ও রণতরী
রেজাউদ্দিন স্টালিন
ও রণতরী প্রশান্ত সাগরের স্রোত থেকে উঠছে রক্তের মর্মরধ্বনি
তলিয়ে যাচ্ছে তাওরাতের সাবধান সূচক
তোমার জ্ঞাতি জাতিসংঘের মোকাবিলার কৌশল ভষ্ম হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বেথেলহেমে
ভিজে লেপ্টে গেছে বাইবেলের ক্রুশকাতর মুখ
শত শত বিস্ফোরণের বাচ্চা
তোমার গর্ভে
তোমার নীড়ে পরমাণু ডিমে তা দিতে দিতে তুমি কোন বন্দরে যাবে
লোবাননের যে এতিম কিশোর
অর্গানে সুর তোলে বেদনার
ফিলিস্তিনের যে ক্ষুধার্ত কিশোরী পরিণত হবার অপেক্ষায় তাঁবুতে অপেক্ষা করে বছরের পর বছর
গাজায় যে মা তার নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের ছবি ইতিহাসের পৃষ্ঠা ভাবে
বৈরুতে বিরতিহীন নিলামে উঠছে যে নিষ্পাপ বৃক্ষরা
তারা তোমার প্রসব বেদনা শুনে
ত্রিশঙ্কু ঝুলে আছে শূন্যে
জেরুজালেমে সবায় অপেক্ষা করছে দেবদূতদের
তুমি কারো অঙ্গুলি হেলনে জন্ম দিও না ভস্মাধার
এখন মাতমের মৌসুম নয়
গলগাথায় ক্রুশে ঝুলছে লক্ষ লক্ষ যিশু
সুসজ্জিত রণতরী দুর্গতিনাশিনী দুর্গা হও
অহমক্লিষ্ট আমেরিকা তোমার গর্ভে ঢুকিয়ে দিয়েছে বহ্নুৎসব
তুমি সাগরের বুকে উধাও হও
বারমুড়া ট্রাঙ্গলের গল্প হও
শোনো মাছমেয়েদের গান
কোনো প্রণালী তোমার লক্ষ্য না হোক
বনি ইসরাইল হারিয়ে ফেলেছে
দশ প্রত্যাদেশ
তোমার পিঠে শয়তানের
দগদগে চাবুক
এগিয়ে আসছে জলযুদ্ধ
এগিয়ে আসছে বার্নাম বন
ম্যাকবেথ কিছুই জানে না
তুমি রামেসিসের মতো পিছু নিও না
নীলহরমুজ নিষিদ্ধ
পৃথিবীর অর্ধেক লোক ক্ষুধার
জ্বালায় চুল্লিতে বসিয়েছে কান্না
সব ক্যাথিড্রাল গীর্জা মন্দির
উপাসনালয়ের কাচ ভেঙে পড়ছে
ও রণতরী
তোমার গর্ভের ভাবীভাষকেরা
অগ্রাহ্য করুক আনবিক গর্ভপাত
আর হয়ে উঠুক ক্ষুব্ধ সময়ের ইউলিসিস
ঘোড়াউত্রার পূর্ণিমায়
নূর কামরুন নাহার
একদিন ঘোড়াউত্রার গায়ে
ডুবে গিয়েছিলো পূর্ণিমার চাঁদ
তৃষ্ণার্ত চাঁদ ডুবে ডুবে আকন্ঠ পান করে
নদী থেকে আকাশ, আকাশ থেকে নদী
পান করে জোৎস্না , অন্ধকার, চরাচর
জোৎস্না লুটে নেয় দীর্ঘশ্বাস, লুকানো শাপ
অন্ধপাপ, জন্মঋণ, মৃতপ্রেম, নষ্টতাপ
নদীতে চাঁদ ডুবে থাকে ঘোর মাতাল
রুপালি রুপের নেশায় কাঁপে নদী উত্তাল।
মগ্ন চাঁদ জেগে থাকে নদীর বুকের ভেতর
বাতাসে কাঁপন ওঠে জোয়ারের ডাকে
গোল চাঁদ ভেঙে ভেঙে ঢেউয়ে ঢেউয়ে
একাকার হয় জলের কাচে, উদ্দাম নাচে
দেহের খোল থেকে বেরিয়ে আসে
পূর্ণিমার জোৎস্নার মতো জীবন্ত আত্মা।
সেই পূর্ণিমার রাতে টুকরো টুকরো আমি
আমার বিদীর্ণ হৃদয় ফেলে আসি
ঘোড়াউত্রার গহীন কালো জলে।
আন্তর্জাতিক ভিলেজ পলিটিক্স
হাসনাইন হীরা
উড়ছে ঘুড়ি, শান্ত জানালা থেকে সরে যাচ্ছে ঘর,
ধার্মিক বাতাসের খবর—কাঁপাচ্ছে বাড়ি, তিনতলা শহর।
কে যে কার স্তনাকার উচ্চতর আত্মস্বর চিবায়!
কে যে কার পান করে বারোমাসি হৃদয়…
কেউ বলছে শাপলাচত্বর, কেউ বলছে শাহবাগ
কেউ বলছে কাগজের বাঘ এসে উজার করেছে বন…
আহা! মানুষের মন কত যে সুধামন্দায় ভোগে!
ঘাড়ে বসে শ্বাস নেয় আত্মঘাতী চিবুকের তাস,
ধূলো হয়ে উড়ে ওঠে পিপাসিত মাটির আকাশ।
দাঁড়িয়ে আছি তাই পৃথিবীর আশেপাশে—
ফাঁকা কোনো জায়গায়; উড়াচ্ছি ঘুড়ি
জমে উঠছে হাওয়া। আবহাওয়া অফিস বলছে—
মেঘপাতার আত্মশূন্য ক্যালেন্ডারটা এবার
কখন যে একরোখা চোখ তুলে তাকায়! বলা যাচ্ছে না।
কেন জন্মেছি
মিঠুন দত্ত
স-মিলে পড়ে থাকা গাছের ডোম
আমার চেয়ে বহুত ভালো;
পর কে সাজাতে করাতের ধারালো দাঁতে
শরীর পেতে দেয়।
আমার চেয়ে ভালো ওই রাতচরা পাখিরাও,
প্রতি প্রহরেও কিচিরমিচির কলরবে
মনে করে ঐক্যের গান গায়।
আমার চেয়ে সাহসী ওই মশাটাও,
মৃত্যুর বুকে বসে গড়ে তুলে বাঁচার মনোবল।
জলে ভিজে না কচুপাতা
অথচ আমি ভিজে যাই।
নদীর বুকে এত জল তারপরও খুঁজে সমুদ্রঅতল
অথচ কীভাবে মানি বলো আমার চোখ টলমল!
আমার চেয়ে ভালো ওই কুকুরটাও,
নিজ খড়ঘরেরও টান বুঝে!
আমার চেয়ে ভালো পেত্নীগুলোও,
পতিত বাড়ির মায়ায় ডুকরে ডুকরে কাঁদে!
আমি মানুষ কোথায়,
কোথায় শ্রেষ্ঠত্বের সিগনেচারসহ স্মারকলিপি?
আমার দেহের পোস্টমর্টেম চাই―
কেন জন্মেছি বৃথাই,
কেন এই খাম হারা চিঠি?