রাজশাহীর তানোরে গভীর গর্তে পড়ে যাওয়া শিশু সাজিদকে ৩২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৭ মিনিটে মাটির ৪৫ ফুট নিচ থেকে উদ্ধার করে শিশুটিকে দ্রুত তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রাত ৯টা ৫০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
তানোর থানার ওসি শাহীনুজ্জামান বলেন, শিশু সাজিদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
গত বুধবার দুপুর ১টায় উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে ভূগর্ভের পানি তোলার জন্য খনন করা ১২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের সরু গর্তে পড়ে যায় সাজিদ। জমির মালিক গর্তটি ভরাট না করেই ফেলে রেখেছিলেন। মায়ের সঙ্গে হেঁটে যাওয়ার সময় দুই বছরের সাজিদের এমন পড়ে যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগের আবহ তৈরি করে। দ্রুতই শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা। প্রথমে গর্তটির পাশে বড় আকারের আরেকটি গর্ত খনন করা হয় এক্সক্যাভেটর দিয়ে। পরে তা সরু গর্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথমে গর্তটি ৩৫ ফুট বলা হলেও পরে জানা যায়, এটি আরও অনেক গভীর। এর আগে গর্তে কয়েকবার ক্যামেরা পাঠিয়েও শিশুটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নজর রাখছিলেন লাখ লাখ মানুষ। সবার প্রার্থনা– ছোট্ট সাজিদ যেন মায়ের কোলে ফিরে আসে।
সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় মা রুনা খাতুন। তানোরের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে -সমকাল
সাজিদের মা রুনা খাতুন, বাবা রাকিব হোসেনসহ স্বজনরা রাত জেগে বসেছিলেন গর্তের পাশে। আশপাশে ছিলেন আরও কয়েকশ মানুষ। তারা গত বুধবার সারারাত জেগে একটি ভালো খবরের অপেক্ষা করছিলেন। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনীর সদস্য ছাড়াও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিত দেখা গেছে। উদ্ধার অভিযানের সময় যত বাড়ে, সবার উদ্বেগও তত বাড়ে। অনেকে আবেগাপ্লুত হচ্ছেন, সাজিদের জন্য প্রার্থনা করছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, তারা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযান চলবে। যদি মাটির ১০০ ফুট নিচেও থাকে, এভাবেই খনন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘তাকে না পাওয়া পর্যন্ত কাজ করতেই থাকব। আমাদের ক্যাপাসিটি কত, সেটি বিষয় না।’
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়ার বাসিন্দা কছির উদ্দিনের গর্তে পড়েছে শিশু সাজিদ। তার বাড়ির পাশে কৃষক কছির তাঁর জমিতে সেচের জন্য অনুমোদনহীনভাবে গভীর নলকূপ বসাতে সব মিলিয়ে তিনটি স্থানে খনন করেন। কিন্তু কোথাও পানি না পেয়ে নলকূপ বসাতে পারেননি। পরিত্যক্ত গর্তগুলো অরক্ষিতভাবে ফেলে রাখেন তিনি। এসব গর্তের একটিতে পড়ে নিখোঁজ হয় ছোট্ট সাজিদ।
গতকাল বিকেলে সাজিদদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটির মা রুনা খাতুনকে নিয়ে বসে আছেন তাঁর মা শেফালী বেগম। সাজিদের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে শেফালী বেগম বলেন, ‘সবাই আমাদের ছোট বাচ্চাটার জন্য দোয়া করেন, যাতে তাকে আমরা ফেরত পাই।’
গর্ত খননকারীর শাস্তি চান শিশুর মা
রুনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘তিন জায়গা খুঁড়েছিল। দুই বছর ধরে বন্ধ না করে গর্তগুলো এভাবে ফেলে রেখেছে। কেন ফেলে রেখেছে? আমি কছিরের শাস্তি চাই, তার বিচার চাই।’
রুনা জানান, ঘটনার পর কছির একবার দেখতে এসেছিলেন। তারপর আর আসেননি। তিনি পালিয়ে গেছেন।
ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বাবা রাকিবুল ইসলাম উন্মাদপ্রায়। তিনি কখনও মৌন, কখনও বিলাপ করছেন। কারও সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে পারছেন না।
তানোর থানার ওসি শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ডিপের খননকারী কছিরকে পাইনি। তদন্ত চলছে।’ রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারসহ অন্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ সদস্যরা সর্বদা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সঙ্গে কাজ করছেন।
তানোরের এই এলাকা উচ্চ খরাপ্রবণ। মাটির অনেক গভীরেও পানি পাওয়া যায় না। গভীর নলকূপ স্থাপনের আগে বিভিন্ন স্থান বোরিং করে পানির অস্তিত্ব দেখা হয়। এ গর্তও সে রকম। সাধারণত এ ধরনের গর্তের গভীরতা ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত হয়।