এ বিষয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আগে ধারণা ছিল যে এখানে বিভিন্ন কারিগরি ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে কেন্দ্রটি প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। কিন্তু সাম্প্রতিক রেকর্ড উৎপাদন প্রমাণ করেছে যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা নেই। যথাযথভাবে কয়লা সরবরাহ পেলে কেন্দ্রটি পুরো সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংবাদ।’
কয়লা সরবরাহের বিষয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্নভাবে কয়লা সরবরাহ করছে, যার কারণে নভেম্বর মাসে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেছে।
নিয়মিত কয়লা সরবরাহ থাকায় এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কয়লা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ডকইয়ার্ডে সংরক্ষণ করা হয়েছে। গত ২ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে দুই লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লার মজুদ ছিল। এর আগে কম পরিমাণ কয়লা আসত এবং তা দিনেরটা দিনেই শেষ হয়ে যেত।
এমএসটিপিপির সঙ্গে তিন বছরে আট মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা সরবরাহে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বিএমটিএলের চুক্তি হয়।
এর আগে গত অক্টোবরে চার লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন কয়লা সরবরাহ করে বিএমটিএল। গত নভেম্বরে সেখানে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন কয়লা সরবরাহ করা হয়, যা এ পর্যন্ত দেশের কোনো জেটিতে সর্বাধিক পরিমাণ কয়লা খালাস করার রেকর্ড। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত নভেম্বর মাসে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৭০০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার রেকর্ড করেছে, যা বাংলাদেশের যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে সর্বোচ্চ মাসিক উৎপাদন। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১১.৫০ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে ৬০০ মিলিয়ন ইউনিটেরও বেশি বা বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৮ শতাংশ সরবরাহ করে আসছে।
সূত্র জানায়, সাধারণত চার লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানির জন্য এলসি খুলতে ৫০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। তিন মাস ধরে বিএমটিএল কর্তৃপক্ষ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে এই অর্থায়ন করছে। আর এলসি সময়মতো খুলে রেকর্ডসংখ্যক কয়লা আমদানি করার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে।
ড. ইজাজ হোসেন আরো বলেন, ‘কয়লার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার জোগান নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে, সেটা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য এবং আমি এ পদ্ধতিকে সমর্থন করি। তবে নিশ্চিত হতে হবে কয়লার যে দাম নেওয়া হচ্ছে, তা চুক্তি অনুযায়ী সঠিক কি না। যদি দেখা যায় চুক্তির বাইরে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে না এবং বিদ্যুতের দামেও কোনো প্রভাব পড়ছে না, তবে এভাবে কয়লার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক।’
এ বিষয়ে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিক ম্যানেজার আফজাল ইবনে জাহান বলেন, ‘যেহেতু দেশে জ্বালানির সংকট চলছে আর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে দেশের অন্যতম বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, এ জন্য এখানে আমরা ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত দুই বছরে আমাদের নিয়মিতভাবেই এক শ থেকে দেড় শ মিলিয়ন ডলারের পাওনা বকেয়া ছিল। কিন্তু এর পরও কোনো প্রকার সুদ ছাড়াই নিয়মিত কয়লা সরবরাহ করে গিয়েছি। এ পর্যন্ত বিএমটিএল কর্তৃপক্ষ কয়লা খালাস বাবদ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাছে পাওনার পরিমাণ দাড়িয়েছে ৭০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ। এর বাইরে বিএমটিএলের আরো ছয়টি কয়লাবাহী জাহাজ পথে আছে, যার মূল্য ৪২ মিলিয়ন ডলার।’
এরই মধ্যে অন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বকেয়ার কারণে একবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। একই কারণে বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। অন্যদিকে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও কয়লার অভাবে বেশ কয়েকবার বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বাস্তবায়ন করে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০২৪ সালের মার্চে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকে পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্পায়নে অবদান রাখছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দেশের জাতীয় গ্রিডে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুৎ যোগ করছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করছে। স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের সুবিধা এবং নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রমও বেশ ভালোভাবে করে যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।