ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্র-জনতা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছেন ছাত্র-জনতা।
এ সময় ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা,’ ‘ভারতের আগ্রাসন, ভেঙে দাও-গুঁড়িয়ে দাও,’ ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ’, ‘শহীদের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’, ‘আমরা সবাই হাদি হব, গুলির মুখে কথা বলব’, ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’, ‘আওয়ামী লীগের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’; ‘হাদি ভাই মরল কেন, ইন্টেরিম জবাব দে,’ ইত্যাদি সেøাগান দেন বিক্ষোভকারীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাদির মৃত্যু খবরে তৎক্ষণাৎ কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী শাহবাগে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে মিছিল নিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা আধিপত্যবাদবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ ব্যানারে টিএসসির সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। ক্রমেই বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে শাহবাগ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিক্ষোভে উপস্থিত হয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জনগণের প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং আন্দোলনে সম্ভাব্য নাশকতার বিষয়ে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণকে দায়িত্বশীল থাকতে হবে এবং ঐক্য ধরে রাখতে হবে। আন্দোলনের ভেতরে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে স্যাবোটাজের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এখন জাতিকে বিভক্ত করার সময় নয়। যারা আন্দোলনের গতিমুখ ভিন্ন দিকে নিতে চায়, তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের সময় সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। সেই ঐক্যের কথাই আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাহিদ ইসলাম ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে একই মঞ্চে আসার জন্য আহ্বান জানান। একসঙ্গে কথা বলা ও সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি ঘোষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আগামীকাল (আজ) কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে এবং এ বিষয়ে রাতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
হাদির হত্যার প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, যারা এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে তারা ভারতে পালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, হত্যাকারীদের ফেরত দিতে হবে। তার আগে ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, দুই হাজার মানুষের জীবনের পর আজকেও কেন আমাদের তাকে (ওসমান হাদি) হারাতে হলো। এ ব্যর্থ ইন্টেরিমের কারণে আজকে হাদিকে শহীদ হতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, পুলিশ জানত হাদির হত্যাকারীরা তার পাশে অবস্থান করছে। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সব জানত। তারা জানত সবই। তাদের জানার মধ্যেই আজকে আমাদের হাদির শহীদ হতে হলো। আর যদি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা না জানে, তাহলে তাদের কেন বেতন দেওয়া হচ্ছে। আজকে সুশীলরা টকশোতে কথা বলতে বলতে আমাদের হত্যাযজ্ঞ করে তুলেছে।
বক্তব্য শেষে সবাইকে শপথ করান এবি জুবায়ের। শপথবাক্যে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব।’
এদিকে টিএসসি থেকে মিছিল বের করে জাতীয় ছাত্রশক্তি। ‘ভারতীয় আগ্রাসন, রুখে দাও’, ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন তারা।
আক্রান্ত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয় : হাদির মৃত্যুর সংবাদে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয় আক্রান্ত হয়েছে। গতকাল রাত ১২টার দিকে পত্রিকা দুটির প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালানোর খবর পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিক্ষুব্ধরা প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ভারতবিরোধী ও সংবাদমাধ্যমবিরোধী সেøাগান দিতে থাকে। এ সময় কার্যালয়ের সামনের অংশে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। অন্যদিকে ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসের সামনে কারওয়ান বাজার টু ফার্মগেট সড়কে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। তবে কার্যালয়ের ভেতরের নিরাপত্তা তৎপরতার কারণে বড় ধরনের মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে এ বিষয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য গতকাল রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত করেননি। তবে তারা জানিয়েছেন, হামলার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের শনাক্ত করার জন্য ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে তেজগাঁও থানা ও তেজগাঁও বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেননি।
ঢাকার এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে আছে এবং হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এদিকে প্রথম আলোর একজন সাংবাদিক গতকাল রাত দেড়টার দিকে জানিয়েছেন, অফিসে হামলার পরপরই তারা মোটামুটি সবাই অফিস ত্যাগ করতে পারলেও ডেইলি স্টারের কর্মীরা তখনো ভেতরে আটকা ছিলেন।
জানা গেছে, হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর একদল লোক মিছিল নিয়ে কারওয়ান বাজারের দিকে অগ্রসর হয়। মিছিলটি প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে পৌঁছে ঘেরাও এবং বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রথম আলো কার্যালয়ে ভাঙচুর শুরু করে। হামলায় কার্যালয়ের বেশিরভাগ জানালার গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়। রাত ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে টেবিল- চেয়ার ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বাইরে রাস্তায় বের করে নিয়ে আসে এবং সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান : হাদির হত্যার প্রতিবাদে গতকাল রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামে খুলশীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় একদল মানুষ। সেখানে হাদির মৃত্যুর প্রতিবাদের আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে বিক্ষুব্ধরা। পরে পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে তাদের সরিয়ে দেয়।
মৃত্যুর খবরে প্রতিবেশী-স্বজনরা ছুটে এলেন হাদির বাড়িতে, চাইলেন বিচার : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রতিবেশী ও স্বজনরা তার ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান। গতকাল রাতে উপজেলার খাসমহল এলাকার বাড়িতে ছিল শোকার্ত মানুষের ভিড়। তাদের অনেকেই কাঁদছিলেন। স্বজন ও প্রতিবেশীদের কেউ কেউ এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। স্বজনরা জানান, বাড়িতে হাদির এক বোন ছিলেন। সেখানে নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। তবে পরিবারের সদস্যরা কেউ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি।








