আজ শুভ বড়দিন। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সমগ্র বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও এই উৎসব উদযাপিত হইতেছে। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হইলেও মহান যিশু তাঁহার জীবন দিয়া অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ, মিথ্যা হইতে মানবজাতিকে মুক্ত করিতে যে সংগ্রাম করিয়াছেন, সেই সংগ্রামের শিক্ষা সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু ধর্মীয় দিক ব্যতীত সকল উৎসবেরই একটি সামাজিক রূপ থাকে। বড়দিনও এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নহে। তাই এই উৎসবেও ভিন্ন ধর্মের মানুষ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের সহিত আনন্দ-উল্লাসে যোগ দিয়া থাকেন। এইবারও নিশ্চয় অনুরূপ মিলনাত্মক দৃশ্যের অবতারণা হইবে। এ উপলক্ষে আমরা যিশুর আদর্শ অনুসরণকারী, তৎসহিত সকল মানুষকে শুভেচ্ছা জানাই।
এই বৎসর এমন সময়ে বড়দিন উদযাপিত হইতেছে, যখন যিশু খ্রিষ্টের জন্মভূমি ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা চলিতেছে। চলতি বৎসরের ১০ অক্টোবর হইতে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হইলেও ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হয় নাই। এখন গাজার শিশুরা অনাহারে থাকিতেছে। তথায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ ইতোমধ্যে প্রাণ হারাইয়াছে, যাহাদের উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু। ঘরবাড়ি হারাইয়া উদ্বাস্তু হইয়াছেন লক্ষ লক্ষ গাজাবাসী। কেবল ফিলিস্তিন নহে; দুই দেশের জনসাধারণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হইলেও রাশিয়া-ইউক্রেন চার বৎসরব্যাপী ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত। অস্বীকার করা যাইবে না, এই সকল আগ্রাসন ও যুদ্ধের কারণে কয়েক বৎসর ধরিয়া বিশ্ব টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে রহিয়াছে, যাহার প্রভাবে দেশে দেশে অর্থনীতি, এমনকি রাজনীতিতেও ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজমান।
বাংলাদেশে এইবার বড়দিন আসিয়াছে নির্বাচনের আবহ লইয়া। গণতান্ত্রিক উত্তরণে ভোটের জন্য মানুষ উন্মুখ। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের সংবিধানে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার যেইভাবে সুনিশ্চিত করা রহিয়াছে, উহার পূর্ণ চর্চা আসন্ন নির্বাচনেও সম্ভবপর হইবে। যেই দেশ সকল মানুষের মিলিত সংগ্রামের পরিণতিতে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হইয়াছে, সেই দেশ হইবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপদ আবাসভূমি– ইহাই স্বাভাবিক।
আমরা মনে করি, সকলে ঐক্যবদ্ধ হইয়া দেশের জন্য কাজ করিলে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটজনক পরিস্থিতি অতিক্রম করা কঠিন হইবে না। এই ভূখণ্ড আবহমানকাল হইতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এলাকা, তাহা আমরা জানি। জনগণ নানা ধর্মে বিভক্ত হইলেও এখানকার সংস্কৃতিতে বরাবরই সমন্বয়বাদী ধারা প্রাধান্য বজায় রাখিয়াছে। অস্বীকার করা যাইবে না, বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষেরা উগ্রপন্থিদের নিশানায় পরিণত হইয়াছেন। স্বস্তির বিষয়, জনগণের মধ্য হইতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষায় বিশেষ তৎপরতাও পরিলক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু তাহাতে আত্মতুষ্টিতে ভুগিবার অবকাশ নাই। বড়দিনের অনুষ্ঠানাদি যাহাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইতে পারে, তজ্জন্য প্রশাসনকে সতর্ক থাকিতে হইবে। সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেও সজাগ থাকিতে হইবে। প্রতিটি ধর্মে যেই শান্তির বাণী রহিয়াছে, উহা মানিয়া চলিলেই পারস্পরিক বিভেদ দূর হইবে।
স্মরণে রাখিতে হইবে, ধর্মের বিধান ও অনুশাসনসমূহ মানুষের জীবনকে সুশৃঙ্খল, শান্তিময় ও সমৃদ্ধ করিবার নিমিত্তেই। ইহা মানিয়া লইলে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে বিরোধের পরিবর্তে স্বধর্ম পালন করিয়া অপরের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি রক্ষা করা সম্ভব। ইহা মঙ্গলজনকও বটে। বড়দিনে সাধারণত ব্যাপক আলোকসজ্জা হয়। তবে সম্প্রীতি হইতে উৎসারিত আলোই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সেই আলোয় সকল অন্ধকার দূরীভূত হউক। বড়দিনের উৎসবের মধ্য দিয়া সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সংহতি গড়িয়া উঠুক এবং তাহার মাধ্যমে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হউক, ইহা আমাদের প্রত্যাশা।