সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

আমাদের কিংবদন্তি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার পড়া হয়েছে

যদিও পৈতৃক বাড়ি বরিশাল, আমার জন্ম ময়মনসিংহে। বাবা তৎকালীন কিশোরগঞ্জ মহকুমার পুলিশ কর্মকর্তা। পড়তাম ময়মনসিংহ শহরের সিটি কলেজিয়েট স্কুলে। পাশেই ছিল মৃত্যুঞ্জয় স্কুল, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যে স্কুলে পড়েছেন। ভেবে শিহরিত হতাম। বইয়ের পাতায় তাঁর আঁকা ছবি দেখতে দেখতে আমার মনে একটি স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল— আমি জয়নুল আবেদিন হবো।

যে কথাগুলো আজও কানে বাজে
এর অনেক বছর পর তাঁকে আমি সরাসরি দেখেছিলাম, যেদিন  তিনি ক্লাসে এলেন। আমি তখন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আবেদিন স্যার ক্লাস নিতেন না, তবে ঘুরে ঘুরে দেখতেন। ক্লাসে তিনি সবাইকে উদ্দেশ করে কিছু কথা বলেছিলেন সেদিন। কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।
“ভালো শিল্পী হতে হলে ভালো মানুষ হতে হয়, সৎ মানুষ হতে হয়। সৎ মানে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ এমন নয়। ইউ হ্যাভ টু বি অনেস্ট টু ইওরসেলফ। নিজের প্রতি নিজে সাংঘাতিক সৎ হবে। ছবি আঁকার প্রতি সৎ হতে হবে। এই জায়গায় কোনো ছলচাতুরি চলবে না। এবং অবশ্যই ভালো মানুষ হতে হবে। ভালো মানুষ সেইজন যে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। ভালো মানুষ সে-ই যে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ।”
আবেদিন স্যার বলেছিলেন, “আমি মন্বন্তর দেখেছি, ছবি এঁকেছি। এখন মানুষের মাঝে খাদ্যের দুর্ভিক্ষ নেই। কিন্তু রুচির দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে।”
আমরা ছবি আঁকতে প্রায়ই ক্যাম্পাসের বাইরে যেতাম। একদিন কিছু গরুর ছবি এঁকে এনেছিলাম। আবেদিন স্যার প্রচুর গরুর ছবি এঁকেছেন। গরু ও কাক। আমাদের আঁকা ছবি দেখে বললেন, ‘গরুর ঘ্রাণ নিয়েছ?’ একজন বলল, ‘না স্যার, ঘ্রাণ নেওয়া হয় নাই।’ তিনি বললেন, “দূর থেকে আঁকলে তো নিতে পারবে না। কাছে যেতে হবে। তুমি ওর শরীরের ওম যদি অনুভব না কর, তাহলে আঁকবে কেমন করে?” এখন বুঝতে পারি, দর্শনে কত সমৃদ্ধ ছিল সেই কথা। এরপর বলেছিলেন, ‘গোবরেরও একটা ঘ্রাণ আছে। তুমি যদি ওটা কাছ থেকে না পাও, গরু কিভাবে আঁকবে?’

আবেদিন স্যারের হাত
আবেদিন স্যারের হাত দুটো খুব সুন্দর ছিল। আমার এক চাচাতো বড় ভাই জ্যোতিষ, আবেদিন স্যারের হাত দেখেছিলেন। সবসময় বলতেন সেই কথা। বলেছিলেন বলেই চারুকলায় ভর্তির পর আমিও আবেদিন স্যারের হাত দুটো খুব লক্ষ্য করতাম। আঙুলগুলো ছিল খুব লম্বা, অগ্রভাগ ক্রমশ সরু। কিরোর বইতে আছে, এ ধরনের আঙুলকে বলে কনিকা ফিঙ্গার। সাধারণত নামকরা গায়ক বা শিল্পীদের হাত এমন হয়ে থাকে। অন্য দেশ হলে তাঁর হাতের ছবি রেখে দিত। যেমন পিকাসোর হাতের ছাপ পামিস্ট্রির বইতে আছে, আইনস্টাইনের আছে। বাংলাদেশে এই বিষয়গুলো কেউ লক্ষ্য করেনি।
আবেদিন স্যার চেইন স্মোকার ছিলেন। এক সিগারেট শেষ করে তার আগুনে আরেকটি ধরাতেন। সিগারেটের আগুনের কাছাকাছি থাকত বলে তাঁর ডান হাতের তর্জনি ও মধ্যমা সিগারেট ধরতে ধরতে গাঢ় বাদামি হয়ে গিয়েছিল।

শিল্পকর্ম :: জয়নুল আবেদিন

শিল্পকর্ম :: জয়নুল আবেদিন

বিদ্রোহী ও দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা
আমার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, ছবি আঁকার চেয়ে দেখতাম বেশি। বহুদিন আমি আবেদিন স্যার, কামরুল হাসানের ছবি-আঁকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি। আবেদিন স্যার যেসব ছবি বেশ কয়েকবার করে এঁকেছেন সেসবের ভেতর ‘বিদ্রোহী’ একটি। খুঁটিতে বাঁধা একটি গরু মুক্তি চাইছে। এই ছবি আমি সামনে দাঁড়িয়ে আঁকতে দেখেছি।  তখন তাঁর শান্তিনগরের বাসায় যেতাম আমি। একদিন সাঈদ ভাইকে নিয়ে আবেদিন স্যারের বাসায় গিয়েছি (বাংলাদেশের প্রথম আর্ট গ্যালারি, ‘দেশ আর্ট গ্যালারি’র স্বত্বাধিকারী ছিলেন সাঈদ ভাই। গুলশানের একটা বাসা ভাড়া করে গ্যালারিটি তৈরি হয়েছিল। ভদ্রলোক পশ্চিম পাকিস্তানি, কিন্তু ভালোবেসে এ দেশেই থেকে গিয়েছিলেন)। আমাদের সামনে আবেদিন স্যার যখন বিদ্রোহী আঁকছেন, ফ্ল্যাট ব্রাশের শক্তিশালী স্ট্রোকে, আমি তাঁকে পানি এগিয়ে দিচ্ছিলাম। কোনো গরুকে মডেল করে এই ছবি আঁকার উপায় ছিল না। গরুর পেশির সঞ্চালন, খুঁটির বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার ঠিক আগমুহূর্তের ছবি আবেদিন স্যার এঁকেছিলেন তাঁর গভীর স্মৃতি থেকে। এবং এই ছবি ইলাস্ট্রেটিভ বা অলংকরণধর্মী হয়ে উঠতে পারত। তা হয়নি। এর কারণ, ছবির প্রতি ও ছবির অবয়বটির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় মমতা। মমতার প্রশ্নে তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালাও প্রাসঙ্গিক।  প্রায়ই বিস্মিত হয়ে ভেবেছি, মনের ওপর এতো চাপ সহ্য করে কিভাবে তিনি ভয়াবহ সব ছবি এঁকে গেছেন! মৃত মায়ের স্তন পান করছে শিশু, আস্তাকুঁড়ে মৃতপ্রায় শীর্ণ মানুষ ও পশু!

তাঁর ব্যক্তিত্ব
আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করত আবেদিন স্যারের ব্যক্তিত্ব। আমি যখন আর্ট কলেজের ছাত্র তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশের এদিক-ওদিক। দীর্ঘদেহী, দারুণ সুপুরুষ। পোশাকের রঙ হিসেবে গেরুয়া রঙ পছন্দ করতেন। যখন কলেজে ঢুকতেন, কী ছাত্র কী শিক্ষক সবাই যার যার জায়গায় চলে যেত। তিনি কাউকে কখনো ধমকও দিতেন না। তাঁর উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল। প্রখর ব্যক্তিত্বের কারণে এমন হতো। এদিকে মোহাম্মদ কিবরিয়া স্যারের কাছে শুনেছি, আবেদিন স্যার দারুণ রসিক মানুষ ছিলেন। টিচার্স রুমে তাঁর আঁকা একটা ছবি ছিল। বিখ্যাত ছবি— সংগ্রাম। গরুর গাড়ি কাদায় আটকে গেছে, গরু ও গাড়োয়ান তা ঠেলে তুলতে চেষ্টা করছে। এগ-টেম্পারার কাজ। এখন জাতীয় জাদুঘরে আছে। ওই ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরে আরো অনেক শিল্পকর্ম তৈরি হয়েছে।

শিল্পীর কদর 
আবেদিন স্যার শিল্পীর কদর করতে জানতেন। একজন প্রাক্তন ছাত্র আবেদিন স্যারের প্রিয় ছিল। প্রফুল্ল রায়। আমরা তাঁকে প্রফুল্ল দা বলতাম। আমাদের অনেক আগে পাস করেছিলেন। প্রফুল্ল দার আঁকা  আবেদিন স্যারের বিশেষ পছন্দের একটা পেইন্টিং ছিল। দু’জন লোক বসে দাবা খেলছে। প্রিন্সিপাল অর্থাৎ আবেদিন স্যারের রুমে ঢোকার পথে সেই ছবি দেখতে পাওয়া যেত। এই পেইন্টিং তিনি পাকিস্তানেও নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানকার শিল্পীদের দেখাতে। “দেখ আমাদের ছাত্রদের কাজ।” দেখিয়ে আবার ফেরতও নিয়ে এসেছিলেন। আবেদিন স্যার বলতেন, “আমাদের পেইন্টারদের কাজ পশ্চিম পাকিস্তানের পেইন্টারদের চেয়ে শক্তিশালী।”
পরের প্রজন্ম যেন আঁকতে পারে ছবি, আবেদিন স্যার সেই পথ তৈরি করে গিয়েছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের সামনে তাঁর মতো আদর্শ ছিল।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com