“কবি” শব্দটি উচ্চারণমাত্রই এক ধরনের ভাবানুভূতির উদয় হয় মানুষের মনে। এই অনুভূতি একেকজনের কাছে একেক রকমের হতে পারে। তবে যুগে যুগে কবি অভিধাটির প্রতি মানুষের ঔৎসুক্যের অভাব ঘটেনি। আজো তা অমলিন।
আলোচনার প্রারম্ভেই আমরা কবি অভিধাটি সম্পর্কে একটুখানি খোঁজখবর করে নিতে পারি। “কর” ধাতুর সঙ্গে ইন্ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে “কবি” কথাটির সৃষ্টি।
কবি হলেন কান্তদর্শী, সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা। ঈষোপনিষদে এইরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।
ব্রহ্মা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে দশ প্রজাপতিকে দৃশ্যমান সকল বস্তু বা প্রাণী সৃষ্টির দায়িত্ব বণ্টন করে দেন।
বৈদিক সাহিত্যালোচনায় বলা হয়েছে– “কবিরেকো প্রজাপতিঃ” কবিও এক প্রজাপতি, অর্থাৎ “স্রষ্টা”। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় কবিকে বলা হয়েছে– নিপুণ, কুশলী, বাগ্মী।
মনুসংহিতায় বিদ্বান, চিন্তাশীল, ভাবুক, বর্ণয়িতা, রচয়িতা। ভাগবতে স্বয়ং “ব্রহ্মাকে” কবি বলা হয়েছে।
কবিকে মেধাবী, বিবেকী, প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিত বলেও অভিহিত করা হয়েছে।
ঋকবেদের শ্লোকগুলো ঋষিদের দ্বারা সৃষ্ট, অর্থাৎ ঋষিরা কবি বটেন।
রাজশেখর তার কাব্যমীমাংসায় একটি কিংবদন্তির উল্লেখ করেছেন।
একবার সরস্বতী পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষায় কঠিন তপস্যায় ব্রতী হন। ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে সরস্বতীকে বলেন, তোমার গর্ভে আমি কাব্যপুরুষকে জন্ম দিচ্ছি।
স্বয়ং ব্রহ্মার ঔরসে, দেবী সরস্বতীর গর্ভে “কবি”র জন্ম।
তো, বুঝতেই পারছেন কবি অভিধাটি কী গভীর তাৎপর্য বহন করে!
এ তো গেল শাস্ত্রীদি ও পুরাণের কথা। আমরা সকলেই জানি আদিকবি বাল্মীকির” কবি” হওয়ার কথা– অলৌকিক আনন্দের ভার/ বিধাতা যাহারে দেন/ তার বক্ষে বেদনা অপার।”
“কবি” অভিধায় যে মহিমা বৈদিক যুগ থেকেই আরোপিত হয়ে আসছে তার সারবত্তা আছে বৈকি এখনও। কবিরা এখনও কিন্তু বিবেকী, মেধাবী, কান্তদর্শী, বিদ্বান ও প্রাজ্ঞ।
২.
বৈদিক ও তৎপরবর্তীকালে কবির জীবন মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে আশ্রমাশ্রয়ী ছিল। ধীরে ধীরে কবির জীবনও পাল্টে যেতে থাকে। মধ্যযুগে রাজানুগ্রহে তার জীবনজীবিকা নির্বাহ হতো। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়।
এই তো সার্ধশত বৎসর আগেও মহাকবি মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব– এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে কী দুঃসহ জীবনযাপন করে গেছেন! কী নিদারুণ অর্থকষ্টে মাইকেল মধুসূদন দত্তের দিনাতিপাত হতো।
৩.
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কবির জীবন যথার্থ অর্থেই দুর্বিষহ এক জীবন। তাঁকে জীবিকার জন্য দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে হয়। দিনশেষে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে তাঁকে ঘরে ফিরতে হয়– ধ্যানের জন্য সামান্য সময়ই অবশিষ্ট থাকে তাঁর।
“ভাবুক” যদি ভাবনার জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ না পান তবে মহার্ঘ ভাবনা-বীজ কী করে উপ্ত হবে তাঁর মস্তিষ্কে, হৃদয়ে।”
বিবেকী কবি আজ কারো অনুগ্রহ-প্রার্থী হতে চান না, তিনি চান তাঁর রচিত গ্রন্থের বিক্রয়লব্ধ অর্থেই চলুক তাঁর সংসার।
১৪ কোটি মানুষ যদি ভাষাশহীদের মহান আত্মদানের পরবর্তী বাহান্ন বছরে ভাষা সচেতন হতেন, তবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আর অন্য চিন্তা করতে হতো না।
কারো কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নয়– কারো কোনো অনুগ্রহ নয়, করুণা নয়।
কবি চায় তাঁর মেধা ও মননের মর্যাদা, জাতি যদি তা দিতে পারে তবে সে নিরুদ্বিগ্নচিত্তে দেবে তাঁর ধ্যানের শস্য– মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের অর্ঘ্য, নক্ষত্রোজ্জ্বল পঙ্ক্তিমালা।