সামনে বাধার পাহাড়। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস। বিনিয়োগে স্থবিরতা। একের পর এক শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় বাড়ছে বেকারের মিছিল।
সামনে বাধার পাহাড়। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস। বিনিয়োগে স্থবিরতা। একের পর এক শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় বাড়ছে বেকারের মিছিল।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে অনেকটা নির্বাসনেই ছিলেন। দেশে মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবন যখন রাজনৈতিক হয়রানি আর মামলা, জেল-জরিমানায় বিপর্যস্ত, তখন তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটালেও ঠিকই দেশেও তাঁর বিরুদ্ধে সমানভাবে চলতে থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ও জেল-জরিমানা। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতির সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়।
বিশ্বেষকরা মনে করেন, তারেক রহমান অস্থির সময়ে দেশের দায়িত্বভার কাঁধে নিলেন। তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনমনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো। সেই সঙ্গে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার কাজটিও করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি আনতে হবে। সকল মত ও ধর্মের মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্বেষকরা আশার কথাও বলেছেন। তাঁরা বলেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাটা থাকা জরুরি। বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সিভিল সোসাইটি দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ প্রিভিলেজের সমালোচনা করে আসছে, কারণ এটি একটি বিরাট বৈষম্য। ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি এবং সরকারি প্লট বরাদ্দ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই ইতিবাচক। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কঠিন সমস্যার সমাধান সম্ভব। জয় পাওয়ার পর গা ছাড়া মনোভাব বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতসহ প্রতিটি সেক্টেরই সমস্যা প্রকট। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে গেছে। বিগত সরকার (অন্তর্বর্তী সরকার) ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টেনে তোলার চেষ্টা করলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। তারা মূল্যস্ফীতি সহনীয় করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটিও এখনো লাগামহীন। তবে শেষ বেলায় একটি ভালো নির্বাচন দিয়ে যেতে পেরেছে বলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি রয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় চ্যালেঞ্জ আছে, যার কোনো অন্ত নেই। প্রথম কথা হলো, প্রশাসনিক কাঠামো ঠিক করা। যে আমলাতন্ত্র আছে এখন, এই আমলাতন্ত্র দিয়ে প্রশাসন চলবে না। এই আমলাতন্ত্র বিভক্ত এবং দলীয় আনুগত্য পোষণকারী। এর জায়গায় সৎ, নিরপেক্ষ, যোগ্য আমলা দরকার; সে জন্য আমলাতন্ত্রের একটা বিরাট পরিবর্তন দরকার।’
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত দুর্বল। তাদের মোরাল বলতে কিছু নাই, তারা নিজ উদ্যোগে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করে না। জুলাই অভ্যুত্থানে পালিয়ে গিয়ে আবার তারা কাজে ফিরে এলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের ভূমিকা উজ্জ্বল নয়। এখানে পরিবর্তন দরকার। বিচার বিভাগে পরিবর্তন দরকার। এগুলো রাষ্ট্রের হাত-পা; এগুলো ঠিকমতো কাজ না করলে বৈদেশিক সম্পর্ক বা আইন-শৃঙ্খলা—কোনোটাই ভালোভাবে চলবে না। সংস্কারের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং রিজার্ভের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ।’
মাহবুব উল্লাহ আরো বলেন, ‘বহুবিধ অর্থনৈতিক সংকট আছে, যেগুলো মোকাবেলা করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বিশাল, যা প্রাপ্তির সঙ্গে না মিললে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এক্সপোর্ট না বাড়লে ফরেন রিজার্ভ উন্নত হবে না। বৈদেশিক ও দেশীয় ঋণের বোঝা এবং তার সুদ পরিশোধ করা দিনে দিনে অসম্ভব হয়ে উঠছে। এটি মোকাবেলায় রাজস্ব বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে জিডিপি ও ট্যাক্স রেশিও এখন ৭ শতাংশের কোটায়, যা নেপালের চেয়েও খারাপ অবস্থা। মানুষকে কষ্ট না দিয়ে সৃজনশীলভাবে ট্যাক্স নেট বাড়ানো অর্থমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সার্ভিস ডেলিভারিতে সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় কথা, চৌকিদার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি ছেয়ে গেছে, যা উচ্ছেদ করা প্রয়োজন।’
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবীন ও প্রবীণদের সমন্বয়ে খুবই সুন্দর একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় দক্ষ ও যোগ্যদের দেওয়া হচ্ছে। চলমান সংকট কাটিয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে দেশ ঘুরে দাঁড়াবে, ইনশাআল্লাহ।’
গতকাল বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে সংসদের দক্ষিণ প্লাজার খোলা ময়দানে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর গতকাল রাতে শেরেবাংলানগরে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের এবারের মন্ত্রিসভার বিশেষ দিক হলো, এখানে তরুণ-প্রবীণ ও দক্ষদের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে খুবই সম্ভাবনাময় দক্ষ ব্যত্তিদেরও নির্মোহভাবে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আশা করা যাচ্ছে, এই মন্ত্রিসভা যত চ্যালেঞ্জই আসুক না কেন, তা তারেক রহমানের পরিণত নেতৃত্বের গুণাবলিতে উতরে যাওয়া সম্ভব হবে।
স্বপ্নে প্রত্যয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান। ছবি : পিআইডি

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় গতকাল রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান। ছবি : পিআইডি

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে বিএনপির (বাঁয়ে) এবং জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। ছবি : পিআইডি

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, তিন বাহিনী প্রধানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন (বাঁয়ে) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে এনসিপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। ছবি : পিআইডি

সদ্যোবিদায়ি প্রধান উপদেষ্টাসহ দেশ-বিদেশের অতিথিরা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ছবি : পিআইডি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিবারসহ গতকাল জিয়া উদ্যানে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। ছবি : পিআইডি