সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কারুবাসনা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে

১৯৩৩ সালের আগস্ট মাসের দুটি খাতায় কারুবাসনা উপন্যাসটি রচনা করেন জীবনানন্দ দাশ [১৮৯৯-১৯৫৪]। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে চিহ্নিত জীবনানন্দের জীবদ্দশায় তাঁর রচিত কোনো উপন্যাসই আলোর মুখ দেখেনি। কারুবাসনাও তাই। এতে প্রধান চরিত্র উত্তমপুরুষে কথা বলেছে। জীবনানন্দ নিজেই এ রচনা ‘নভেল’ বলে চিহ্নিত করে না গেলে মনে হতে পারত যে তিনি সব আড়াল ভেঙেই নিজের জীবনের কোনো এক সময়ের ডায়েরি রেখে গেছেন। ‘কারুবাসনা’ জীবনানন্দের আত্মজীবনীর অংশ কিনা–এ ধাঁধার মীমাংসা না হলেও কারুবাসনা জীবনানন্দকে চিনে নেওয়ার সোপান হিসেবে নিঃসন্দেহে ধরে নেওয়া যায়। প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের তিনটি উপন্যাস গ্রন্থ থেকে ‘কারুবাসনা’র সূচনাংশ পত্রস্থ হলো :

আষাঢ় শেষ হয়ে গেছে, শ্রাবণ চলছিল। এই বর্ষায় বইয়ের বড্ড ক্ষতি হয়। কয়েক দিন আগে স্টেশনের বইগুলো দেখেছিলাম–স্টলের সমস্ত বইগুলোই প্রায় পুরোনো, ছেঁড়াখোঁড়া মালিকের সঙ্গবিহীন গ্রন্থিহীন জীবনের জর্জরতার অপরাধ এদের চোখেমুখে। নতুন বইও কয়েকখানা আছে। গত বছর কলকাতায় যখন পঁচিশ টাকা ট্যুইশান করি, ট্রাম-সিনেমা ও চায়ের পথ এড়িয়ে, খুব একটা শাদাসিধে মেসের জীবস্মৃত অবস্থার ভিতরে থেকে কয়েকখানা বই কিনতে পেরেছিলাম: ইংরেজি কবিতার বই দুটো, একখানা আমেরিকান উপন্যাস গত শতাব্দীর, একখানা নভেল এবং আরো দু-তিনখানা বই। ক্যাটেলগ দেখে কিনিনি; কারো পরামর্শ নিয়েও নয়; ইংরেজি পত্রিকাগুলোর সমালোচনা ও খবরাখবর আমি অনেক দিন ধরে দেখিনি; বই ক-খানা কিনেছিলাম নিজের মনের কর্তৃত্বে আমি। টিনের সুটকেসে করে বইগুলো দেশে নিয়ে এলাম; খড়ের ঘরের জানলার কাছে বসে পড়লাম; বাইরে বিকেলের আলোয় সন্ধ্যার অন্ধকারে কখনো শরৎ কখনো হেমন্তকে দেখেছি; শালিখ ঘাসে-ঘাসে পোকা খুঁটে খেয়েছে, ফড়িং উড়েছে, পাতা খসেছে, দাঁড়কাকের দল গভীর কীর্তির অব্যর্থতায় ঘরের দিকে উড়ে গেছে তাদের, সন্ধ্যামণির পাপড়ির মতো লাল মেঘে আকাশ গেছে ছেয়ে।
আমাদের ঘরে উইয়ের অত্যাচার বড় বেশি; মেঝেটা মাটির–বড্ড স্যাঁতসেঁতে; বর্ষাকালে উইয়ের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য নানা রকম চেষ্টা চলে বটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নির্জীব নয়–খুব সতেজ ও পরিহাসপ্রিয়। মিশরে যিনি একদিন পঙ্গপাল ছেড়ে দিয়ে মজা দেখেছিলেন, আমাদের কুঁড়েঘরে তিনি উই ছড়িয়ে দিয়ে তামাশা দেখেন। নানা রকম কষ্টার্জিত বইয়ের, প্রিয় জিনিশের, ছিবড়ে কুড়িয়ে-কুড়িয়ে, তারপর আগুন জ্বালি ও চিন্তা করি; তার গভীর শক্তিকে নমস্কার জানাই।
দু-তিনদিন আগে শেল্ফের বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখেছি একবার। আজ আরেকবার দেখা যাক, কিন্তু যাই-যাই করে আর যাওয়া হয় না; জানলার ভিতর দিয়ে বর্ষার দিকে তাকিয়ে মন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। দুপুরবেলা দেখলাম বইয়ের তাক ঠিকই আছে, উইয়ে ধরেনি, নতুন বইয়ের লাল-নীল মলাটগুলো কেমন। ছাতকুড়োয় শাদা-শাদা হয়ে গেছে।
কল্যাণীকে বললাম– ‘আমি চলে গেলে এই বইগুলো মাঝে মাঝে দেখো।’
কল্যাণী সেলাই করছিল; কোনো জবাব দিল না। বইগুলো মুছতে মুছতে ‘মাঝে মাঝে রোদে দিও এগুলো।’
কল্যাণী কোনো কথা বললে না।
সে আমার উপর বিরক্ত; দেশে এসে বলেছিলাম ছ-সাত দিন থাকব; থাকতে-থাকতে তিন মাস হয়ে গেল। প্রায় এক মাস থেকে বলছি, চাকরির চেষ্টায় কলকাতায় আজকালই যাব। কিন্তু আজও গড়িমসি করে দেশের বাড়িতেই কাটাচ্ছি।
এত অপরাধ ও বেদনার জন্য তার জীবন প্রস্তুত ছিল না।
সে একটা অস্টিন মোটরকার চায় না বটে, সুসজ্জিত বাংলোও চায় না, আমাকে যখন বিয়ে করেছিল, তিন বছর আগে, মানুষের জীবনের নিদারুণ পরিমাপের টের যখন সে পায়নি, তখন কী চাইত জানি না, কিন্তু আজ একজন সামান্য ইস্কুলমাস্টারের গৃহস্থালির ব্যবস্থাও নিজের হাতে যদি সে পায়, জীবনকে ধন্য মনে করে। কিন্তু এমনই ব্যবস্থা, একটা ইস্কুলমাস্টারিও জোটে না। ‘আচ্ছা, আমি যদি
ট্রাম কন্ডাকটার হই? কী বলো কল্যাণী?’
‘টি-সি হবার জন্যই এম-এ পাশ করেছিলে?’
‘কিন্তু সেও তো কাজ–মাসে-মাসে ২৫, ২০ কি দেবে না?’
‘বেশ তো, তা হলে তাই করো গিয়ে।’
‘এবার কলকাতায় গিয়ে যা হয় একটা কিছু করবই।’
কল্যাণী চুপ করে রইল।
‘কী করব জানো?’
কোনো সাড়া নেই।
হেমন্তের বিকেলের নিস্তব্ধ ম্লানতার ভিতর একটা রুগ্ন হাঁসের মতো শুকনো পাতার ওড়াউড়ির মধ্যে হংসগামিনী গতিতে একা-একা অন্ধকারের ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে। গলা খাঁকরে–‘কী করব, জানো কল্যাণী?’
কল্যাণী আঁতকে উঠে–‘বাপরে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এ-রকম বেটপকা চেঁচিয়ে ওঠো কেন?’
‘না, চেঁচাইনি তো’–
‘না, না, এ-রকম আচমকা ভয় পাইয়ে দিও না, ইস্, কী রকম ধড়ফড় করছে এখনো? কী হল?’
‘কিচ্ছু না, বাপরে, কী রকম চমকে গিয়েছিলাম।’
‘নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে?’

কল্যাণী–‘কথা বোলো না, আমাকে একটু চুপ থাকতে দাও; কথা বলতে গেলে হার্টে কষ্ট হয়।’
‘বুকে হাত বুলিয়ে দেব?’
‘থাক্।’
‘কাছে আসি?’
‘না।’
‘কেন?’
‘আমাকে একটু চুপ করে থাকতে দাও।’
পাখা নিয়ে এগিয়ে গেলাম–বাতাস দিতেই কল্যাণী–‘পাখা রেখে দাও, ঠাণ্ডা লাগে।’
রেখে দিলাম।
‘গরম দুধ খাবে?’
‘না, দরকার নেই।’
বালিশে খানিকক্ষণ মাথা গুঁজে পড়ে থাকে কল্যাণী–‘বাঃ, তুমি আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছো যে?’
‘দেখছিলাম।’
‘না, মরতে এখনো দেরি আছে ঢের।’
‘মরার কথা নয়।’
‘হ্যাঁ, যা বলছিলে, আমাকে একটু গরম দুধ এনে দাও তো।’
‘আচ্ছা দিচ্ছি।’
‘কিন্তু এখন দুপুরবেলা সব্বায়ের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে; কোত্থেকে এনে দেবে?’
‘কেন খুকির দুধই তো আছে।’
‘তা হলে খুকি কী খাবে?’
মাথা হেঁট করে একটু ভেবে, ‘বেশ, পিসিমার দুধের থেকে এনে দেব তাহলে।’
‘কী করে আনবে?’
চুপ করে ছিলাম।
‘পিসিমার কাছে গিয়ে চাইবে?’
ঈষৎ হাসতে চেষ্টা করে ‘হ্যাঁ, দরকার হয়েছে, চেয়ে আনব।’
‘কেন, আমি কি ভিখিরির মেয়ে যে পরের কাছ থেকে দুধ ভিখ করে ছাড়া খেতে পারব না?’
একটু চুপ করে থেকে বললাম, ‘এক গ্লাশ দুধ, তা পিসিমা খুশি হয়েই দেবেন।’ কল্যাণী একটা নিশ্বাস ফেলে, ‘যাক্ যা কাজ করছিলে তাই করো গিয়ে, দুধ আমার লাগবে না।’
বই মুছতে লাগলাম।
কল্যাণী উঠে বসে, সূচ-সুতো হাতে নিয়ে–‘তোমাকে বিশ্বাস নেই।’
‘কেন?’
‘আধঘণ্টা পরে হয়তো পিসিমার কাছ থেকে দুধ চেয়ে এনে বলবে, বিনয় ভট্টাচার্যের চায়ের দোকান থেকে নিয়ে এলাম।’
একটু থামে, ‘না তা আর বলব না।’
‘বিনয় ভট্টাচার্যের চায়ের দোকানে খুব ভালো দুধ পাওয়া যায়?’
মাথা নেড়ে, ‘তা পাওয়া যায়।’
‘কত করে নেয় এক গ্লাশ?’
‘দু আনা।’
‘ওঃ, দু আনা বুঝি?’
দুজনেই অনেকক্ষণ চুপচাপ; কল্যাণী সেলাই করছিল, আমি বই ঝাড়ছিলাম, মুছছিলাম, পাতা উল্টাচ্ছিলাম–কিন্তু দু আনা পয়সার সম্বল আজ আমার কাছে নেই। এবং আমার বয়স চৌত্রিশ, বারো বছর আগে এম-এ পাশ করেছিলাম বটে, বিয়ের আগে দু-তিনটে কলেজে অস্থায়ী কাজ করেছি–আরো অনেক কাজ করেছি; কিন্তু সংসার ও সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষদের জীবনের পদ্ধতির সঙ্গে কোথাও না কোথাও সম্পূর্ণ [ভিন্নতা] ও জটিলতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি আমি। কাজেই এম-এ ডিগ্রি ও স্ত্রী সন্তান সত্ত্বেও এই চৌত্রিশ বছর বয়সে আজও আমি সংসারী হয়ে উঠতে পারলাম না, আক্ষেপের কথা হয়তো। কিংবা আক্ষেপের কথাই-বা কেন আর? জীবন তো শুধু স্ত্রী-সন্তান নিয়েই নয়।
বিকেলের ধূসরতার ভিতর যখন সবুজ ঘাসের মাঠের পথে হাঁটতে থাকি, কিংবা হেমন্তের সন্ধ্যায় চড়ুই শালিখ যখন উড়ে চলে গেছে, দিকে-দিকে কুয়াশা জমে ওঠে, লক্ষ্মীপুজোর ধূপের ভিতরেও যখন গন্ধ, কিংবা আরো গভীর রাতে অশ্বত্থের ডালপালা যখন জ্যোৎস্নার বাতাসে ঝিরঝির করে, কত বিহঙ্গম-বিহঙ্গমার নীড় বুকে নিয়ে বিরাট বটগাছ দাঁড়িয়ে থাকে, বটের নিচে উপকথার পথিক গিয়ে দাঁড়ায়–এক মুহূর্তের ভিতরেই সমস্ত অতীত ও ভবিষ্যতের প্রেম, স্বপ্ন ও সফলতার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক খুঁজে পাই আমি, এই সৃষ্টির রহস্যের ভিতর নিজের রহস্যময় হৃদয়ের সঙ্গে আলো-অন্ধকারের পথে অবিরাম চলতে ইচ্ছা করে।
সংসারের সঙ্গে সম্পর্কহীন–জীবনের এই আর-এক রূপ। এই রূপের পথে চলতে-চলতে কিশোর বেলার নষ্ট প্রেমের বেদনা ও লাঞ্ছনা ভুলতে চেয়েছিলাম, আজকের সংসারের ক্ষয় ও ক্ষতি নিয়ে আক্ষেপ করব?
অবিশ্যি বাবার কাছে চাইলে দু আনা পয়সা পাওয়া যায়। দু আনা চাইলে তিনি হয়তো চার আনাও দিয়ে দেবেন। আমি মুখ ফুটে বড় একটা চাই না কি-না। সেই জন্য, চাইলেই, তিনি যতদূর সম্ভব দিয়ে দেন। অবিলম্বে অকাতরে আমার কলকাতার খাওয়ার খরচও তিনিই জোগাড় করে দেবেন; তারপর দাদাকে বেরিলিতে লিখে দেবেন আমার কলকাতার মেসের খরচটা কিছু দিন চালাতে–যে পর্যন্ত না আমি ট্যুইশান পাই।
আমি ট্যুইশান পাই বা না পাই, আমি কলকাতায় এলেই দাদা একটা মাস মেসের খরচ দেন; তারপর বন্ধ করে দেন–শত অনুনয়-অনুরোধ করলেও কিছুই গ্রাহ্য করেন না, আমার টিকিটের পয়সা খরচ হয় শুধু; কাজেই অনুরোধ করে চিঠি লিখতে যাই না, এক মাসের টাকা দিয়ে তিন মাস চালাতে চেষ্টা করি–দেশের বাড়িতে খরচ যেন তিনি বন্ধ না করেন, ভবিতব্যের কাছে এই প্রার্থনা করি।
বাবা যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন বন্ধ করবেন না, কিন্তু বাবা চলে গেলে পর? জীবন যদি তখনো আমার এই পথে চলে? কিন্তু কেনই-বা চলবে? ভবিষ্যতের জন্য আশা করা যাক। না হয়, চরকায় সুতো কেটে কাপড়ের ব্যবস্থা করব, যেটুকু জমি আছে তাতে লাউ-কুমড়ো-বেগুন-মরিচের গাছ লাগিয়ে দেব; আর চাল? ভাবছিলাম।
কল্যাণী–‘খুব বেশি নেয় তো তা হলে?’
‘কে বেশি নেয়, কল্যাণী?’
‘এক গ্লাশ দুধ দু আনা নেয় বললে–’
‘হ্যাঁ।’
‘বেশ টাটকা দুধ নিশ্চয়ই?’
‘হ্যাঁ, খুব।’
‘তুমি খেয়ে দেখেছ?’
‘না খাইনি।’
‘বিনয় ভাজের দোকানে শিগগির যাওনি বুঝি?’
‘না।’
‘এক কাপ চা খেতেও যাওনি?’
‘না, শিগগির গিয়েছি মনে পড়ে না।’
‘সত্যি যাওনি? বাপরে, এত তো চায়ের ভক্ত ছিলে। কি, বাড়িতে তো চা পাও না, আমি তো ভাবতাম বিনয় ভাজের দোকান থেকে চা খেয়ে আস তুমি।’
‘না, মাঝে-মাঝে একটা চুরুট কিনতে যাই।’
‘চুরুট?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর-কিছু না?’
মাথা নাড়লাম ‘না।’
‘চুরুট তো তোমাকে খেতে দেখি না আমি।’
‘মাসের মধ্যে দু-একটা খাই।’
‘তাই-বা কখন খাও?’
‘খাই রাস্তায়–সন্ধ্যার সময়।’
‘বেশ লাগে?’
‘মন্দ কী।’
‘কিন্তু দুধ খেও।’
‘কে? আমি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন বলো তো?’
কল্যাণী কোনো জবাব দিল না।
একটু চুপ করে বললে, ‘আধ গ্লাশ দুধ চার পয়সায় দেবে?’
‘তা দিতে পারে, দর কষাকষি করতে হবে।’ আরো খানিকক্ষণ ভেবে কল্যাণী, ‘তা হলে নিয়ে এসো তো।’ অত্যন্ত জড়োসড়োভাবে, যথেষ্ট সময় খরচ করে, আঁচলের গাঁটের থেকে একটা এক আনি বের করলে, দেখলাম, খানিকটা তেলা–
আরো কিছু খুচরো পয়সা বেচারির গাঁটে ছিল, কিন্তু এক আনিটা বদল করবার ভরসা পেলাম না। না হয় চার পয়সার বাকি দুধ বিনয়ের কাছ থেকে আনা যাবে।
তাই আনলাম।
কিন্তু দুধ নিয়ে হাজির হয়ে দেখি, আর-এক সমস্যা; সে কিছুতেই খাবে না,
খেতে হবে আমাকে।
বললে, ‘তুমি কী বেকুব। তোমাকে দুধ খাবার জন্য চারটে পয়সা দিলাম আমি, হাত-পা রোগা বকের মতো হয়ে যাচ্ছে, কোথায় দোকানে বসে খেয়ে আসবে,
না, সেই দুধ তুমি এতটা পথ বয়ে আনলে আমার জন্য।’
বিক্ষুব্ধ ঝাঁঝে আমার দিকে আপাদমস্তক তাকাতে লাগল সে।
‘কই, তুমি তো একবারও বলোনি কল্যাণী?’
‘কী বলিনি।’
‘যখন পয়সা দিলে, বলোনি তো যে–’
কিন্তু খোঁচা দিয়ে ভুল দেখিয়ে এই নারীটিকে পরাস্ত করে কী লাভ?
বাদলের দুপুরে এক-একটা নিরাশ্রয় দাঁড়কাক আমাদের উঠোনের পেয়ারার ডালে বসে ভিজতে থাকে, তাকে দান করতে হয়, কেউ কোনোদিন তার কাছ থেকে
গ্রহণ করবার কথা ভাবতে পারে কি?
‘আমি এক কাপ চা খেয়ে এসেছি; আর একটা চুরুট।’
‘কে? তুমি? দুধ খেলে না কেন? দুধের জন্যই তো পয়সা দেওয়া। তোমার শরীরের দিকে তাকিয়ে দুঃখ হয়। বৃষ্টিতে ভিজে নিয়ে এলে, সব করলে, তবু আমার কথাটা শুনলে না।’
‘দুধ তোমার জুড়িয়ে যাচ্ছে, বক-বক বক-বক বক-বক কথাবার্তা পরে হবে।
–আরে খেয়ে নাও।’
গ্লাশটা তার হাতে দিলাম।
‘বাঃ, এই গ্লাশটা কার?’
‘বিনয়ের।’
‘বেশ সুন্দর কাচের গ্লাশ তো।’
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তুমি খাও।’
চুপ করে বই পড়ছিলাম।
কল্যাণী, ‘তুমি নাকি আবার চা খেয়ে এসেছ, চুরুটও?’
গেলাশটা সে ঠোঁট অব্দি তুললে, ‘কই কথার উত্তর দাও না যে?’
‘কোন কথা?’
‘চা-চুরুট খেয়ে পেট ভরিয়ে আসনি?’
‘হ্যাঁ।’
‘তা যদি না-করতে তা হলে নিশ্চয়ই তোমাকে দুধ খেতে হত।’
‘তা, তোমার পাল্লায় পড়লে।’
‘আমি কি আমার জন্য আনিয়েছি, এটা তুমি বুঝলে না?’
তাকিয়ে দেখি দুধ তখনো অভুক্ত।
[অসমাপ্ত]

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com