আলোর শহর। ভালোর শহর। পরিপাটি বাঁধা চুলের মেয়েটি।
‘জেউন প্যাঁতিত সোয়ারে সোসোয়া’। একটা সান্ধ্য পার্টিতে যেতে হবে তাকে।
মুঠোফোনটা টকটকে লাল কাঁধব্যাগটার মুখে ধরতেই গিলে খেল মাছের মতো। সন্ধ্যার বুকে সুগন্ধ মেখে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটি। পথটা আড়মোড়া ভাঙল যেন। সেই বাঁকে মিলিয়ে গেল হঠাৎ।
মাথার খুব কাছেই পাক খাচ্ছে ধূসর ডানার একটা সি-গাল। একবার উত্তর থেকে ঢুকে পড়ছে দক্ষিণে। বাঁক নিয়ে, শাঁ করে পুব থেকে পেরিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমে। ডেকে উঠছে বাঁশ চেরার শব্দে। ছন্নছাড়া পাখিটা ভবঘুরে নিশ্চয়ই। তা না হলে এখানে ওর কী কাজ? এত এত দালানের ভিড়ে! কাছেপিঠে তো এক টুকরো জলাশয়ও নেই কোনো। সেইন নদী, সে তো খানিকটা দূরের পথ!
‘এই, তোর ঘর নেই? সন্ধ্যা হলো, বাড়ি ফিরবি না?’ ঢিল ছোড়ার মতো প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিই পাখিটির দিকে। খরখরে গলায় ডেকে ওঠে আবার। ‘এই, তোর মা নেই? মা চিন্তা করবে না? যা ভাগ!’ কী বুঝল জানি না, উড়ে গেল।
নিজেকে পাখি মনে হয়। ডানা আছে। পালক নেই। পালকগুলো ঝরে গেছে ছাতারে পাখির মতো। মা-ও পথ চেয়ে বসে থাকে আমার। যোজন যোজন দূরে। ‘বাসায় ফিরবি কখন?’ মুঠোফোনে বার্তা পাঠায় মা। ‘যাই মা, এইতো যাচ্ছি।’ মিছেমিছি আশ্বাস দিই মাকে। আলুথালু ভাবনায় মন বিষণ্ন হলে ঘরে ফেরার ইচ্ছে হয় না আমার। এই যেমন আজ। দিনভর মায়ের কথা মনে পড়ছে। নিষ্প্রভ হয়ে আছে বুক। আলুথালু ভাবনারা এলেই কোথাও একটা ডাহুক ডেকে ওঠে মনে। টুব-টুব-টুব। উশপিশে মন নিয়ে তখন হেঁটে বেড়াই নিরুদ্দেশ। কিংবা কোথাও বসে পড়ে মানুষ দেখি। নানা রঙের মানুষ। সাদা, কালো, ধূসর, লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, গোলাপি, বাদামি, বেগুনি পোশাকের মানুষ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, হেঁটে বেড়াচ্ছে বিন্দু বিন্দু রং। আবার ওপর থেকে, পাখিরা দেখে, কালো কালো বিন্দু। চলমান। অথবা থমকে থাকা, বলপেনে আঁকা কালো রঙের বৃত্ত।
২.
এক কাপ কাফে এলো সামনে। সঙ্গে আভের দ্যো। কাফের সঙ্গে এক গ্লাস পানি, পারির রেস্তোরাঁগুলোর অলিখিত রীতি বলা যায়। কাপ থেকে পেঁচানো ধোঁয়া উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। অমাবস্যার অন্ধকারের মতো কাফের চারপাশে বাদামি রঙের ফেনা। ছোট্ট চামচটা ঠেকাতেই খুদিপানা পুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো দেখাল। পানার মতো গোল হয়ে সরে গেল ফেনাগুলো। চামচ তুলতেই ধীরে ধীরে জড়ো হলো আবার।
এত কাফে একসঙ্গে পান করি না সচরাচর। ছোট্ট এক্সপ্রেসো কাফেই চেয়েছিলাম শুরুতে। বারের তরুণ আরবি তরুণটি বলল, তেরাসে বসতে হলে বড়টা নিতে হবে।
সাতলে পারির অন্যতম ব্যস্ত তল্লাট। তবে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাটা একটু আলাদা বলা যায়। সন্ধ্যার ভাঁজে ভাঁজে কমেছে লোকজনের আনাগোনা। যদিও গত দুদিনের হিমপাতের তুলনায় আজ ঠাণ্ডা কিছুটা কম। গত দুদিন তুমুল নারকেলগুঁড়ো পতনে শুভ্র হয়েছিল চরাচর। এমন তুষারপাত গত কয়েক বছরে দেখেনি পারিজিয়ানরা। দিনদুপুরে শিমুল তুলোর মতো ঝরে পড়া হিম বদলে দিয়েছিল পারির চিরচেনা রূপ। গাছের পাতায় পাতায় ফুটেছিল নুনফুল। বুনো পায়রাগুলো পালক ফুলিয়ে বসে ছিল নিশ্চুপ। ডানার উষ্ণতা হারিয়ে। হিমে কুঁকড়ে গিয়েছিল সে দুপুর। আজ অবশ্য তার ছিটেফোঁটাও নেই কোথাও।
কাজ শেষে ঘরমুখো কিছু মানুষ ছুটছে ভূতল স্টেশনে। তল মানে ভালোই নিচে। একটা পাঁচ-ছতলা ভবনকে উল্টো করে মাটিতে পুঁতে দিলে যা হয়। চারপাশে গোল হয়ে দোকানপাট, শপিং মল—লেয়াল। তার নিম্নভাগে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ট্রেন-মেট্রোর স্টেশন। চারপাশে তাকানোর ফুরসত নেই ঘরমুখোদের। সময়ের সঙ্গে চলতে হয় এখানে। সবই চলে ঘড়ির কাঁটা মেনে। যান্ত্রিক জীবনের কথাটা খুব যায় পারির মানুষের সঙ্গে। সপ্তাহান্তে ছুটির দিন দুটো মুলোর মতো নাকের ডগায় বাঁধা। তার লোভেই এই দৌড়। ‘মেট্রো-বুলো-দোদো।’ অর্থাৎ মেট্রো রেলে চড়ো। কাজে যাও। কাজ থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুম থেকে উঠে ফের ছোটো কাজে। এভাবেই কাটে সপ্তাহের পাঁচ দিন।
প্রতিদিন সকালে পঙ্গপালের মতো মানুষ জড়ো হয় পারিতে। কাজের জন্য। সন্ধ্যা নামলেই দলছুট পিঁপড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে শহরতলিতে। পারির ব্যয়বহুল আবাসন, তার ওপর অপ্রতুল। তাই শহরতলিই হয়ে উঠেছে এসব মানুষের ঠিকানা।
ঘন কফিতে চুমুক দিতেই ভারী হয়ে এলো জিহ্বা। প্রথম প্রথম এই গাঢ় তেতো স্বাদ মুখ ফিরিয়ে নিলেও এখন মানিয়ে গেছে। কাফের সঙ্গে আঙুলের মতো লম্বা স্যাশেতে ছুকর বা চিনি। প্রথম প্রথম দু-একটা লাগলেও এখন এগুলো পড়েই থাকে টেবিলে।
পারির রেস্তোরাঁগুলোর সামনে ছোট্ট একটা উঠোন থাকে। পথের পাশেই। মাথার ওপর ছাতার মতো গোল বা লম্বা শামিয়ানা। তার নিচেই চেয়ার-টেবিল পাতা। ফরাসিরা বলে তেরাস। ভোজন কিংবা ঠাণ্ডা-গরম পানীয়তে হালকা চুমুক দিতে দিতে মানুষ দেখা। পথের মানুষ। কাছের মানুষ। দূরের মানুষ।
ল্য বোঁ পেশরের তেরাসে বসা হয় সপ্তাহে দু-এক দিন। সময় কাটাই, অলস। এক কাপ কাফে নিয়েও কাটিয়ে দেওয়া যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ এসে বিরক্ত করবে না। বলবে না, একটিবারও, উঠে যেতে। এই তেরাসটায় প্রায় সময়ই মাছির মতো চাক বাঁধে মানুষ। কয়েকটি পথের সন্ধিতে হওয়ায় এখান থেকে চারপাশ অবলোকন করা যায় সহজেই। অথচ আজ সন্ধ্যায়, বেত আর প্লাস্টিকের মিশেলে গড়া চেয়ার আর শ্বেতশুভ্র টেবিলগুলো ফাঁকা বললেই চলে। যেখানে বসে আছি আমি, তার দুটো টেবিল পরে একটি যুগল। পাশাপাশি বসে। ছেলেটির পোশাকের রং বেলিফুল সাদা। মেয়েটির লাল গোলাপ। বুনো পায়রার মতো খানিক বাদে বাদে চুমু খাচ্ছে ঠোঁটে ঠোঁটে। প্রেমের শহরে দিবালোকে চুমু খাওয়া পাপ নয়। বরং এই চুমু খাওয়া ঠোঁটগুলো পারিকে দিয়েছে চিরযৌবন। পথেঘাটে, ট্রেনে, বাসে, মেট্রোতে, রেস্তোরাঁয় কিংবা পার্কে এই দৃশ্য নিত্য চোখে পড়ে। তবু ক্লিশে নয়। বাগানের হররোজ ফোটা একই ফুলের মতো অনিন্দ্য। যে দৃশ্য চোখে ক্লান্তি নয়, আনে প্রফুল্লতা।
আবার কখনোসখনো ডেকে আনে বিপত্তিও। এই তো কদিন আগে ট্রেনে সাক্ষী হলাম এমন একটি ঘটনার। এরওএর ট্রেনটি যাচ্ছিল লাপ্লাসের উদ্দেশে। সাঁমিশেল নতরোডামে থামতেই উঠল তরুণ দুজন। দুজনের গায়ে ওভারকোট। বুক খোলা। তার নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে পুল। একজন আকাশি রঙের। অন্যজনেরটি গাঢ় কমলা। আকাশির কোঁকড়ানো চুলে সাদা ও নীল রঙের মিশেল। কমলার চুলগুলো কালো। ঝরনার মতো সামান্য নেমে গেছে কাঁধে। দুজনের কানেই ছোটবড় রিং ফুটো করে ঝোলানো। কমলা তরুণের নাকে বিঁধানো নথের মতো ছোট্ট রিং। পায়ে চকচকে চামড়ার বুট। পারফিউমের ঘ্রাণ কিংবা তাদের বেশভূষার কারণেই হোক, যাত্রীদের দৃষ্টি ছুটে গেল তাদের দিকে। জানালার পাশে মুখোমুখি সিট দুটোতে বসল দুজন। নিচু স্বরে দু-একটি বাক্য বিনিময়, স্ফিত হাসিমুখ। কথার ফাঁকে একসময় দূরত্ব ঘুচিয়ে নিল দুজনের মাঝে। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খেল একবার। আরো একবার। হাতে হাত গুঁজে এভাবে থেমে থেমে প্রণয় বিনিময় করছে দুই তরুণ। এই দৃশ্য দেখে তাকিয়ে ছিলেন ওদের পাশেই বসা একজন যাত্রী। তাঁর চোখ সরছিল না ওই দুজনের ওপর থেকে। তরুণ যুগল বিষয়টি খেয়াল করে কিছুটা ভ্রু কুঁচকে নিজেদের মধ্যে বিরক্তি জানায়। অথচ সেই যাত্রীর তাতে থোড়াই কেয়ার। তিনি আড়ে আড়ে দেখছিলেন ওদের। দুজন সমমেরুর মানুষের এই প্রণয়, তার চোখে কৌতূহলের জন্ম দেয় হয়তো। যদিও ফরাসিদেশে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্কের মতো এটিও খুব স্বাভাবিক। আইনে সুরক্ষিতও।
লোকটির চাওনিতে দুজনের বিরক্তি উঠল তুঙ্গে। হঠাৎ তাদের একজন ট্রেনের দেয়ালে সেঁটে দেওয়া একটা নম্বর তুলে নিল মুঠোফোনে। বেশ কিছু সময় মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত রইল আকাশি তরুণ। গন্তব্যে পৌঁছা অবধি। ট্রেনটি যখন লাপ্লাসে খুঁটি গাড়ল, দরজা খুলে যেতেই দুজন পুরুষ ও একজন নারী পুলিশ সদস্য উঠে এলেন ত্বরিত। লোকজন নেমে যাচ্ছে। তার ভিড়ে দেখা গেল, ওই তরুণ যুগল আঙুলের ইশারায় অতিকৌতূহলী যাত্রীকে দেখিয়ে দিয়ে নেমে গেল প্ল্যাটফর্মে। লোকটিকে নিয়ে পুলিশ সদস্যরাও নামলেন। বোঝা গেল, অপলক দৃষ্টি নিক্ষেপে তরুণ যুগলকে বিব্রত কিংবা বিরক্ত করার দায় তাঁর। আইনে এটি অন্যায়। তারপর কী হলো, তাড়া থাকায় তা আর দেখা হয়নি দাঁড়িয়ে।
৩.
ছেলেটির কাঁধে মেয়েটি মাথা রেখে তাকিয়ে আছে পথের দিকে। ছেলেটি হাতের আঙুলগুলো চালিয়ে যাচ্ছে মেয়েটির সফেদা রং চুলের ভাঁজে ভাঁজে। টেবিলের দুটো পানীয় গ্লাস দাঁড়িয়ে আছে ফ্লেমিঙ্গো পাখির মতো। তাতে রাখা তরলে মুখ ছোঁয়াচ্ছে মিউনিসিপ্যালের হালকা হলদে আলো। ছেলেটি একটি গ্লাস মেয়েটির ঠোঁটে ছোঁয়ালে সামান্য পানীয় গড়িয়ে গেল দুই ঠোঁটের মাঝের চিকন ভাঁজে। টেবিলের ওপর কিছু খাবারও পড়ে আছে। কিছুটা চালান হয়েছে পেটে। বাকিটা অপেক্ষায়। যুগলের সেদিকে মন নেই খুব। যতটা মনোযোগী একে অন্যের প্রতি। কথোপকথনের শব্দগুলো প্রজাপতির মতো উড়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশ। অলক্ষ্যে হাসির ঝরঝরে গুঁড়ো বাতাস ঠেলে আনছে এদিকটায়।
কাফের সঙ্গে একটা সিগারেট যেন ওই যুগলের মতোই। ধোঁয়াটা উড়িয়ে দিয়ে কাফেতে চুমুক দেওয়ার মুহূর্তেই চোখ দুটো পিংপং বলের মতো লাফাতে লাফাতে গিয়ে পড়ল পথের ওপাশে পুবেল বা আবর্জনার ঝুড়িটায়। লোহার ফ্রেমে প্লাস্টিকের ব্যাগ আঁটা। এখানকার মানুষের মুখে, পুবেল ছাক। একটা মানুষ। হাত দুটো ভরে দিয়ে সেই ছাকে কী যেন খুঁজছে গভীর মনোযোগে। যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে এখানে। একবার ডান পাশে কাত হয়ে ডান হাতটা চালিয়ে দিচ্ছে আবর্জনার ভেতরে। আবার বাঁ পাশে কাত হলে তলিয়ে যাচ্ছে বাঁ হাতটা। লোকটির মাথাজুড়ে এলোমেলো চুল তালের আঁশের মতো। গায়ের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া কালো জ্যাকেটটা হাঁটু পর্যন্ত নেমে গেছে। বাকিটুকু ময়লা কুটকুটে জিন্স। চামড়ার জুতো জোড়াও বেশ নাজুক। জ্যাকেটের ওপাশ থেকে ফুলে থাকা বেঢপ পেটের মতোই পিঠে ঝুলছে ব্যাগ। ময়লা-ধুলোয় তার অবস্থাও দাড়ি-গোঁফে একাকার ছেলেটির মতোই জরাজীর্ণ। বয়সে তরুণ হলেও স্বাস্থ্যের ভগ্নদশা ছায়া ফেলেছে অকালবার্ধক্যের।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। হাড়-জিরজিরে। নাড়াতোলা ফসলের মাঠের মতো চুলগুলো কোথাও কোথাও উধাও তার। যেটুকু আছে, ফিনফিনে। চোখ দুটো ঘোলাটে মাছের মতো। খসখসে মুখের ত্বক আর ভাঙা চোয়াল বয়সের আগেই বুড়িয়ে দিয়েছে তাকেও। তার গায়ে জড়ানো রংচটা নীল জ্যাকেট। কোথাও কোথাও ছিঁড়ে বেরিয়ে আছে ভেতরের শুভ্র আঁশ। পরনের পাজামাটা ছাই রঙের, ঢোলা ট্রাউজার ঢেকে রেখেছে ছেঁড়াফাটা জুতো জোড়া।
তরুণটি এবার কিছু একটা খুঁজে পেল বোধ হয়। একটা কাগজের বাক্স খুলতেই স্যান্ডউইচের একটি টুকরো মিলল তাতে। ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির মুখে তুলে দিল সেই টুকরোটি। তারপর নিজেও দাঁতে কাটল বাকিটুকু। তারপর আরো একটি কোঁচকানো কাগজের ব্যাগ খুলে কিছু একটা খুলে পেল তারা। একটা প্লাস্টিকের কৌটো, যাতে ছোট ছোট করে কাটা ফলের সামান্য অবশিষ্ট। এভাবে খুঁজে পেল তারা দুটি কোমল পানীয়র ফেলে দেওয়া ক্যানও। আকাশের দিকে মুখ তুলে ক্যান দুটো দুজনে এমনভাবে খাড়া করে ধরল যে, পানীয়র শেষ বিন্দুটিও গড়িয়ে আসবে সহজেই। তাদের পাশেই দুটি যুবককে দু’হাত আকাশে তুলে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগগুলো তল্লাশি করছেন উবু হয়ে বসে থাকা নারী পুলিশ সদস্যটি। তাঁর আঁটসাঁট পোশাকের ভেতর থেকে স্পর্ধা দেখাচ্ছে বুক। নধর নিতম্ব মনে করিয়ে দেয় ফরাসি বিখ্যাত ভাস্কর ওগ্যুস্ত রঁদ্যার গড়া নারীর অবয়ব। আইনের কঠিন চোখ ফাঁকি দিয়ে এই শহরে মাদকের বেসাতিও নাকি চলছে বহুদিন। সন্দেহের চোখে পড়লে এমন তল্লাশি অস্বাভাবিক নয়।
অন্নজলের সন্ধানী যুগলটি তৃপ্ত হলো না হয়তো। ছেলেটি মেয়েটির হাত ধরে এগিয়ে গেল অদূরের আরো একটি আবর্জনার পাত্রের দিকে।
৪.
বেবি স্ট্রলার ঠেলে ঠেলে হেঁটে যাচ্ছেন একজন মা। একটা ছোট শিশু গুটি গুটি পায়ে হাঁটছে তার পিছু পিছু। হাতে তার সবুজাভ একটা প্যাকেট। বাদামের মতো ছোট ছোট দানা। তার কয়েকটি তুলে মুখে দিচ্ছে শিশুটি। পেছন ফিরে ছোট্ট কুকুরছানাটিকে দেখতে গেলে বেখেয়ালে পড়ে যাচ্ছে দু-একটি। কুকুরছানা থেমে গেলে দাঁড়িয়ে পড়ছে শিশুটিও। মা পেছনে ফিরে তাকাতেই দুজনেই বেশ চঞ্চল হয়ে ফের পিছু নিচ্ছে মায়ের। তারা দৃষ্টিসীমায় ক্ষীণ হয়ে এলে মাথার ওপর উড়তে থাকা সি-গালটি ফিরে এলো আবার। এবার একা নয়, সঙ্গী নিয়ে। উড়ে উড়ে নেমে পড়ল পথের ওপাশে। গাঢ় হলুদ ঈষৎ বাঁকানো ঠোঁট দিয়ে ওরা খুঁটে খুঁটে তুলে নিচ্ছিল শিশুটির ফেলে দেওয়া দানাগুলো। হয়তো আশপাশেই কোথাও বসে ছিল ওরা। দূর থেকে খেয়াল করছিল শিশুটিকে। অথবা শিশুটির অপেক্ষায়েই ছিল হয়তো। ওরা জানত, এই পথে শিশুটি ওদের জন্য ছিটিয়ে যাবে আহার। পাখিরা কি ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? পায় হয়তো। বলেও। কিন্তু মানুষ কি ওদের ভাষা বোঝে? আবার এমনও হতে পারে, ভাষার দুর্বোধ্যতায় ওরা কাউকে কিছু বোঝাতে পারবে না জেনেই প্রকৃতি সব জানিয়ে দেয় ওদের। তা না হলে ঝড়-বাদলের আভাস ওরা ঠিকঠাক পায় কী করে? রহস্য ভালোবাসে প্রকৃতি!
দুটো টেবিলের ব্যবধানে বসে থাকা ছেলেটির বাহুর আস্তিনে উষ্ণতা খুঁজছে মেয়েটি। পাখির মতো চুমু খাচ্ছে ঠোঁটে। মিউনিসিপ্যালের হলদে আলোয় মেয়েটির পোশাকের লাল গোলাপ রং হয়েছে কালচে। ছেলেটির পীতাভ। গ্লাসের পানীয়ও হয়েছে আরো গাঢ় স্বর্ণাভ। মেয়েটির নীল চোখ দুটো ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সিগারেটের শেষ ধোঁয়াটা বুকে টেনে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই চোখ দুটো খুঁজতে লাগল দ্বিতীয় যুগলটিকে। দেখা মিলল ওদের। আবর্জনার দ্বিতীয় পাত্রটি পেরিয়ে তৃতীয়টির সন্ধানে হাঁটছে ওরা।