বর্তমান সাক্ষাৎকারটি ‘কনভারসেশনস উইদ পিকাসো’ বইয়ের একটি অংশ, যেখানে বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসো এবং হাঙ্গেরীয় আলোকচিত্রী ও ভাস্কর মি. ব্রাসাইয়ের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। অসামান্য কিছু কথাবার্তা যা পিকাসোর নিজস্ব শিল্পজগৎ ও পাশাপাশি মিস্টার ব্রাসাইয়ের শিল্পতৃষ্ণার মেলবন্ধন ঘটায়।
বুধবার, ২০ অক্টোবর ১৯৪৩
ব্রাসাই: আমি এসে দেখলাম পিকাসোর টেবিলটি যা গতকালও ছিল ধুলায় ঢাকা, আজ তা পুরোপুরি পরিষ্কার। ক্যাটালগ, বিজ্ঞাপনের বই, আর চিঠিগুলো ধুলো ঝেড়ে যত্নসহকারে সুন্দরভাবে স্তূপ করে সাজানো হয়েছে। আমার বিস্মিত ভাব দেখে পিকাসো বেশ আনন্দ পেল।
পিকাসো: সারারাত আমার টর্চলাইটটা খুঁজেছি। মানুষ যখন আমার জিনিসপত্রের ওপর হাত দেয়, এটা আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না। আমি সবকিছুই একেবারেই গুছিয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম, আর তখনই এই পুরো বইয়ের স্তূপটাতেও হাত দিয়েছিলাম। হতে পারে এই সবকিছুর মধ্যেই আমার টর্চলাইটটাও হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এর ভেতরেই আমি সবকিছু পরিষ্কার করে গুছিয়ে ফেলেছিলাম।
lটর্চলাইটটার কী হলো?
llআমি পেয়েছি। সেটা ওপরে, আমার বাথরুমে ছিল।
শহরে পিকাসোর কিছু কাজ থাকাতে সে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই একজন মহিলা আসে হাতে সুতো দিয়ে বাঁধা একটি প্যাকেট নিয়ে। সে সরাসরি পিকাসোর সঙ্গে দেখা করার জন্য সারাটা সকাল অপেক্ষা করতেও রাজি। দুই ঘণ্টা পর পিকাসো এলে, সে প্যাকেটটি খুলে একটি ছোট ছবি বের করে। সে বলে, “মঁসিয়ে পিকাসো” অনুগ্রহ করে আপনি আমাকে আপনার পুরোনো একটি ছবি উপহার দেবার সুযোগ দিন।”
পিকাসো ছবিটির দিকে তাকায়। সে একটু বিস্মিত হয়। কারণ ছবিটি অনেক দিন আগের। অতীতের স্মৃতির মুখোমুখি হয়ে তার মুখে এক মিশ্র অনুভূতি জাগে। –একটু মৃদু হাসি, অবাক হওয়া, আর নস্টালজিক হয়ে পড়া।
মহিলাটি বলে, সে অনেক যত্ন করে সংরক্ষণ করেছে ছবিটি। আর এটি শুধু ছবি নয়, একটি সম্পদ, এক মূল্যবান স্মৃতি। কিন্তু এক শ্রদ্ধা ও আবেগ থেকে সে এটিকে ফিরিয়ে দিতে চায়।
মহিলাটি শান্তভাবে বলে, বহু বছর আগে সে এটি সংগ্রহ করেছিল। তখন সে জানত না, ছবিটির মূল্য কতখানি। তবে ছবিটিতে এক অদ্ভুত আকর্ষণ সে আবিষ্কার করেছিল।
হ্যাঁ, এটি সত্যিই পিকাসোর আঁকা ছবি! আমি এই ছবিটি এঁকেছিলাম ১৯২২ সালের গ্রীষ্মে ইয়েরেসে থাকার সময়ে।
পিকাসো হাল্কা হেসে ওঠে বলে, ‘আমার পুরোনো কাজগুলো! আমি নিজেই অনেক সময় চিনতে পারি না, যেন অন্য কেউ এঁকেছিল।’
lপিকাসো নামটি বেছে নেবার কারণ?
ll বার্সেলোনায় আমার বন্ধুরা আমাকে এই নামেই ডাকত (পিকাসো)। ‘রুইজ’-এর চেয়ে এটা ছিল বেশি অদ্ভুত, বেশি অনুরণনময়। সম্ভবত এই কারণেই আমি নামটি গ্রহণ করেছিলাম। জানেন, নামটার কোন বিষয়টা আমাকে আকর্ষণ করেছিল! আসলে সেটা ছিল দুটো ‘এস’। তাছাড়া বর্ণমালার ‘এস’ বর্ণটি খুবই লাবণ্যময়। দুটো ‘এস’ বর্ণের ব্যবহার স্পেনে সাধারণত ব্যবহৃত হয় না।
lকয়েক বছর আগে আমি লেস আইজিস ভ্যালিতে গুহার শিল্পকর্ম দেখতে গিয়েছিলাম। একটি বিষয় আমাকে বিস্মিত করেছিল যে প্রতিটি প্রজন্মই তাদের আগে যারা ছিল তাদের সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও একইভাবে গুহাটি গঠন করেছিল, হাজার বছরের ব্যবধানে। আপনি রান্নাঘরটিকে সবসময় একই জায়গায় খুঁজে পাবেন।
llমানুষ পরিবর্তন হয় না। সে তার অভ্যাসগুলো স্বাভাবিকভাবেই ধরে রাখে। সেইসব মানুষ একই জায়গায় তাদের রান্নাঘর খুঁজে পেয়েছিল। একটি শহর গড়তে মানুষ একই আকার বেছে নেয়। শহরের নিচে অন্য শহর, গির্জার নিচে অন্য গির্জা, ঘরের নিচে অন্য ঘর আপনি সবসময় খুঁজে পাবেন। জাতি আর ধর্মগুলো পরিবর্তিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাজার, বাসস্থানের জায়গা, তীর্থযাত্রীর পথ, উপসনাস্থানের স্থান, একই রয়ে গেছে। ভেনাস বদলে গেছে ভার্জিনে, কিন্তু একই জীবন চলমান আছে।
lখননকাজের সময় আমার সবসময় মনে হয় ওরা কোনো ছাঁচ ভেঙে ভাস্কর্য বের করছে। পম্পেইতে ভিসুভিয়াসই যেন সেই ঢালাইয়ের কাজ করেছিল। বাড়ি– মানুষ– পশু সবকিছুই আটকা পড়েছিল সেই ফুটন্ত লাভাতে। মৃত্যুর ঠিক সেই মুহূর্তে ধরা পড়া ওইসব কুঁকড়ে যাওয়া দেহগুলোর মধ্যে স্পর্শকাতর অনেক কিছু ছিল। সেসব আমি পম্পেই আর নেপলসের কাচের ঘরে দেখেছি।
llদালি এই ধরনের ভয়ংকর ঢালাইয়ের ধারণা নিয়ে সত্যিই মুগ্ধ ছিল– একটি বিপর্যয়ের মুহূর্তের ভেতর দিয়ে সকল জীবনের সমাপ্তি। সে আমাকে অপেরা স্কোয়ারের একটি ঢালাই নিয়ে বলেছিল– অপেরা ভবন, ক্যাফে দে লা পে, অভিজাত মহিলারা, গাড়ি, পথচারী, পুলিশ, সংবাদপত্রের ছোট দোকান, ফুল বিক্রি করা মেয়েরা, রাস্তার বাতি, ঘড়ি– যা তখনও সময় দেখাচ্ছে। কল্পনা করো, প্লাস্টার বা ব্রোঞ্জে, জীবন্ত আকারে। কী ভয়াবহ স্বপ্ন! যদি আমি তা করতে পারতাম! আমি সাঁ-জামাঁ– দে– প্রে বেছে নিতাম– ক্যাফে দ্যা ফ্লোর, ব্রাসেরি লিপ, দ্যা-দ্যু-মাগো, জ্যাঁ-পল-সার্ত্র, ওয়েটার জঁ ও পাস্কাল, মঁসিয়ে বুবাল, বিড়ালটি, আর সেই স্বর্ণকেশী ক্যাশিয়ার। কী অসাধারণ, ভয়ংকর এক ঢালাই হতো তা!
lআমি জানতাম তুমি কঙ্কাল পছন্দ করো! আমি এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেছি, এগুলি খুলে আবার জোড়া লাগিয়ে মজা পেয়েছি। সৃষ্টির প্রতিভা বোঝার জন্য কঙ্কালকে আবার গঠন করার চেয়ে ভালো উপায় আর নেই।
llআমার হাড়ের প্রতি এক ধরনের গভীর আকর্ষণ আছে। বোয়াজগেলুপে আমার আরও অনেক কিছু আছে– পাখির কঙ্কাল, কুকুর আর ভেড়ার মাথা। এমনকি একটা গন্ডারের খুলিও আছে। খেয়াল করেছ, হাড়গুলো সবসময়ই যেন গড়া, খোদাই করা নয়– দেখলে মনে হয় যেন কোনো ছাঁচ থেকে তৈরি, যেন প্রথমে মাটিতে গড়া হয়েছিল। তুমি যে কোনো হাড় দেখো না কেন, তাতে সবসময় আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়, কখনও বিশাল, আবার কখনও ক্ষুদ্র। যেমন বাদুড়ের অস্থি তো খুব ছোট লিলিপুটের মতো। আর খেয়াল করেছ মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলো কত নিপুণভাবে বসানো!
lকশেরুকা সত্যিই এক অসাধারণ আবিষ্কার! প্রকৃতি কি অসাধারণ শিল্পকৌশলে সবকিছু সাজিয়েছে! আর এই আর্শ্চযের বিষয়টি একজন কবি প্রথমে দেখিয়েছিলেন।
llকে সেই কবি?
lগ্যোটে। তিনিই প্রথম কবরস্থানে একটি ভেড়ার খুলি আর কশেরুকা খুঁজে পেয়ে বর্ণনা করেছিলেন।
এই উত্তরটি পিকাসোকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। হাড় ও কঙ্কাল নিয়ে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করতে থাকি।
পিকাসো তাঁর প্রদর্শনী কেসটি আমাকে দেখাতে চান। এটি একটি বড় ধাতু ও কাচের আলমারি, তালাবদ্ধ। এর জন্য রয়েছে বিশাল চাবির গোছা। ভেতরে পঞ্চাশটি ছোট মূর্তি স্তূপ করে রাখা, খোদাই করা কাঠ, খোদাই করা পাথর, আরও অদ্ভুত সব বিরল বস্তু, বিকৃত ও পাকানো পানীয়ের গ্লাসের জটলা। অগ্ন্যুৎপাতের ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া পৃথিবীর তাপে গলে যাওয়া গ্লাসগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর!
আরও আছে ভেনাসের একটি ছাঁচ। পিকাসো এই নারীটিকে, প্রাচীন উর্বরতার দেবী হিসেবে খুব ভালোবাসেন। রয়েছে বাদুড়ের সাদা কঙ্কাল, কালো পটভূমিতে যেন ক্রুশবিদ্ধ।
llআমি বাদুড় খুব ভালোবাসি। মহিলারা ওদের ভয় পায়, ভাবে চুলে জড়িয়ে যাবে! কিন্তু বাদুড়ই সবচেয়ে সুন্দর আর সূক্ষ্ম প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। তাদের উজ্জ্বল ছোট ছোট চোখ দেখেছ, বুদ্ধিমত্তায় ঝলমল করে! আর তাদের চামড়া– মখমলের মতো নরম? আর দেখো, এই সূক্ষ্ম ছোট ছোট হাড়গুলো!