বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক রিচার্ড বেলি, জুবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান ও তাঁর স্বামী অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর সৈয়দ শফিউজ্জামান ও মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন।
জুবাইদা রহমান বিমানবন্দর থেকে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। হাসপাতালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখার পর জুবাইদা রহমান পৌনে ৩টার দিকে ধানমণ্ডিতে মায়ের বাসার উদ্দেশে রওনা হন। ধানমণ্ডিতে মায়ের সঙ্গে দেখা করে রাতে আবার এভারকেয়ার হাসপাতালে যান জুবাইদা রহমান।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘ডা. জুবাইদা রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরেই সরাসরি এভারকেয়ারে আসেন। তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শয্যার পাশে ছিলেন, ডাক্তারদের সঙ্গে সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে মিটিংও করেছেন। এরপর ধানমণ্ডিতে বাবার (প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান) বাসা মাহবুব ভবনে আসেন। এখানে উনার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু রয়েছেন।’
গতকাল বাদ জুমা রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন মসজিদের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়াকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসকরা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। শনিবার কাতার থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বাংলাদেশে এসে পৌঁছালে রবিবার তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) লন্ডনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উচ্চমানের চিকিৎসকরা তাঁর চিকিৎসা করছেন। তবে এই চিকিৎসা আরো উন্নত হাসপাতালে করা প্রয়োজন বলে সবাই মনে করছেন। সে কারণে তাঁকে ইংল্যান্ডের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়াকে ছয় বছর কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। এর মধ্যে দুই বছর তাঁকে নির্জন, পুরনো কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। সবাই সন্দেহ করেন, সেখান থেকেই তাঁর রোগের সূচনা হয়। চিকিৎসার অভাবে তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। করোনার সময় থেকে গত চার বছর তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এরপর তিনি সুস্থ হলেও কিছুদিন আগে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এর আগে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন মসজিদে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। দেশবাসীর কাছে খালেদা জিয়ার সুস্থতায় দোয়া চেয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থার আলোকে যদি সবকিছু ঠিক থাকে, কাতার রয়েল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে উনাকে শুক্রবার ইনশাআল্লাহ যুক্তরাজ্যে অর্থাৎ লন্ডনে একটি নির্ধারিত হাসপাতাল ঠিক করেছি, সেখানে আমরা উনাকে নিয়ে যাব।’
ডা. জাহিদ বলেন, ‘উনার (খালেদা জিয়া) যাওয়ার সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এবং বাইরের দুজন চিকিৎসক সঙ্গে থাকবেন, যাতে যাত্রাপথে কোনো ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যেও সুষ্ঠুভাবে বিমানে চিকিৎসা দেওয়া যায়। সেই লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দেশের বাইরে নিয়ে যাব।’
তবে বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির প্রেস উইং জানায়, কাতারের আমিরের যে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার কথা রয়েছে, সেটিতে কারিগরি সমস্যার কারণে এই যাত্রা দেরি হবে।
শুক্রবার সকাল থেকে হাসপাতালের বাইরে বিজিবি ও পুলিশ এবং হাসপাতালের ভেতরে আগে থেকেই এসএসএফ সদস্যরা মোতায়েন আছেন। তবে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার খবর পেয়ে সকাল থেকে গণমাধ্যমকর্মী ছাড়াও উত্সুক জনতার ভিড় ছিল হাসপাতালের সামনে। এর মধ্যে গতকাল দুপুরে জুবাইদা রহমান লন্ডন থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছলে উত্সুক জনতার ভিড় আরো বেড়ে যায়।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করেই চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেখানে লন্ডন ক্লিনিকে ভর্তি রেখে কিছুদিন তাঁর চিকিৎসা চলে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে কিছুদিন লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন। অনেকটা সুস্থ হয়ে গত ৬ মে একই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। লন্ডনে চিকিৎসা করিয়ে আসার পর তাঁকে ঘিরে বিএনপিতে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি তিনটি আসনে ভোট করবেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়।
৭৯ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। এর মধ্যে গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নেওয়া হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ (ভিভিআইপি) ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় এসএসএফ। তিন বাহিনীর প্রধানদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত মঙ্গলবার রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখে আসেন। এরপর বুধবার রাতে সেখানে যান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে এভারকেয়ার হাসপাতালের ১২ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তদারক করে আসছে। গত কয়েক দিনে চীন ও যুক্তরাজ্য থেকেও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে দেশে আসেন। গত বুধবার যুক্তরাজ্য ও চীনের দুটি মেডিক্যাল টিম খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল বোর্ডের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে।
রাষ্ট্রপতির মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল বাদ জুমা বঙ্গভবনের মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য দোয়া করা হয়।
রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গভবন জামে মসজিদে তাঁর সংশ্লিষ্ট সচিবগণ এবং বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেন। বঙ্গভবন জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ সাইফুল কবির সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন।
খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় সারা দেশে বিশেষ দোয়া : রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় সারা দেশে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আহ্বানে গতকাল জুমার নামাজের পর দেশের মসজিদগুলোতে দলের পক্ষ থেকে এই দোয়ার আয়োজন করা হয়।
একই সঙ্গে নয়াপল্টনের মসজিদে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা অংশ নেন।
রাজধানীসহ দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণও দোয়ায় অংশ নেয়। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা হয়।

চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তাঁর পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান। ছবি :