা নেওয়ায় খুব দক্ষ। পথের রুয়েলিয়া ফুল মাড়িয়ে তিনি একতলা ছাড়িয়ে দোতলায় ওঠেন। তখন বাম পাশের রুমে পর্দায় ঘেরা রহস্যময় তরুণকে রোগী দেখতে দেখা যায়। ঘরভর্তি রোগী। বাইরে একজন লোক বসিয়ে সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। ভেতরের রোগী দেখছে তরুণ চিকিৎসক। যারা টাকা দিয়ে দেখাচ্ছে, তাদের অগ্রাধিকার। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষাও দেওয়া হচ্ছে ঠিক করা পাশের একটা জায়গায়। লভ্যাংশ পায়। ইদানীং ঝুঁকি বেশি নিয়ে ফেলছে।
শীত, বসন্ত, বর্ষা যা-ই আসুক, কখনও আয়োজন করে সে আকাশ দেখেনি। পথের রুয়েলিয়া ফুলের নামটা পর্যন্ত সে জানে না, খেয়ালই করেনি। তরুণ চেনে শুধু গোলাপ ফুল। এখানে আসার প্রথমদিকে দুপুর একটা-দুটোর পর ভিজিট নিয়ে ব্যক্তিগত রোগী দেখত। ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে অফিসের সময় দেখলেও কেউ কিছু বলে না। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের লোকজন কেউ কেউ তার বন্ধু। মাঝেমধ্যে তাদের চা-নাশতা করাচ্ছে, প্যাড কলম দিচ্ছে বা হাসপাতালে এলে আগে দেখে দিচ্ছে। সবকিছু সমঝোতায় চলছিল।
সরকার পতনের পর হাসপাতাল প্রধানের বদলি হওয়ায় তরুণ ভারপ্রাপ্ত হয়। দারুণ ব্যস্ত, দিনক্ষণ কিছু দেখবার অবসর নেই। মাঝেমধ্যে তার ঘরে উড়ে আসা প্রজাপতি দেখে সবাই মুখ টিপে হাসে, বলে– “বিয়ার ফুল ফুটতে আর বেশি দেরি নাই।” শুধু সেই মুহূর্তে সে ভেতরে-ভেতরে অস্থির হয় কিন্তু বাইরে আরও গম্ভীর হয়ে পড়ে। জরুরি বিভাগের রোগীরা এলেও সে সেলাইসহ সবকিছুর জন্য টাকা নেয়। হাসপাতালে না করিয়ে পাশের ক্লিনিকে নিয়ে সিজার করে প্রসূতিদের। নানা জায়গা থেকে টাকা আসে। ছেলের টাকা বাবা সুদে খাটায়। মাঝখানে ছেলের বিয়ের কথা ওঠে। সাফল্য, আত্মবিশ্বাস তখন চূড়ায়।
বাবা-মা চিকিৎসক- এমন এক চিকিৎসক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েও ভেঙে গেল। কারণ মেয়ের পরহেজগার বাবা একদিন না জানিয়ে দেখতে আসে। দেখে পাত্র টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে চেয়ারে আধাশোয়া, সিগারেট ফুঁকছে। ধোঁয়ায় পুরো ঘর গন্ধময়, অস্পষ্ট।
বিয়ে ভেঙে গেলে তরুণ চিকিৎসকের কিছু যায় আসে না। এ রকম মেয়ে যাবে আসবে। পরের ঠিক হওয়া বিয়েটা কনেকে সস্তা সব জিনিস দেওয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ভেঙে যায়। এরপর আরও একবার বিয়ে ভাঙে। তারপর আরো একবার। একটা সময় সে অধৈর্য হয়ে পড়ে। টানা রোদের শামিয়ানায় পথের পাশের রুয়েলিয়া ফুলও একসময় নেতিয়ে পড়ে, জ্যোৎস্নার ছায়ায় কোনোমতে বাঁচার চেষ্টা করে। টেন্ডারের কাজে যখন তরুণ চিকিৎসক আর হাসপাতাল-প্রধান ঢাকায় যায়, তখন ঠিকাদার আজিজ মিয়া তার সুন্দরী মেয়েকে ব্যবহার করে। তরুণ সেই টোপ গিলে ফেলতে চায় ঠিক ক্ষুধার্ত মাছের মতো। তাকে আবার সবাই মিলে সাবধান করে ফেরায়। বলে– “হেই মাইয়্যা লাল গোলাপ ফুলরে নীল বিষের সাপ বানায়, তারপর দংশন করায়। সাবধান!” তরুণ লাল গোলাপও ভালোবাসে আবার নীল বিষের সাপের দংশনও ভয় পায়। সুতরাং দিগ্ভ্রান্ত হয়। সে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে আসে। ঠিকাদারির কাজে বিধ্বস্ত নয়, বরং পেতে রাখা প্রেমের ফাঁদে।
৩
কয়েকদিন সমুদ্র উত্তাল থাকে। আকবর বাদশাহকে কেউ রঙিন টিনের বাক্স বা জাদু নিয়ে আসতে দেখে না। দেখে না দূরের অস্ত যাওয়া লাল সূর্যের ভেতর হারিয়ে যেতে। তরুণকে ঠিকই দেখা যায়। বালুর পারের মরা গাছের ওপর বসে থাকতে, আনমনা। এ সময় কাছে কেউ থাকলে হয়তো দেখতে পেত, তার চোখের কোণে পানি চিকচিক করে। পারের বাড়ির বউ ক’দিন ছটফট করে ঘরের ভেতর। দমকা হাওয়া, বৃষ্টি একটু কমে গেলেই দৌড়ে জানালা খোলে। দৃষ্টি যায় সরাসরি দূরে মরা গাছের ওপর বসা তরুণের দিকে। মন আরও ভারী, স্যাঁতস্যাঁতে হয় বাইরের বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে।
একদিন সে পাশের ঘরের বাচ্চা ছেলেটিকে পাঠায়, ঘরে এসে বসতে বলে। তরুণ আসে না। তার পরদিন আবার পাঠায় ছেলেটিকে। তার ওপরের দিন আবার। অবশেষে তরুণ এসে বসে ঘরে, কিন্তু কোনো কথা বলে না। তাকে রং চা আর মুড়ি দেওয়া হয়। নিঃশব্দে খায়। পারের বউয়ের সঙ্গে বাক্যবিনিময় হয় না, কারণ দুজনেরই মনে হয়, অনেক দিন ধরে তারা কথা বলছে নিঃশব্দে। এরই ভেতর একদিন দেখা যায় আলখাল্লা পরা আকবর বাদশাহকে। রঙিন টিনের বাক্স ছাড়াই। সেও পারের বউয়ের অতিথি হয় চা মুড়ির। ঘরের ভেতর তিনজনেই নিঃশব্দে বসে থাকে। পারের বউয়ের স্বামীর কোনো হদিস নেই সাগরে যাওয়ার পর থেকে। এ নিয়ে সে মোটেও চিন্তিত না। তার ভাবনায় রহিম রূপবান, তাদের অমর প্রেমকাহিনি।
৪
হাসপাতালের তরুণ চিকিৎসক বারবার চেষ্টা করে হাসপাতাল প্রধানের দায়িত্ব নিতে, ব্যর্থ হয়। চলে আসে নতুন হাসপাতাল প্রধান। ঠিক হওয়া বিয়ে আবারও ভাঙে। সে আরও বেপরোয়া সবকিছুতে। কাউকে সম্মান দিতে, ভালোবাসতে তার মন চায় না। সব রোগীই দেখা শুরু করে টাকা নিয়ে। লোকজন তার পেছনে লাগে। সাংবাদিক এসে প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রকাশ্যে টাকা নিয়ে হাসপাতালে রোগী দেখার দৃশ্য ধারণ করা হয়। সে বেপরোয়া। এলাকায় আলোড়ন তৈরি করে। তরুণ চিকিৎসক তার পক্ষে কিছু লোক দাঁড় করায় টাকা দিয়ে। সাংবাদিকের প্রতিবেদন প্রকাশের দুদিন পর দেখা যায় তরুণের নামে মানবন্ধন— তার বদলির আদেশ যেন বাতিল হয়। হাসপাতাল প্রধান নীরব ভূমিকা পালন করে নিজে বিপদমুক্ত থাকেন। তরুণ চিকিৎসক কয়েক মাস ধরে করে তাকে যে সাহায্য এসেছে তা বেমালুম ভুলে যান। নিজেরও অনেক দুর্বলতা। সেটা যাতে ধরা না পড়ে সেই ব্যাপারে বরং তিনি সতর্ক থাকেন। তরুণ চিকিৎসক ঢাকায় যায়, যোগাযোগ, তদবির করে। লাভ হয় না। শেষ পর্যন্ত তাকে চলে যেতেই হয় নতুন কর্মস্থলে। এবং সেটা সাগরপারের এক ভাঙা হাসপাতালে।
নতুন জায়গায় গিয়ে মনে হয়— কোথায় সেই জমজমাট হাসপাতাল, দিনরাত্রি, রোগী, কড়কড়ে টাকার নোট, আর কোথায় এই ভাঙাচোরা জরাজীর্ণ হাসপাতাল, সব নিঃস্তব্ধ, মলিন। দরজা জানালায় পর্দা নেই। সে-ই একমাত্র চিকিৎসক। অল্প কয়েকজন রোগী। তাও হাসপাতালের বরাদ্দকৃত ঔষধ নিতে আসে। বাকি সময় কাটে তার মরা গাছের শাখা-প্রশাখায় বসে, বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখে দেখে।
ধীরে ধীরে এই জায়গা, নিস্তব্ধতা সবকিছু ভালো লাগতে শুরু করে। নতুন করে জীবনের প্রেমে পড়ে। উত্তাল সমুদ্র, অবসরমাখা দিন আর হাঁটু গুঁজে বসে বসে চিন্তা করা রাতের প্রেমে পড়ে। পারের শিশুদের কোলাহল, আকবর বাদশাহর জাদু, রঙিন বায়োস্কোপ আর প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে একজনের উপস্থিতি তাকে নতুন করে ভাবায়।
৫
পারের বালুতে বেগুনি সাগরলতা ফুলে ছেয়ে যায়। দূর থেকে মনে হয় বেগুনিরঙা মাটি। সেই রং বড় কোমল, সুন্দর, আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে মন চায়। সেদিনের সেই ঝোড়ো বৃষ্টিতে তিনজন নিঃশব্দে চা, মুড়ি খাওয়ার পর কোথাও কিছু হয়ে গেল। যে যার মতো নিঃশব্দে বিদায় নিল।
তারও দিন তিনেক পর রোদ দেখা যায়। পারের বউয়ের জানালা এরপর থেকে আর কখনোই বন্ধ দেখা যেত না। দিনরাতের পানির জোয়ার-ভাটা, জোনাক পোকা জ্বলা মিঠে হাওয়া সেই সঙ্গে মরা গাছের শাখা-প্রশাখার ওপর বসে থাকা একজনকে সে দেখে সব সময়। এরপর থেকে তরুণের সঙ্গে আকবর বাদশাহকেও প্রায়ই বসে থাকতে দেখা যায়। কখনও পারের বউয়ের বিছানার ওপর বেগুনিরঙা সাগরলতা ফুল দেখা যায়। কে তাকে জানালার ফাঁক দিয়ে কখন দিয়ে যায় অগোচরে। কেউ না বুঝলেও পারের বউ জানে, বোঝে ফুলদাতার কথা। সে কিছুক্ষণ ফুলগুলো নিয়ে দুহাত মুঠো করে আবার খোলে, ঘ্রাণ নেয়। কখনও খোঁপায় গোঁজে, আবার কখনও জলভরা কাচের বোতলে রেখে দেয়।
কোনো একদিন ভরা পূর্ণিমার আলোয় রুপালি পয়সার মতো পানি চিকচিক করে। জ়েলের নৌকোর দোলানো আলো-ছায়া, ভেজা জালের গন্ধ আর বৃদ্ধের হুক্কার ধোঁয়ার সঙ্গে চোখের ছায়ার মিলমিশ হয়। পারের বউ বিছানার ঠিক মাঝখানে বসে গান গায় –
“লবণগন্ধ সাগরবাতাস,
তোমার বুকে লাগে;
ও সোনাই, তোমার কথা
দিনে-রাইতে মোরে ডাকে।”
পরদিন ভোরের আলোয় পারের বউকে কোথাও দেখা যায় না। কাচের বোতলে পানিতে ভিজিয়ে রাখা সাগরলতা ফুল দেখে সবাই। ওদিকে তরুণ চিকিৎসকের কয়েকজন রোগী এসে বসে থাকে দুপুর অবধি। তাকেও কেউ খুঁজে পায় না। সবাই ফুলের রহস্য ও ফুলদাতার সন্ধান পায়, এতদিন যা পায়নি। অপেক্ষা করে আকবর বাদশাহর আগমনের। ঘটনার একমাত্র সাক্ষী।
নাহ, আকবর বাদশাহকেও আর কখনও শততালি দেওয়া আলখাল্লা পরে টিনের বাক্সের বায়োস্কোপ নিয়ে হাজির হতে দেখে না এই অঞ্চলের কেউ। দেখে না তার প্রাকৃতিক জাদু বা লাল অস্তমিত সূর্যে তাকে হারিয়ে যেতে। মরা গাছটা তার শাখা-প্রশাখাসহ কে বা কারা নিয়ে যায়।
পারের সাগরলতা ফুলেরা তখনও ফোটে নতুন কারও জন্য। তবে পারের মানুষ এখনও আকবর বাদশাহর সুর করে পড়া ছড়া বাতাসে শুনতে পায়। গভীর রাতে এক তরুণকে পারে দেখে বিষণ্ণ বসা অথবা দেখে পারের বউয়ের বিছানায় সাগরলতা ফুল।