সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের গেজেট জারির তথ্য জানিয়ে গত রাতে বিজ্ঞপ্তি দেন সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের পদক্ষেপে গত ২৭ অক্টোবর বিচার বিভাগের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের জন্য একটি খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয় সুপ্রিম কোর্ট থেকে। প্রস্তাবের সঙ্গে সচিবালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যপ্রণালী বিধি (রুলস অব বিজনেস) ও কার্যবণ্টনের প্রস্তাবও পাঠানো হয়। পরে গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ ছিল হাইকোর্টের
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা ছিল সুপ্রিম কোর্টের কাছে। বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং ছুটি মঞ্জুরের ক্ষমতা ছিল প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের হাতে। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়, যা আইন মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হতো। ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
রায়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বর্তমান সংবিধানে পুনর্বহালের পাশাপাশি তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য ‘স্বতন্ত্র সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছে : সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানের ২২, ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যপূরণকল্পে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নামে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় থাকবে। এই ৪ ধারায় আরো সাতটি উপধারা রয়েছে। এসব উপধারায় বলা হয়েছে, এই সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির হাতে। সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হবেন সচিব। সচিবের মর্যাদা হবে সরকারের সিনিয়র সচিবের মর্যাদার সমান। সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যাবলি শিরোনামের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, দেশের অধস্তন আদালত, ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয়। সেই সঙ্গে অধস্তন আদালত প্রতিষ্ঠা, বিলোপ, অধস্তন আদালতের সংখ্যা নির্ধারণ, গঠনের এখতিয়ারও থাকবে এই সচিবালয়ের।
অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সরকারের যেকোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর বা অফিসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি বা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তরও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে।
থাকবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কমিশন : দেশের বিচার প্রশাসনের উন্নয়ন, বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কমিশন নামে একটি কমিশন থাকবে। কমিশনের চেয়ারপারসন হবেন প্রধান বিচারপতি। কমিশনে থাকবেন আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন ও অ্যাটর্নি জেনারেল। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সাবেক বিচারক মাসদার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি তো গেজেটটা দেখিনি। শুনেছি দুইটা ডিজাস্টার হয়েছে। একটা হলো সব জুডিশিয়াল অফিসার সচিবালয়ের আওতায় আসেনি বলে শুনলাম। তা ছাড়া বিচারকদের পরিপূর্ণভাবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও দেওয়া হয়নি বলে শুনেছি। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে এ দুটি মারাত্মক অসম্পূর্ণতা।’