সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মাটি, মানুষ ও কৃষকের কবি নজরুল

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

‘ওঠ রে চাষী জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল।/আমরা মরতে আছি—ভাল করেই মরব এবার চল\’

কাজী নজরুল ইসলামের ‘কৃষাণের গান’ কবিতার প্রথম দুটি পঙক্তি মনে করিয়ে দেয়, আমরা যে তাঁকে বিদ্রোহের কবি বলি, সাম্যের কবি বলি, প্রেমের কবি বলি; কিন্তু তিনি আসলে ছিলেন মানুষের কবি।আর সেই মানুষের বড় একটি অংশ ছিল বাংলার কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

 

নজরুলের কবিতায় বন্দুকের গর্জন যেমন আছে, আছে লাঙলের শব্দও। বিদ্রোহের আগুন যেমন আছে, তেমনি আছে মাটির ঘ্রাণ। তাঁর গানে প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে; কিন্তু তাঁর ভেতরেও বারবার ফিরে এসেছে সেই মানুষটি, যে মাঠে ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায়, অথচ নিজের জীবনের নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করতে পারে না।

আমি ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষকদের কাছে একাধিকবার জানতে চেয়েছি, নজরুল এই বাংলার কৃষকদের কিভাবে দেখেছেন, তাঁদের নিয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনা কী ছিল।

আজকে আমাদের কৃষকের হাতে আধুনিক যন্ত্র এসেছে। ধানের জাত বদলেছে। সেচের প্রযুক্তি বদলেছে।ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষি এখন শুধু জীবিকার ক্ষেত্র নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু কৃষকের জীবন থেকে অনিশ্চয়তা কি পুরোপুরি দূর হয়েছে?

 

নজরুলের সময় আর আজকের সময় এক নয়। কিন্তু কৃষকের সেই মৌলিক প্রশ্নটি যেন একই রয়ে গেছে—যে মানুষটি খাদ্য উৎপাদন করে, তার নিজের জীবন কতটা নিরাপদ?

নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় আমরা দেখি মানুষকে শ্রেণি, পেশা কিংবা পরিচয়ের সংকীর্ণতায় না দেখে তার শ্রম ও মানবিক মর্যাদাকে সামনে আনার চেষ্টা। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তাঁর যে গভীর সংবেদনশীলতা, তা আমাদের কৃষকের জীবনকেও নতুন চোখে দেখতে শেখায়।

১৯৪১ সালে সাপ্তাহিক ‘কৃষক’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় সে সময়কার কৃষকদের দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে।

‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ,/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’ আবার কবি যখন উচ্চারণ করেন, ‘জরির পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধনীরা এসেছে সেথা,/এই ঈদগাহে তুমি কি ইমাম, তুমি কি এদেরই নেতা?’

এই সময়ে এসে খুব কি পাল্টেছে কৃষক বা কৃষি শ্রমিকের অবস্থা?

কৃষকও একজন শ্রমিক। পার্থক্য শুধু তাঁর কর্মক্ষেত্রটি কারখানার ভেতর নয়, খোলা আকাশের নিচে, মাটির ওপর। একজন কৃষক যখন ভোরে মাঠে যান, তখন তাঁর সঙ্গে শুধু একটি লাঙল, কোদাল বা আধুনিক যন্ত্র থাকে না; সঙ্গে থাকে একটি পরিবারের প্রত্যাশা। বীজ বোনার সময় তিনি শুধু বীজ মাটিতে দেন না, নিজের ভবিষ্যৎও মাটিতে পুঁতে দেন।

আজ কৃষির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো, কৃষক আর আগের মতো শুধু নিজের জমির ওপর নির্ভরশীল নন। বাজার, প্রযুক্তি, আবহাওয়া, ব্যাংকঋণ, সরবরাহব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাজার—সবকিছুই তাঁর কৃষিজীবনের সঙ্গে যুক্ত। একজন কৃষক হয়তো জমিতে ভালো ফলন ফলান, কিন্তু বাজারে দাম পড়ে গেল। অন্যদিকে কোনো বছর উৎপাদন কম হলো, কিন্তু বাজারদর বেড়ে গেল। ফলে কৃষকের আয় অনেক সময় প্রকৃতির পাশাপাশি বাজারের ওপরও নির্ভরশীল। অথচ এই বাজারে কৃষকের তেমন অংশগ্রহণ থাকে না। কৃষক সেই সিন্ডিকেট ভেদ করে কখনোই ঢুকতে পারেন না।

নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এখানে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে শেখায়—কৃষক কি শুধু উৎপাদনকারী, নাকি কৃষি অর্থনীতির একজন সম্মানিত অংশীদার?

নজরুল গবেষক অধ্যাপক মাওলা প্রিন্স আমাকে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন, সেখান থেকে জানতে পারি, ১৯২৬ সালে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনে নজরুলের একটি চিঠি অভিভাষণ হিসেবে পাঠ করা হয়। ‘কৃষক-শ্রমিকের প্রতি সম্ভাষণ’ শীর্ষক সেই অভিভাষণের একাংশে নজরুল কৃষকদের উদ্দেশে উল্লেখ করেন—

‘আপনারাই দেশের প্রাণ, দেশের আশা, দেশের ভবিষ্যৎ। মাটির মায়ায় আপনাদের হৃদয় কানায় কানায় ভরপুর। মাটির খাঁটি ছেলে আপনারাই। রৌদ্রে পুড়িয়া বৃষ্টির জলে ভিজিয়া, দিন নাই রাত নাই, সৃষ্টির প্রথম দিন হইতে আপনারাই তো এই মাটির পৃথিবীকে প্রিয় সন্তানের মতো লালন-পালন করিয়াছেন, করিতেছেন ও করিবেন। আপনাদের মাঠের এক কোদাল মাটি লইলে আপনারা আততায়ীর হয় শির নেন কিংবা তাকে শির দেন। এত ভালোবাসায় ভেজা যাদের মাটি, এত বুকের খুনে উর্বর যে শস্যশ্যামল মাঠ, আপনারা আমার কৃষাণ ভাইরা ছাড়া অন্য অধিকারী কেহ নাই। আমার এই কৃষাণ ভাইদের ডাকে বর্ষায় আকাশ ভরিয়া বাদল নামে, তাদের বুকের স্নেহধারার মতোই মাঠ-ঘাট পানিতে বন্যায় সয়লাব হইয়া যায়, আমার এই কৃষাণ ভাইদের আদর-সোহাগে মাঠ-ঘাট ফুলে-ফলে-ফসলে শ্যামল সবুজ হইয়া ওঠে, আমার কৃষাণ ভাইদের বধূদের প্রার্থনায় কাঁচা ধান সোনা রঙে রাঙিয়া উঠে, এই মাঠকে জিজ্ঞাসা কর, মাঠে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইবে, এ মাঠ চাষার, এ মাটি চাষার, এর ফুল-ফল কৃষক-বধূর।’

আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষির ধরন বদলে যাচ্ছে, তখন নজরুলের সেই মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটিকে নতুন করে ভাবা দরকার। আমাদের কৃষক এখন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছেন না; তাঁকে লড়তে হচ্ছে অনিশ্চিত আবহাওয়া, উৎপাদন খরচ, বাজারব্যবস্থা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া অর্থনীতির সঙ্গেও। তবু কৃষক মাঠে যান। কারণ তিনি জানেন, ধান না ফললে শহরের মানুষের থালায় ভাত উঠবে না। সবজি না ফললে বাজারে সবজি আসবে না। দুধ, ডিম, মাছ, মাংস—কোনোটিই কৃষকের শ্রম ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছবে না। এই জায়গাটিতেই নজরুল আজও আমাদের সমকালীন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের মর্যাদা তার পেশায় নয়, তার শ্রমে। আর কৃষকের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই তো আমাদের সভ্যতা।

নজরুলের জন্মজয়ন্তী কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর কবিতা আবৃত্তি করি, গান শুনি, তাঁর বিদ্রোহের কথা বলি। কিন্তু তাঁর মাটির মানুষটির কথা কি যথেষ্ট বলি? আজ কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে আমার মনে হয়, নজরুলকে স্মরণ করার একটি বড় উপায় হতে পারে আমাদের কৃষককে নতুন করে দেখা। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরদ্ধে। তাঁর সাম্য ছিল মানুষের মর্যাদার পক্ষে। তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বাংলার কৃষকের সত্যিকারের মর্যাদা।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com