সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

পাথরের ফুল

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

পলি মাটির ওপর কিংবা বালির স্তূপের ভেতর একটু এক টুকরো পাথর থাকলে সে নিজেকে আলাদা করে রাখে, তার পাথুরে কঠোরতা দিয়ে, স্বতন্ত্র স্বভাব দিয়ে। বান এলে সে ক্ষয়ে যায় না, পানিতে মিশে যায় না, আলাদা ভেসে ওঠে, আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বা অনঢ় জেগে থাকে জলের গভীরে। পূর্ববঙ্গ তো পুরোটাই পলি মাটি, বালি দিয়ে গড়ে ওঠা ভূখণ্ড। এখানের মানুষের গলে যাওয়ার মিশে যাওয়ার বড় করুণ স্বভাব। বালিদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় না, চিহ্নিত করা যায় পাথরখণ্ডগুলোকে। দেশভাগের পর এই পূর্ব বাংলায় যখন মানুষ পেশাগতভাবে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলাদা হয়ে উঠেছিলেন, যদি ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে বলা হয় তাহলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল হাই, হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আরেকটি নাম জ্বলজ্বল করছে, তিনি অধ্যাপক ড. মহাম্মদ দানীউল হক। তিনি ছিলেন এ ক্ষেত্রের সর্বশেষ কিংবদন্তি, মাইলপাথর। তিনি গত হয়েছেন দুবছর হলো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মৃত্যুর পর তিনি আরও বেশি জীবিত হয়ে উঠছেন তাঁর ক্ষেত্রের মানুষদের কাছে, তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে। প্রথম জীবিত অবস্থায়ই তিনি কিংবদন্তির শিক্ষক, ভাষাবিজ্ঞানীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। আজও যোগাযোগ মাধ্যমে প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির যে ভিডিও ক্লিপটি জনপ্রিয় তা দানীউল হক স্মৃতির। কেমন দেখেছিলেন তিনি দানীউল হককে? তাঁর সে স্মৃতি মধুর নয়, তেতো, তিক্ততায় ভরা। এই হুয়ায়ুন ফরীদি থেকে তাঁর মৃত্যুর আগের দিনের সরাসরি বা দূরবর্তী শিক্ষার্থীর কাছেও তাঁর স্মৃতি প্রায় একই রকম, পাথুরে। কণ্টকাকীর্ণ। অধ্যাপক দানীউল যেন ইচ্ছে করেই তাঁর একটি কঠোর পাথুরে মূর্তি সবার সামনে তুলে ধরতেন। হোক সে পথে ঘাটে বা ক্লাসে। তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে বিখ্যাত হয়ে আছেন রুঢ় ব্যবহারের জন্য। তিনি শিক্ষার্থীদের গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বাস থেকে মাঝপথে নামিয়ে দিতেন। অনার্স ক্লাসে পড়া ধরতেন। না পারলে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। বকাঝকা করতেন। কিন্তু তাঁর কাছে শ্রমণজীবন সমাপ্তির পর তিনি সে সকল শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে ভালোবাসার, কোমল চরিত্রের শিক্ষক হিসেবে ধরা দিতেন। দেবতার আসন নিভৃতে গ্রহণ করতেন। এ যেন পাথর ফুঁড়ে ফুল ফোটার, পাথর ফেটে স্নেহের ঝরনাধারা আবিষ্কারের জেনেসিস।
২. আমার কাছেও দানীউল হক স্যার একইভাবে ধরা দিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার দিন গুলিস্তানে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ বাসে চড়ে বসেছিলাম। বাসটি শাহবাগ পার হওয়ার আগেই নিয়মিত শিক্ষার্থী আর ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। বাসটি শ্যামলীতে পৌঁছালে সেখানে আর কোনো নিয়মিত শিক্ষার্থীরও ওঠার স্থান অবশিষ্ট ছিল না। তখন ভিড়ের ভেতর সামনের আসন থেকে স্পষ্ট ও কঠোর কণ্ঠে একজন কেউ বাসটি থামাতে আদেশ করেন। থামার পর ভর্তি পরীক্ষার্থীদের নামিয়ে দিতে বলেন। তাই করা হয়। কিন্তু ভিড়ের ভেতর সে কঠোর কণ্ঠের মানুষটিকে দেখতে পাই না। তাঁকে আমি পরে মূর্তিমান আবিষ্কার করি ক্লাসে। ছিপছিপে একহারা গড়নের, মেদহীন ফর্সা লম্বা একজন শিক্ষক ভাষাবিজ্ঞান পড়াতে আসেন হাতে একখানা লাল বই নিয়ে। ক্লাসে ঢুকেই তিনি ঘোষণা করেন ভাষাবিজ্ঞান একটি অত্যন্ত শক্ত জিনিস– এই লাল ইটের বইটির মতো। আর তিনি আরও কঠিন করে পড়াবেন। সবাই যেন নিয়মিত ক্লাসে আসে আর খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লাসটি করে। আমরা মনোযোগ দিয়ে ক্লাসটি করি। কিন্তু রক্ষা পাই না। তিনি পড়া আদায় করতেন। দাঁড় করিয়েও রাখতেন। এইভাবে এক সময় তাঁর পর্ব শেষ হয়।
তাঁর কঠিন পর্ব শেষ করে পশ্চিমের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিখন শেখানোর ক্লাসে ঢুকে টের পাই আরে! এ বিষয়গুলো তো আমি আগেই জানি। দানীউল স্যার ধরে ধরে শিখিয়েছেন। কথাগুলো এখন পানির মতোই লাগছে। টের পাই কঠিনকে তরল করে দিয়েছেন আগেই আসল গুরু। তারপর দীর্ঘ পেশাজীবনে নানাবিধ কাজে অনিবার্যভাবে তাঁর শরণাপন্ন হতে হয়। এমনকি তিনিই একমাত্র ভরসার, নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হয়ে ওঠেন ভাষা শিখন শেখানোর বিশেষায়িত কাজে। এবার তাঁকে একদম নতুন রূপে আবিষ্কার করি। নির্ভরযোগ্য, দরদি, স্নেহ, মায়াভরা একজন মানুষ রূপে। পিতা রূপে। তাঁর মৃত্যুর দিনই উপলব্ধি করি আমি আসলে এতিম হয়ে গেছি, পুরো জাতি এতিম হয়ে গেছে এই ক্ষেত্রে। এ কাজে তাঁর মাপের, যোগ্যতার, নির্ভরতার মানুষ আর কেউ নাই। আর চোখের জলে উপলব্ধি করি দানীউল হক স্যার পাথর থেকে কোমল ফুল হয়ে ফুটছেন হৃদয়ে।
২৮ অক্টোবর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মহাম্মদ দানীউল হক স্মরণে মেধাবী ছাত্রদের বার্ষিক এক লাখ টাকার অনুপ্রেরণা ঘোষণা করা হয়েছে। এই অনুপ্রেরণার অর্থ স্যারের পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা হচ্ছে। অন্যদের সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম স্যারের সম্মানে আয়োজিত স্মৃতিমেদুর সেই অনুষ্ঠানে। আগামী দিনের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা দানীউল হক স্যারের প্রজ্ঞার উত্তরাধিকারী হয়ে উঠবেন, এই প্রত্যাশা করি।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com