ঋতু পরিবর্তনের সময় আবহাওয়ার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটে। গরম থেকে শীতের আগমনে অনেকের সর্দি, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় খাদ্যাভ্যাসের দিকেও বাড়তি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পরিচিত প্রাকৃতিক খাবার মধু এ সময় খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। মধু শুধু মিষ্টির বিকল্প নয়, এতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক শর্করা, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও উদ্ভিজ্জ উপাদান। তবে মধু কোনো রোগের ওষুধ নয়। পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক এর উপকারিতা
সর্দি-কাশিতে আরাম দিতে পারে
ঋতু পরিবর্তনের সময় ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে রাতে কাশি হলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এ সময় মধু কাশির অস্বস্তি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। মধুর ঘনত্ব গলার ভেতরে একটি আবরণ তৈরি করে সাময়িক প্রশান্তি দিতে পারে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে
মধুতে ফেনলিক যৌগ ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এসব উপাদান শরীরে অতিরিক্ত ফ্রি র্যাডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়
শীতকালে অনেকেই গরম পানীয়ের সঙ্গে মধু খেতে পছন্দ করেন। মধুতে প্রধানত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের মতো সরল শর্করা থাকে। এগুলো শরীরে দ্রুত শোষিত হয়ে শক্তি সরবরাহ করে। ফলে সাময়িক ক্লান্তি বা শক্তির ঘাটতি অনুভব করলে মধু থেকে কিছুটা শক্তি পাওয়া যেতে পারে।
তবে মধুতে ক্যালরি ও শর্করা রয়েছে। তাই অতিরিক্ত মধু খেলে দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
গলাব্যথা ও গলার অস্বস্তিতে প্রশান্তি দেয়
শীতের শুরুতে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় অনেকের গলা খুসখুস করে। বারবার কাশি বা গলা পরিষ্কার করার প্রবণতাও দেখা যায়। মধুর ঘন ও আঠালো প্রকৃতি গলার ভেতরে সাময়িক আবরণ তৈরি করে অস্বস্তি কমাতে পারে। কুসুম গরম পানিতে সামান্য মধু মিশিয়ে পান করলে আরাম পাওয়া যেতে পারে।
খাবারে পুষ্টিগুণ ও স্বাদ যোগ করে
মধুতে সামান্য পরিমাণে বিভিন্ন খনিজ, জৈব এসিড ও উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। ফুলের উৎস ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ধরন অনুযায়ী মধুর উপাদান ও স্বাদে পার্থক্য দেখা যায়। তাই মধুকে শুধু মিষ্টির উৎস হিসেবে নয়, খাবারের একটি বৈচিত্র্যময় উপাদান হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
বিভিন্ন খাবারে সহজে ব্যবহার করা যায়
শীতকালে মধু বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে খাওয়া যায়। যেমন–
কুসুম গরম চায়ে সামান্য মধু মিশিয়ে পান করা।
ওটমিল বা দইয়ের সঙ্গে মধু যোগ করা।
লেবু ও কুসুম গরম পানির সঙ্গে অল্প মধু মেশানো।
পাউরুটি বা রুটির সঙ্গে পরিমিত মধু খাওয়া।
ঘরে তৈরি সালাদ ড্রেসিং ও বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করা।
তবে মধু অতিরিক্ত গরম করার প্রয়োজন নেই। পানীয় কিছুটা ঠান্ডা হলে মধু মেশানো যেতে পারে।
চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়
সাধারণ চিনির তুলনায় মধু কিছুটা বেশি মিষ্টি হওয়ায় একই রকম মিষ্টি স্বাদ পেতে কম পরিমাণে ব্যবহার করা সম্ভব। চা, দই কিংবা ঘরে তৈরি খাবারে চিনির পরিবর্তে অল্প মধু ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মধুও ফ্রি সুগারের অন্তর্ভুক্ত। তাই এটিকে চিনির সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর বিকল্প মনে করা ঠিক নয়।
মধু খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
মধুর কিছু উপকারী বৈশিষ্ট্য থাকলেও পরিমিতি বজায় রাখা জরুরি।
এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনো অবস্থাতেই মধু দেওয়া যাবে না। এতে বটুলিজম নামের খুবই খারাপ খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধু খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ মধুও রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়।
অতিরিক্ত মধু খেলে ক্যালরি ও শর্করা গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
মধুতে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলতে হবে।
কাশি দীর্ঘস্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট বা উচ্চ জ্বর দেখা দিলে শুধু মধুর ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখবেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার, ফলমূল, শাকসবজি ও পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। মধু এসবের পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। v
লেখক: পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর