সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

তুজম্বর আলী ছদ্মনামে জসীমউদ্‌দীনের গণসংগীত

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

আমাদের পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন (১৯০৩-১৯৭৬) সারাজীবন পল্লির গান তথা লোকসংগীত ও সুর সংগ্রহ করেছেন। আব্বাসউদ্দীন কিংবা আবদুল আলীমকে যে গান শিখিয়েছেন, তা-ও পল্লিসংগীত। নিজে যেটুকু গেয়েছেন আসরে কিংবা বেতারে, তা-ও পল্লিসংগীত কিংবা কবিগান। আর নিজে যা লিখেছেন, তাকে পল্লিগীতিই বলব; তা ভাটিয়ালিই হোক আর জারি-সারি-মুর্শিদি গানই হোক। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে তিনি তিনটি গান লিখেছেন, তাকে ঠিক পল্লিসংগীত বলা যায় না। গানের ভাব-ভাষা-সুরের বিচারে তা শেষতক গণসংগীতই হয়ে উঠেছে। বিস্ময়ের কথা বলেছি এই জন্য যে, পল্লিকবি তাঁর চিরায়ত কাব্যস্বভাব ছেড়ে গণসংগীত লিখতে এলেন! জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে কবি চুপ করে থাকতে পারেননি। যুদ্ধের সময় লেখা কবিতাগুলো তিনি লেখেন তুজম্বর আলী ছদ্মনামে। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত রচিত কবিতাগুলো তিনি ছদ্মনামে প্রকাশের জন্য রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে পাঠিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে নওরোজ কিতাবিস্তান থেকে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন মোহাম্মদ নাসির আলী। ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’ নামে সেই কবিতাগ্রন্থের ভূমিকায় কবি লিখেছেন,
‘তুজম্বর আলী ছদ্মনামে এই কবিতাগুলি রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারতে পাঠান হইয়াছিল। আমার মেয়ে হাস্না এর কতকগুলি ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া অপর নামে নিউইয়র্কে বিদ্বান সমাজে বেনামিতে পাঠ করাইয়াছে। রাশিয়াতেও কবিতাগুলি সমাদৃত হইয়াছিল। সেখানেও কিছু কিছু লেখা রুশ ভাষায় অনূদিত হইয়াছে। ভারতে এই লেখাগুলি প্রকাশিত হইলে মূল্‌করাজ আনন্দ প্রমুখ বহু সাহিত্যিক ও কাব্যরসিকের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সেই দুর্দিনে বাংলাদেশে আমার লেখাগুলি নকল করিয়া যাহারা আমার সঙ্গে বিপদের ঝুঁকি লইয়াছিল তাহাদের সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’
কবিতাগুলোর অনুলিপি তৈরি করতেই বিপদের ঝুঁকি ছিল, তাহলে কবির কী অবস্থা হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। কবির ছদ্মনাম ধারণ এবং বিদেশে প্রকাশের প্রকৃত কারণ ছিল তাই। তাঁর মেয়ে হাস্না হলে হাসনা জসীমউদ্‌দীন, পরে যিনি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে বিয়ে করে হাসনা মওদুদ হন। যুদ্ধকালীন কবিতা হিসেবে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু আমাদের নজর আজকে ওই গ্রন্থের তিনটি গান নিয়ে।
৮ জুলাই তারিখে রচিত গানে তিনি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও হুংকারের কথা প্রকাশ করেছেন। সুরে কিছুটা ধুয়া গানের টানা থাকার কথা। প্রতি অন্তরা শেষে ‘ভাই-ভাইরে’ শব্দ থাকায় এই ধারণা পোষণ করি। গানের আস্থায়ীতে রয়েছে–
‘ও নাও সাজাইয়া,
ও গান বাজাইয়া,
ওই কারা গাঙে বাইয়া যায়।
স্বাধীন-বাংলার সৈন্য ওরা লড়াই করতে যায়,
আকাশ-জমিন কাঁইপা উঠছে ঠাটার বইঠার ঘায়;
ওরা, ঝড় মানে না ডর জানে না বাতাসের আগে ধায়,
বজ্র আঁটন মারে যদি দস্যু দুশমন পায়;
ভাই-ভাইরে।।’
এই গানে অসাধারণ কিছু চিত্রকল্প কবি তৈরি করেছেন। ‘আকাশ-জমিন কাঁইপা উঠছে ঠাটার বইঠার ঘায়’। নৌপথের যোদ্ধাদের হুংকার তো এমনই হবে! ‘ঠাটার বৈঠা ঘা’ এতটাই কাব্যিক যে, গানের গভীরতাকে অতলান্ত করে তুলেছে। যারা মা-বোনের ইজ্জত লুটছে, তাদের বুকের পাঁজর ছিঁড়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় মাঝিবেশী এই নৌযোদ্ধারা। তিন অন্তরা ‘ভাই-ভাইরে’ ধুয়া থাকলে শেষ অন্তরায় রয়েছে ‘হায় হায় রে’। কবি লিখেছেন–
‘আকাশেতে পালাস যদি ধরব বজ্র হয়ে,
পাতালে গেলে মারব তোদের সহস্র সাপ লয়ে;
সুন্দরবনে খাড়া আছি আমরা হাজার বাঘ,
পূর্ব আকাশে জ্বলছে আগুন (তোদের) কপালে দিতে আগ!
হায় হায় রে।’
কী অসাধারণ কাব্যগুণ রয়েছে এই গানে! শত্রুরা আকাশে পালালে বজ্র হয়ে ধরবে, মাটির নিচে পালালে সাপ দিয়ে ধরাবে, আর সাগরে পালাতে চাইলে সুন্দরবনের বাঘ হয়ে আক্রমণ করবে। আর পুবের আকাশে আগুন জ্বলার মাধ্যমে তিনি জয়ের সম্ভাবনার ঘোষণা দেন। এই গণসংগীত কোথাও গীত না হলেও সাহিত্যমূল্যে এটি টিকে আছে।
১০ জুলাই তিনি রচনা করেন আরেকটি গান। ‘প্রথম দুটি লাইন চারণকবি মুকুন্দদাসের একটি গান হইতে গৃহীত’ স্বীকারোক্তি দিয়ে জসীমউদ্‌দীন লিখেছেন–
‘সাবধান! সাবধান!
আসিছে নামিয়া ন্যায়ের দণ্ড
রুদ্রদীপ্ত মূর্তিমান।
শত নরনারী নিধন রক্তে
বসেছিস তোরা মারণ তক্তে;
আনিতে তোদের মরণ ওক্তে,
আসে মহাকাল মূর্তিমান।।’
জসীমউদ্‌দীনের ভাষ্য মতে ‘সাবধান! সাবধান!/ আসিছে নামিয়া ন্যায়ের দণ্ড/ রুদ্রদীপ্ত মূর্তিমান’ চরণগুলো মুকুন্দদাসের। প্রকৃত তথ্য হলো মুকুন্দদাস (১৮৭৮-১৯৩৪) এই গান গেয়ে জনপ্রিয় করেছেন, তাঁর আদর্শ পালায় এই গান অন্তর্ভুক্ত ছিল, মুকুন্দপুত্র কালিপদ দাসের সংগৃহীত “চারণ-কবি মুকুন্দদাসের গীতাবলী’ গ্রন্থে স্থান পেলেও এর রচয়িতার নাম হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯৩১)। তাঁর ‘দাদাঠাকুর’ নাটকে নাটকে এই গানটি আছে। কিছু গান যুক্ত করে ‘আদর্শ’ নামে মুকুন্দদাস মঞ্চস্থ করেন। তাই অনেকেই একে মুকুন্দদাসের গান বলেই মনে করতেন। পরে হেমচন্দ্রের নাটকটি ‘আদর্শ ও দাদাঠাকুর’ (আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে মুদ্রিত, ১৯১৯, পৃ. ৩১) নামে প্রকাশিত হয়। অনেকের মতো জসীমউদ্‌দীন হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গানকে মুকুন্দদাসের গান মনে করেছেন। কিন্তু পরের চরণগুলো জসীমউদ্‌দীনের। হেমচন্দ্রের গানটি ছিল ব্রিটিশ শাসকদের সাবধান করার গান। আর জসীমউদ্‌দীনের গানটি পাকিস্তান শাসকদের সাবধান করার গান। আভোগে তিনি বলেছেন, যে অস্ত্র দিয়ে তারা বাঙালিদের হত্যা করে চলছে, সেই অস্ত্র দিয়েই শাসকদের রুখে দিতে হবে। জসীমের ভাষায়–
‘যে অসিতে তোরা করিয়া ছেদন
পথে ঘাটে শত আনিলি মরণ;
সে অসি আবার ফিরিয়া এখন
তোদের রক্তে করিবে স্নান।’
ইমনকল্যাণ রাগে একতালা সুরে গানটি বেঁধেছিলেন হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সারাদেশে গেয়ে গেয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বেগবান করেছেন মুকুন্দদাস আর তার প্রথম দুই চরণ নিয়ে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণা জুগিয়েছেন তুজম্বর আলী তথা জসীমউদ্‌দীন।
‘হবে হবে জয়’ নামে আরেকটি গণসংগীত লিখেছেন জসীমউদ্‌দীন। প্রথম গানটি ছিল স্বরবৃত্ত ছন্দে, দ্বিতীয়টি মাত্রাবৃত্তে, তৃতীয় গানটিও মাত্রাবৃত্তে। গানটির আস্থায়ীতে আছে–
‘হবে হবে জয় তোমাদের হবে জয়,
তোমাদের খুনে রঙিন হইয়া জনমিবে বরাভয়।’
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ফাঁসির মঞ্চে জীবনদান করে যারা অমর হয়েছেন, সেই শহীদদের স্মরণ করে তিনি মুক্তিকামী জনগণের বিজয় কামনা করেছেন। তিনি লিখেছেন–
‘জবা কুসুমের দ্যুতি মনোরম
জাগিছে প্রভাত উজ্জ্বলতম
চরণে দলিত মহানির্মম আঁধার লভিছে ক্ষয়
ভয় নাই– নাহি ক্ষয়।।’
আমরা এই তিনটি গানের মাধ্যমে জসীমউদ্‌দীনের আধুনিক মনস্কতা অনুধাবন করতে পারি। জাতির প্রয়োজনে তিনি পল্লিগীতির আসর ছেড়ে গণসংগীতের ঝংকার তুলেছেন। জসীমউদ্‌দীন গীতিকবি হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সত্তার অধিকারী। পল্লিকবির অভিধা ছাপিয়ে তিনি কেবলই কবি হয়ে উঠেছেন।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com