বয়স যখন মাত্র চৌদ্দ বছর, গোঁফ গজিয়েছে কি গজায়নি, পিতাকে হারিয়ে শংকরকে তখন জীবিকার তাগিদে পথে নামতে হয়েছে। ছেলে একসময় ব্যারিস্টার হবে– স্বপ্নে দেখা মা তখন একটাই মূলমন্ত্র গেঁথে দিয়েছিলেন বালক শংকরের মাথায়, ‘তুমি এমন বেয়ারা হও যেন পৃথিবীর কোনো বেয়ারা তোমার সঙ্গে পেরে না-ওঠে’। বেঁচে থাকার জন্য ‘এক নম্বর’ হওয়ার চেষ্টা রণকৌশল হিসেবে যে তুলনাহীন তা বুঝতে শংকরের দেরি হয়নি। ‘যখন চাপরাশির চাকরির জন্য ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে রাস্তায় কাপড়কাচা সাবানের বিক্রিওয়ালা হয়েছি তখনও চেষ্টা করেছি অন্য বিক্রিওয়ালা থেকে আমার যেন কিছু পার্থক্য থেকে যায়। দুজন সাবানওয়ালা একই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন আমারই কাছে খরিদ্দার আসে।’
বাংলায় তখন তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ, বনফুল, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সতীনাথ ভাদুড়ী, শরদিন্দু, বিমল মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, যাযাবর, জরাসন্ধ, শিবরাম– তারকার ছড়াছড়ি। আর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। সেখানে নিজেকে ‘আলাদা’ করে তোলাটা সহজ তো নয়-ই, কঠিনের চেয়েও বেশি।
অথচ জীবন-সংগ্রামের ঘানি টানতে টানতে আর আদালতে মুহুরিগিরি করতে করতে যে বৈচিত্র্যময় মানুষের দেখা পেলেন, তাদের নিয়েই একদিন লিখে ফেললেন ‘কত অজানারে’। সাগরময় ঘোষের হাত ধরে যখন তা ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে শুরু করল ‘দেশ’ পত্রিকা, তখনও এর নাম ঠিক হয়নি, কিন্তু জনপ্রিয়তা উঠল তুঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করে প্রেমেন্দ্র মিত্র নাম দিলেন ‘কত অজানারে’।
প্রথম উপন্যাস থেকেই এ রকম তুমুল জনপ্রিয়তা বাংলা সাহিত্যে আর কজন লেখকের ভাগ্যে জুটেছে? অথবা প্রশ্ন হতে পারে প্রথম সাহিত্য থেকেই শংকরের সাহিত্য এত জনপ্রিয় হতে শুরু করল কেন?
তার একটি কারণ নিঃসন্দেহে– বিষয় নির্বাচন। মধ্যবিত্ত পাঠকের অন্দরমহল আর অফিস-সংস্কৃতিকে তিনি গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এলেন, বাংলা সাহিত্যে যে রকমটা আগে খুব একটা হয়নি। উঠতি কলকাতার মধ্যবিত্ত, যারা পূর্বপুরুষের চাষবাস ছেড়ে শিল্পবিপ্লবের করাল ঘায়ে চাকর হওয়ার চেষ্টায় গলদঘর্ম, আর ‘ভালো মানুষ অথবা মন্দ মানুষ’- এর মাঝখানে পঞ্চাশ রকমের ‘গ্রে এড়িয়া’ নামের বৈচিত্র্য আবিষ্কার করে তাজ্জব, তারাশঙ্করের উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেলেন। শংকরের লেখায় পাঠক খুঁজে পেল সহজ সাবলীল ভাষা, যে ভাষা তার কাছে দুর্বোধ্য না। যেখানে কোনো জটিল প্রতীকী বয়ান নেই, রূপক বর্ণনা পড়ে কষ্টেসাধ্যে বুঝে নেওয়ার দায় নেই, আছে সরাসরি অভিজ্ঞতার স্পষ্ট বর্ণনা। আর নাটকীয়তায় ভরা কথোপকথন-মুখর জীবন্ত কাহিনি। সবচেয়ে বড় কথা, শংকরের উপন্যাসের চরিত্ররা হয়ে উঠতে পেরেছিল ভীষণ রকমের ‘মানুষ’, রবিঠাকুরের ভাষায় ‘ভালো মন্দ সকলি মিশায়ে’।
শংকরের গদ্যশৈলী সংযত অথচ নাটকীয়। অযথা অলংকারে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা নেই। ছোট ছোট ঘটনায় কাহিনির দ্রুত বিস্তার আর চরিত্রগুলোর অন্তর্মুখী দ্বন্দ্ব। পাঠককে আকৃষ্ট করতে এর চেয়ে বেশি কৌশল শংকরকে আয়ত্ত করতে হয়নি।
পাঠকপ্রিয়তা পেলে সমালোচনার পাটকেলও কুড়োতে হয়। কেউ কেউ বলল ‘শংকর? ও আবার লেখক হলো কবে? ও তো কোর্টের মুহুরি!’ অথবা ‘লিখেছে তো নিজের জীবন নিয়ে, স্টক ফুরোলে কী লিখবে? মনে হয় না বেশিদিন টিকবে।’
কিন্তু শংকর টিকে গেলেন। শুধু টিকলেন না, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ‘বেস্ট সেলার’ হয়েই টিকে রইলেন আজীবন। প্রকাশিত পুস্তকের আগায় ‘সংস্করণ’-এর দীর্ঘ তালিকা অনেক ছোটগল্পের চেয়ে দীর্ঘ হয়ে উঠল। কেন এতটা টিকলেন শংকর? তিনি সময় আর মানুষকে দেখতে পেরেছিলেন জহুরি চোখে। সমকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালির সবরকম সংকট, একদিকে পুরোনো মূল্যবোধ আর অন্যদিকে তা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার লোভী তাগিদ, ক্রমশ লকলক করে বের হয়ে আসতে থাকা উচ্চাশা, আত্মসম্মান বিকিয়ে দেওয়া কিংবা তা রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা, ভাতের অভাবে অপমান গিলে খাওয়া, একদিকে আপস করার লোভ সংবরণ করতে না পারা, অন্যদিকে তা থেকে জন্ম নেওয়া হীনম্মন্যতা।
এইসব ভাঙন আর নীতি নৈতিকতার গল্প অবলীলায় বলে গেলেও শংকর কখনও কোনো সীদ্ধান্তে পৌঁছান না, চরিত্রগুলোকে ‘জাজ’ করেন না। আলো আর আঁধারকে তিনি দেখেন নিরপেক্ষ চোখে। নিজে কোনো নৈতিকতার বাণী শোনান না। গল্পের শেষে ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ কিংবা ‘দুষ্টের দমন, শিষ্ঠের পালন’ সাইনবোর্ড টেনে দেন না। তিনি পাঠককে অভ্যস্ত করে তোলেন ভয়ংকর বাস্তবতার সঙ্গে। সহজ কথাকে তিনি সহজভাবে বলতে পারলেও সে কথাটা খুব ‘সরল’ যে না, তা তিনি বুঝিয়ে দেন স্পষ্টভাবে।
শুধু পতন আর হতাশার গল্প লেখেননি শংকর। সিঁড়ি বেয়ে অনেক উঁচুতে উঠতে গেলে যে হোঁচটটাও খেতে হবে, অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে চাইলে যে একা হয়ে যেতে হবে, নিভৃতে একটা স্বপ্নকে লালন না করলে যে আপস করাটাও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে– সেটুকু সাবধান তিনি করে দেন শুধু পাঠককে। কোনটা ‘ভালো’ আর কোনটা ‘মন্দ’, সেটা বুঝে নেবার দায় পাঠকের। হোঁচট খেয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সাহস করবে, না ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ফুটপাতে, নাকি মাঝপথে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে দ্বিধাগ্রস্ত– সে সিদ্ধান্ত পাঠকের। তিনি পাঠককে শোনান বারবার চারপাশের নানাবিধ প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার নানাবিধ পথের গল্প, বারবার হেরে যাওয়া আর স্বপ্নভঙ্গের পরেও উঠে দাঁড়ানোর সংগ্রাম, দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাসের গল্প, লক্ষ্যে স্থির আর অবিচল থাকার গল্প।
উপন্যাসের জনপ্রিয়তা মঞ্চে আর সিনেমাতেও বহমান থেকেছে। চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ, জন অরণ্য বা শাহজাহান রিজেন্সি– সবগুলোই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে, কোনো ফ্লপ নেই। মঞ্চেও চৌরঙ্গী আর সম্রাট ও সুন্দরী সবসময়ই হাউসফুল।
শংকর পপুলার নিঃসন্দেহে। ওদিকে বাঙালি আবার পপুলার কোনো কিছুকেই মহৎ বলতে নারাজ, সস্তা বলতে স্বচ্ছন্দ। যা কিছু কম জনপ্রিয়, বুঝুক না বুঝুক তাকেই শ্রেষ্ঠ বা ক্ল্যাসিক মানতে সোচ্চার। যা কিছু মাথার ওপর দিয়ে যায়, তাকেই মাথায় তুলে নাচতে আগ্রহী। সর্বজনে যা পছন্দ করে ফেলেছে ইতোমধ্যে, সেটাকে নিজেরও পছন্দ বলে ‘ঝাঁকের কই’ হয়ে না থেকে, সে চায় ‘বিশেষ’ হয়ে থাকতে। ‘বেস্ট সেলার’ শংকর টিকে থাকবেন কিনা তা ভবিষ্যৎই ঠিক করে দেবে। তবে এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায় করপোরেট সংস্কৃতির আগ্রাসনে তৈরি হওয়া বাঙালির যে মানসিক সংকটকে তিনি উপন্যাসে তুলে রাখলেন, সত্তর বছর পরে আজ পর্যন্ত সে সংকট বাঙালির অন্যতম প্রধান সংকট। এখনও ঘুষ, দুর্নীতি, পুকুর চুরি আর লুটপাটের মহোৎসবের ঝলমলে আলো নিভিয়ে বাঙালি খোঁজে হীনম্মন্যতা লুকোনোর আড়াল; ধর্মে, রাজনীতিতে কিংবা লেবাসে। শংকরের সময়ে মানুষ যতটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল এখন তারচেয়ে বেশি কনফিউজড হয়েছে, যতটা হতাশ ছিল এখন তারচেয়ে বেশি ফ্রাস্টেশনে ভুগছে, যতটা ভয়ে ছিল এখন তারচেয়ে বেশি ভীত হয়েছে। সময় বদলেছে, মানুষ এখন চাকরি হারানোর ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে অ-মানুষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে, কিন্তু মানুষের ভেতরকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব, হীনম্মন্যতা আর টানাপোড়েনের গল্প শেষ হয়নি এখনও, বাড়ছে দ্বিগুণ। সে হিসেবে ‘বেস্ট সেলার’ শংকর সম্ভবত প্রাসঙ্গিক থাকবেন আরও বহু বছর।