নির্বাচন কমিশন সূত্র আগেই জানিয়েছিল, তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবে। সে অনুযায়ী আগামী বুধবার দুপরে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সাক্ষাৎ হতে পারে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, প্রধান উপদেষ্টাকে গতকাল সিইসি জানান, নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি ‘সঠিক ও সুন্দরভাবে’ এগোচ্ছে। এরই মধ্যে নাগরিকরা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন, যা দেশে নির্বাচনী আমেজ সৃষ্টি করেছে।
প্রস্তুতিমূলক কাজগুলোতে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য সিইসি প্রধান উপদেষ্টা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।’
নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জাতির জন্য প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনে আপনারা (ইসি) চালকের আসনে আছেন। আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতেই হবে।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
অন্য পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।
তফসিল নির্ধারণে ইসির সভা ও সিদ্ধান্ত : গতকাল সকাল পৌনে ১১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল চূড়ান্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় বসে নির্বাচন কমিশন। সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চার নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগেই জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করা হবে। সেই হিসাবে ৮ ডিসেম্বর (আজ) থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যেকোনো দিন এই তফসিল ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের এ বছরের দশম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের সভার অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল আইন ও রীতির আলোকে তফসিলপূর্ব ও তফসিল-উত্তর কার্যক্রম। শিগগিরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হবে।’
এই সপ্তাহ বলতে রবি থেকে বৃহস্পতিবার কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন দ্বিতীয় সপ্তাহে। এই দ্বিতীয় সপ্তাহেই হবে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ অর্থাৎ ৮ তারিখ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে।’
৮ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে ১২ ও ১৩ তারিখ তো সাপ্তাহিক ছুটি—এই তথ্য জানানো হলে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘ছুটির দিনেও তফসিল ঘোষণা হতে বাধা নেই।’ তবে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, ১১ ডিসেম্বরই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা বেশি।
ইসি সানাউল্লাহ আরো বলেন, ‘তফসিলপূর্ব কার্যক্রমের মধ্যে আমাদের কতকগুলো রীতি অনুযায়ী কিছু কাজ আছে। আমরা পুরো কমিশন মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করব। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য রেকর্ড করার জন্য বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের কাছে পত্র পাঠানো হবে। আমরা আশা করছি, আইন ও বিধির বাকি সংস্কার সংক্রান্ত কাগজপত্র আজ বা কালকের মধ্যে আমরা হাতে পেয়ে যাব।’
তিনি বলেন, ‘আচরণবিধি প্রতিপালনে তফসিল ঘোষণার দিন থেকে প্রতিটি উপজেলায় দুজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। এরপর ভোটের পাঁচ দিন আগে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানো হবে। তফসিল ঘোষণার পর ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হবে পোস্টার সরাতে, না সরালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তফসিলের পর নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন করতে পারবে না উপদেষ্টা পরিষদ। উপদেষ্টা পরিষদের কোনো সদস্যই পদে বহাল থেকে ভোট করতে পারবেন না। আইন যাঁদের পারমিট করবে, তাঁরাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।’
একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নির্বাচনে ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভোটগ্রহণ শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায়, শেষ হবে বিকেল সাড়ে ৪টায়। মক ভোটিংয়ের অভিজ্ঞতা ও মাঠ পর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে বুথসংকট কাটাতে প্রতিটি কক্ষে একাধিক সিক্রেট বুথ (গোপন কক্ষ) স্থাপন করা হবে। কোথাও জায়গা না থাকলে অস্থায়ী বুথ করা হবে।’
ভোটকেন্দ্রে গণভোটের প্রশ্ন ঝুলিয়ে রাখার কথা জানিয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘গণভোটের প্রশ্ন ভোটারদের সহজে বোঝার সুবিধা দিতে প্রতিটি কেন্দ্রে বড় আকারে প্রশ্নের নমুনা ঝুলিয়ে রাখা হবে। গণভোট প্রচার বিষয়ে সরকারের কর্মসূচিতে নির্বাচন কমিশন সহযোগিতা করবে। পঙ্গু, প্রবীণ ও গর্ভবতী ভোটারদের সুবিধা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে।’
আজ সোমবার থেকে প্রবাসী ভোটারদের জন্য ব্যালট ছাপানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরশুর মধ্যে এসব ব্যালট বিদেশে পাঠানো শুরু হবে। দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালটের আবেদন তফসিল ঘোষণার দিন থেকে পরবর্তী ১৫ দিন চলবে। পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরা যাতে নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে পরিপত্র জারি করা হবে।’ তিনি আরো জানান, ভোটের দিন সাধারণ ছুটি থাকবে। তবে ব্যাংক ও পোস্ট অফিস খোলা থাকবে ইসির প্রয়োজন অনুযায়ী।
এর আগে গত শনিবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছিলেন, প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে কোনো প্রার্থীর নাম থাকবে না; থাকবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব দলের প্রতীক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত প্রতীক। গণভোটের জন্য ব্যালটও প্রবাসী ভোটারদের কাছে পাঠানো হবে। এই ব্যালট হবে গোলাপি রঙের। এতে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’র পাশাপাশি টিক ও ক্রস চিহ্ন দেওয়া থাকবে।
নির্বাচনে ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে গতকাল ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আরো বলেন, ভোটগ্রহণ শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায়, শেষ হবে বিকেল সাড়ে ৪টায়।
নির্বাচনে প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং সরকারি ব্যাংকের কর্মীদের তালিকায় নেওয়া হবে। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আপাতত রিজার্ভে রাখা হবে, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে না।’
ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সামগ্রী আগের রাতেই ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হবে বলে জানান ইসি সানাউল্লাহ। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন আগের রাতেই কেন্দ্রে নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করে। ‘রাতের ভোট’ ঠেকাতে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন ভোটের দিন সকালে নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করে। আপনারা আগের পদ্ধতিতে ফিরছেন কেন? এমন প্রশ্নে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘আমরা কনফিডেন্ট, আমরা আর ওইসব ঘটনার অবতারণা দেখব না। আমরা আমাদের কনফিডেন্সের জায়গাটাতে ফেরত যেতে চাই। আমাদের যথাযথ সুপারভিশন থাকবে এবং আমরা নজর রাখব, যাতে কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে।’
তফসিলের ক্ষেত্রে বিএনপি নেত্রীর অসুস্থতা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আছে, যা মূলত রাজনৈতিক অবস্থান। নির্বাচন কমিশন নিজেদের বিবেচনা ও পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারের ঘোষিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুসারে নির্বাচন কমিশন আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে রোজার আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনও জানিয়ে রেখেছে, নির্বাচনের আগে ৬০ দিন সময় হাতে রেখে তফসিল ঘোষণা করা হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমান, ডিসেম্বরের ১১ তারিখে তফসিল ঘোষণা হলে ভোট হতে পারে ১১ অথবা ১২ ফেব্রুয়ারি।