শিল্পপতি ও সমাজসেবক জন পারডুর নামানুসারে ১৮৬৯ সালে পারডু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে পারডু আজ বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সুপরিচিত।

এরপর নিল আর্মস্ট্রং হল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামনে গেলাম। দৃষ্টি কেড়ে নিল ভবনটির সামনে অবস্থিত নিল আর্মস্ট্রংয়ের ভাস্কর্য। চাঁদে অবতরণকারী প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন এই স্বনামধন্য মার্কিন নভোচারী ও বৈমানিক। পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি। ১৯৪৭ সালে তিনি পারডুর এরোস্পেস প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৭০ সালে পারডুর শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রকৌশলে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, নিল আর্মস্ট্রংয়ের সাফল্য আজও নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে ও বিজ্ঞান গবেষণায় এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে চলছে। ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল অনেক শিক্ষার্থী। আধুনিক স্থাপত্যকলার ভবনটির পুরোটাই কাচঘেরা। এখানে রয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির গবেষণাগার।

এর কিছু পরেই চোখে পড়ল আরেকটি ভাস্কর্য, যা দেখতে ব্রোঞ্জের তৈরি ইংরেজি ‘পি’ অক্ষরের মতো। তবে এর কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কাছে জানতে পারলাম, এর নাম ‘আনফিনিশড ব্লক পি’। যাঁরা পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেও ডিগ্রি অর্জনের আগেই শিক্ষাজীবন থেকে সরে গেছেন, অথবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন মাঝপথেই, তাঁদের সম্মানে এই ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে। অকস্মাত্ ফুরিয়ে যাওয়া অসংখ্য বন্ধুত্ব, স্বপ্ন ও অর্জনের স্মৃতি বহন করে চলছে এই ভাস্কর্য।
ক্যাম্পাসের গ্রন্থাগারে পৌঁছতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। বিশাল পাঠাগারে প্রবেশ করেই জ্ঞানের জগতে হারিয়ে গেলাম। চারদিকে সারি সারি বই, এর মধ্যেই আছে আধুনিক ডিজিটাল গবেষণা ব্যবস্থাও। সব মিলিয়ে জ্ঞানচর্চার এক অনন্য পরিবেশ। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গবেষণায় ব্যস্ত। কারো চোখে ক্লান্তি নেই, বরং রয়েছে নতুন কিছু আবিষ্কারের আগ্রহ।
কিছুক্ষণ পর দেখা হলো বাংলাদেশি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। জানতে পারলাম, পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তাঁরা নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন করে থাকেন। প্রবাসজীবনেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে হূদয়ে ধারণ করার এমন আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা শুনে হূদয় ছুঁয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, হাজার মাইল দূরে থাকলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের আত্মিক বন্ধন আজও অটুট।
বিকেলের দিকে গেলাম বেল টাওয়ারে। দূর থেকে এর ঘড়ির ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। বিকেলের সোনালি আলোয় টাওয়ারটির অন্য রকম সৌন্দর্য নজর কেড়ে নিল। এরপর ঘুরে দেখলাম রস-এইড স্টেডিয়াম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক বিশাল এই স্টেডিয়াম। খেলার সময় শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে বলে জানালেন স্থানীয় একজন শিক্ষার্থী। কাছেই রয়েছে ইলিয়ট হল অব মিউজিক। সেখানে নিয়মিত কনসার্ট, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও খেলাধুলার এমন প্রাণবন্ত উপস্থিতি পুরো ক্যাম্পাসকে আরো বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিমানবন্দর ঘুরতে গিয়ে অনুধাবন করলাম, এটি অন্যান্য বিমানবন্দরের চেয়ে আলাদা। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এটি। যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিমানবন্দর আছে। বিমান ও মহাকাশ প্রকৌশল, এভিয়েশন টেকনোলজি এবং ফ্লাইট প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহূত হয় এটি। এখানে উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ, বিমান পরিচালনা, এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট ও গবেষণার সুযোগ পেয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। আধুনিক রানওয়ে, প্রশিক্ষণ বিমান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো তাঁদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে ব্যাবহারিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। বিমান প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতির পেছনেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ক্যাম্পাস ভ্রমণ করতে করতে পড়ন্ত বিকেল ছাপিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সবুজ পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং স্বপ্ন গড়ার পীঠস্থান। সেখানে যেমন রয়েছে ইতিহাসের ঐতিহ্য, তেমনি আছে ভবিষ্যত্ নির্মাণের সাহসী প্রত্যয়। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এলে ক্যাম্পাস ত্যাগ করলাম। ফেরার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, পারডুর স্মৃতি কখনোই ভোলার নয়।
লেখক : কৃষিবিদ, কলামিস্ট ওচেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন