সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

পাতার ক্যাম্প অভিযান

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

সংগ্রামপুর পাতার ক্যাম্পে অস্ত্রের খোঁজে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান। সেখানে কীভাবে যেতে হবে, কার কী করতে হবে, সব কিছুই বুঝিয়ে দেওয়া হলো। সবাই মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল। উদ্দেশ্য একটাই-পাতার ক্যাম্প থেকে বন্দুক আর গোলাবারুদ উদ্ধার করতে হবে। এই ক্যাম্পে পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ধারণা, অবশ্যই ওদের সঙ্গে বন্দুক আর গোলাবারুদ আছে। সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। মুক্তিযোদ্ধারা তিনভাগে ভাগ হয়ে গেল।

ক্যাম্পের একটু পূর্বদিকে অবস্থান নেবে একটি দল। যদি ক্যাম্পের সামনের দিক থেকে ওরা প্রতিরোধ করতে আসে, তা হলে তারা যেন দু-চারটি গুলি ছোড়ে। অবস্থা খারাপ হলে ক্যাম্পের সোজা উত্তরে অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা করবে তারা। এই দলের দায়িত্ব দেওয়া হলো সাব্বিরকে।

দ্বিতীয় দলটি ক্যাম্পের উপরে উঠবে। সে দলের দায়িত্ব দেওয়া হলো আবুল হোসেনকে। তার সঙ্গে থাকবে মাসুম ও কুদ্দুসসহ আরও কয়েকজন।

তৃতীয় দলটি ক্যাম্পের পশ্চিম পাশ হয়ে সোজা দক্ষিণে চলে যাবে। তারা দক্ষিণে ছোট একটি টিলার পাশে অবস্থান নেবে। টিলা থেকে পঞ্চাশ গজ নিচে সেই পাতার ক্যাম্প। তাদের সঙ্গে কয়েকটি এলএমজি আর গোলাবারুদ রাখতে হবে।

সবাই অপেক্ষায় আছে তৃতীয় দলের নেতৃত্ব দেবে কে? তাকে অবশ্যই এদের চেয়ে আরও চৌকস হতে হবে। যে কেউ এই তৃতীয় দলের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। কিছুক্ষণ পর প্রথম ও দ্বিতীয় দলের প্রধানের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল সাজ্জাদ।

তখন সাজ্জাদ বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যেভাবে যা বললাম, তার ব্যতিক্রম করার চেষ্টা করবে না কেউ। তৃতীয় দলের সঙ্গে থাকব আমি।

এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আস্থার আনন্দে সবাই যেন আত্মহারা হয়ে গেল।

সাজ্জাদকে উদ্দেশ করে কেউ একজন বলল, এই অভিযানে আমরা অবশ্যই বিজয়ী হব।

সহযোদ্ধাদের আত্মপ্রত্যয়ী মুখের দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ বলল, আল্লাহ সহায় হোন।

বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী সাজ্জাদের ধারণা এই পাতার ক্যাম্পে চার থেকে পাঁচটি রাইফেল, চারটি রিভলবার, পিস্তলসহ দু-একটি লাইট মেশিনগান রয়েছে। কিংবা তার চেয়ে আরও বেশিও থাকতে পারে।

মুক্তিবাহিনীর এই দলটির জন্য এই অস্ত্রগুলো অনেক কিছু। যে করেই হোক এগুলো উদ্ধার করতেই হবে। না হলে এই এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর সেই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করবে পাকিস্তানিরা।

বহেড়াতৈল থেকে সংগ্রামপুরের দূরত্ব দেড় কিলোমিটার। পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। পর্যায়ক্রমে সংঘবদ্ধভাবে সংগ্রামপুরের দিকে রওনা হলো সবাই।

সেদিন ছিল সংগ্রামপুরের সাপ্তাহিক হাট। অনেকেই সংগ্রামপুরকে শালগ্রামপুর বলেও চেনে। যুদ্ধ দিনে সাজ্জাদ বাহিনীর অধিনায়ক শালগ্রামপুরের নাম দিয়েছিল সংগ্রামপুর।

সেদিনের সেই সংগ্রামপুর হাটের বটগাছ আর আমগাছের নিচে বাহারি পণ্যের সমাহার নিয়ে বেশ কয়েকটি দোকান বসেছিল। চারদিকে শাল গজারির ঘন বন। বনের ভিতর দিয়েই সরু পথ। লাল মাটির দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয় এই সংগ্রামপুরের হাটে।

তখন পাহাড়িয়া এলাকায় প্রচুর গাদিলা গাছ ছিল। সেই গাছের পাতা সংগ্রহ করে ক্যাম্পে রাখা হতো। তারপর পাতাগুলো ভালোভাবে প্যাকেট করে সোজা পাকিস্তানে পাঠানো হতো। যে কারণে এই ক্যাম্পে কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মচারীও থাকত। চাকরির প্রয়োজনে এই পাতার ক্যাম্পে কাজ করত তারা। কোম্পানির নীতি অনুযায়ী ও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পের ভিতরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অস্ত্র রাখত কর্মচারীরা। মুক্তিযোদ্ধারা সন্দেহ করেছিল যে, হানাদার বাহিনী এখানে গোপনে তাদের অস্ত্রের একটা গুদাম বানিয়ে রাখতে পারে। আর সেই অস্ত্র লুট করতে পাতার ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কিছুই করা হচ্ছে। সংগ্রামপুর বাজারের টং দোকান ঘেঁষে একটি গাছের নিচে অবস্থান নিয়েছে সাব্বির ও তার বাহিনী।

এ সময় লুঙ্গি পরে ক্যা¤প থেকে একজন লোক বাইরে এলো। তার হাতে পানি ভরা বদনা। সে এগিয়ে আসছে টয়লেটের দিকে। দক্ষিণে অবস্থান করা মুক্তিযোদ্ধাদের পঁচিশ থেকে ত্রিশ গজ দূরে টয়লেট। টয়লেটের চারদিক পাটের ছালা দিয়ে মোড়ানো। লোকটি লম্বা লম্বা পা ফেলে টয়লেটের কাছাকাছি এসে গেছে। বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে পায়নি সে।

তাকে দেখে অবস্থান নেওয়া মুক্তিযোদ্ধারা হতভম্ব হয়ে গেল। গুলি করবে নাকি চিৎকার করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। আর কয়েক পা এগিয়ে গেলেই টয়লেট। এমন সময় এক মুক্তিযোদ্ধা বন্দুকের বাঁট নাড়াচাড়া করল। কিন্তু তেমন শব্দ হলো না। লোকটি তখনো এসবের কিছুই লক্ষ করেনি। বদনা হাতে নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।

হঠাৎ লোকটি থমকে দাঁড়াল। তার চোখ পড়ল বন্দুকসহ কয়েকজন লোকের দিকে। তাদের দেখে ওর হাত থেকে বদনাটা মাটিতে পড়ে গেল। লোকটি চিৎকার করার আগেই সাজ্জাদ বলল, অ্যায়, ইধার আও।

এ সময় সে কোনো শব্দ করল না। সাজ্জাদের কথামতো লোকটি সামনে এগিয়ে এলো। সাজ্জাদের সঙ্গে থাকে থাকা সাইদুল লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে মাটিয়ে বসিয়ে দিল। ধাক্কা খেয়ে লোকটি নির্বাক হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। বসামাত্রই লোকটির দিকে ব্র্যাটাগান তাক করল রুবেল। বুঝিয়ে দেওয়া হলো নাড়াচাড়া করলেই গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর লোকটিকে মোটা এক রশি দিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলল সাইদুল।

সময় পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আক্রমণ করার কোনো সাড়া শব্দ নেই। তাহলে কি কোনো সমস্যা হলো। উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছে সাজ্জাদ। সে কয়েকবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সাইদুলকে বলল- সামনে এগিয়ে যাও, দেখ কী অবস্থা।

সাইদুল কোনো কথা না বলে বন্দুক হাতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কয়েক পা এগিয়ে যাওয়া মাত্রই আবুলকে দেখতে পেল। সাইদুলের আর এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হলো না।

আবুল পাতার ক্যাম্প থেকে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে ক্যাম্পের ভিতরে গিয়েছিল সে। ওর পিছনে হাত বাঁধা চারজন লোক।

সাজ্জাদ এসব দেখে রীতিমতো হতবাক। যুদ্ধ করতে হলো না। গুলি ব্যয় করতে হলো না। বিনাযুদ্ধে কেল্লাফতে!

আবুল হোসেন খুব কাছাকাছি এসে বলল, ক্যাম্পের ভিতরে ওরা চারজনই ছিল। আর একজন আছে সে বাঙালি। তাকে ভিতরে বেঁধে রেখে এসেছি।

কিছুক্ষণ আগে টয়লেটের সামনে থেকে যাকে আটক করে পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা হয়েছিল, তাকেও সামনে নিয়ে আসা হলো।

তারপর পাঁচজনকে নিয়ে দল বেঁধে যাওয়া হলো ক্যাম্পের ভিতরে। ওদের তথ্যেই পাতার ক্যাম্প থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হবে। শুরু হলো তার অভিযান।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com