যে ফুলে করেছি প্রেম/হেমন্তের স্পর্শে আঁখি মেলে।/শিশির সিক্ত ঘাসের ওপর/লুটিয়ে থাকে তাঁহার চরণ পাবে বলে…। গৃহস্থ বাড়ির নিঃশব্দ উৎসবে আবৃত্তিটা বেশ লাগছিল হৈমন্তীর কণ্ঠে।
ঘরের উঠোনে মাটির চুলায় পিঠার ভাপ উঠছে! বাতাসগুলো যেন স্বাদ নিচ্ছে চালের গন্ধ আর পাটালি গুড়ের। পাটুলি হেমন্তের দিন মানেই গৃহস্থ বাড়িতে বুঝি ‘হেমবরণীর বরণ উৎসব’। ধান কাটা মাঠের ধারে কাক ডাকে ধীরে, রোদটাও যেন ঝিমিয়ে বসে থাকে বাঁশঝাড়ের ফাঁকে। শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম বুঝি, শেষ বিকেলের হেমন্তিকা। জাঁকজমক না হলেও হেমন্তের সকাল মানেই সকালের শিশিরে পায়ের নিচে নরম ঠান্ডা, বৈকালিক চায়ের কাপে গল্প। মনে হয়… সময়ের গতি একটু থেমে যাক, এমন পাটুলি হেমন্তের নিস্তব্ধ মিষ্টতা যেন আরও কিছুক্ষণ থাকে।
সকালে জানালা খুললে সামান্য ঠান্ডা বাতাসের রেশ টের পাই। নিভে যাওয়া রোদের সঙ্গে বাতাসের ছলাকলা গাঢ় হয়ে ওঠে এ সময়। ততটা শীত এখন অনুভূত হয় না। শীতের ভাবনাটুকুই এখন শীত। হেমন্তের এ মুখবন্ধই শীত। সম্ভাব্য ফুলের বাগান যত্নে ভরে যায় আগামী শীতের শৌখিনতায়। শালে আর কম্বলে রোদ ফেলার কথা শুরু হয়। বাতাসে কানাকানি হয় নতুন গুড়ের ভবিষ্যৎ।
‘শূন্য এখন ফুলের বাগান, দোয়েল কোকিল গাহে না গান,/কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে।’
জীবনে কতগুলো হেমন্ত দেখেছি সে হিসাব সঠিক দিতে পারব না। সব দেখা তো দেখা নয়। কিছু দেখা শুধুই তাকিয়ে থাকা। তাকিয়ে থাকার ভেতরে যখন দৃশ্যের প্রতি মায়ার সঞ্চার হয় তখন সেই তাকিয়ে থাকা দেখা হয়ে ওঠে। তখন বলি হ্যাঁ, দেখেছি। আমি দেখেছি তার চোখ থেকে হাসি মুছে যেতে, দেখেছি কেমনভাবে সে ঝুঁকে পড়ে অপরাজিতার কাছে। দুটি ফুল নিয়ে বাকি রেখে যায়।
আমি দেখেছি আকাশ থেকে কুয়াশা নেমে আসে ছাতিমের গন্ধের ওপরে। রহস্য ঘন মাতাল রেণুর কণিকা। এসব হৈমন্তিক ভঙ্গিমা সাজিয়ে গুছিয়ে অথবা এলোমেলোভাবেই বা কতটুকু দেখেছি।
দেখা কি সহজ? মনের ভেতর সংসারের ছল কপট জমা হলে কি দেখা যায়? মনের ভেতর অদৃশ্য লড়াই চলে শুম্ভ-নিশুম্ভের। সে লড়াই সেরে অবসন্ন শরীরকে যদি যন্ত্রণার ওষুধ খেতে হয় সে আর কী করে পৌঁছায় হেমন্তের কাছে? দেখা হয় কিন্তু এক জীবনে তেমন করে কতবার দেখার মুহূর্ত আসে সে বোঝা সহজ নয়…।
আয়নার মতো দৃশ্য ফাঁকি দেয়। সব খুঁটিনাটি ধরা পড়ে কাচে। তবু দৃষ্টি নিবদ্ধ নিজের শারীরিক সীমানায়। কোথায় জন্ম নিল ফুল, কোথায় জন্ম নিল নতুন শাখা, কোথায় ভালোবাসা থেকে খসে গেল নতুন দুখানি পাতা–কে খেয়াল রাখে?
তবুও রাতের আকাশে নক্ষত্রদের নিঃশব্দ তানের সুর শুনতে ইচ্ছে করে।
বাঁশবনে বাতাসও দোল খায় তাদের সুরে। চুপিচুপি তারা যেন বলে উঠে এই–‘ধীরে বাঁচো, এখন হেমন্ত’।
সুহৃদ, চট্টগ্রাম