ঢাকায় একটি শিক্ষিত পরিবারে ৮ বছরের এক শিশুকে নিয়ে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মা-বাবাকে। অতিথি এলেই সে জোরে চিৎকার করে, বড়দের কথার মাঝে বাধা দেয়, অনুমতি ছাড়াই অন্যের মোবাইল হাতে নেয়। শুরুতে মা-বাবা বিষয়টিকে ‘বাচ্চা মানুষ’ বলে এড়িয়ে গেলেও পরে স্কুল থেকেও অভিযোগ আসতে শুরু করে। শিক্ষকরা জানান, শিশুটি সহপাঠীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। তখনই প্রশ্ন ওঠে–শিশুকে কি শুধু বইয়ের শিক্ষা দিলেই একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে সহবত বা শিষ্টাচার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিশুর আচরণ, ভদ্রতা, সম্মানবোধ ও সহমর্মিতা মূলত পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে সঠিক মূল্যবোধ শেখানো হলে শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশ ইতিবাচক হয়।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন, “শিশুর শিক্ষার প্রথম ধাপ শুরু হয় পরিবার থেকে। সেই শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আচরণ শিক্ষা। ছোটবেলা থেকে যদি ভদ্রতা, সম্মানবোধ ও সামাজিক আচরণ শেখানো যায়, তাহলে শিশুর ব্যক্তিত্ব সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে।”
তিনি জানান, অনেক সময় শিশুর আচরণগত সমস্যার পেছনে পারিবারিক পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখে। এক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, সে নিয়মিত সহপাঠীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। পরে জানা যায়, বাড়িতেও শিশুর সামনে ঝগড়া, গালাগালি ও আক্রমণাত্মক আচরণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা মূলত অনুকরণ করে শেখে। পরিবারে বড়দের আচরণই তারা বাইরে প্রয়োগ করে।
অন্যদিকে, খুলনার একটি পরিবারের ১০ বছরের এক সন্তান ছোটবেলা থেকেই “ধন্যবাদ”, “দুঃখিত”, বড়দের সম্মান করা এবং অন্যকে সাহায্য করার অভ্যাস গড়ে তোলে। স্কুলের শিক্ষকরা জানান, শিশুটি নেতৃত্বগুণ ও সহমর্মিতার জন্য সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি প্রমাণ করে, শিষ্টাচার শিক্ষা শিশুর সামাজিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু মনোবিজ্ঞানী ডা. মেহজাবিন রহমান বলেন, ‘৩ থেকে ১০ বছর বয়স হলো আচরণ শেখানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ বয়সে শিশুকে ভদ্রভাবে কথা বলা, অনুমতি নেওয়া, ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অন্যকে সম্মান করা শেখাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, শুধু বকাঝকা বা শাস্তি দিয়ে শিষ্টাচার শেখানো সম্ভব নয়; বরং মা-বাবাকেই শিশুর সামনে ইতিবাচক আচরণের উদাহরণ তৈরি করতে হবে। কারণ শিশুর সামনে ঝগড়া, মিথ্যা বলা বা অন্যকে অসম্মান করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে শিশুর নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার বিষয়ে শিশু আইন ২০১৩ এবং জাতীয় শিশু নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও সহবত শিক্ষা নিয়ে আলাদা কোনো আইন নেই, তবুও শিশুর ইতিবাচক বিকাশে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ‘অনুগ্রহ করে’, ‘ধন্যবাদ’ ও ‘দুঃখিত’ বলার অভ্যাস করাতে হবে। পাশাপাশি বড়দের সম্মান, ছোটদের প্রতি সহমর্মিতা, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক আচরণ শেখাতে হবে। বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা ও আচরণভিত্তিক কার্যক্রমও বাড়ানো প্রয়োজন।
শিশুরা হলো কাঁচা মাটির মতো; যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সেভাবেই তারা গড়ে উঠবে। সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য নয়; বরং একজন নম্র-ভদ্র, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্ববান মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে সহবত বা শিষ্টাচার শিক্ষার বিকল্প নেই। পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে একটি সুন্দর সমাজ গঠনের ভিত্তি।