আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোটকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে এক অবহিতকরণ সভায় এ বিষয় তুলে ধরা হয়। সভায় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সরকারের হালনাগাদ প্রস্তুতি, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে কূটনীতিকদের বিস্তারিত অবহিত করা হয়।
কূটনীতিকদের সঙ্গে এই সভা আয়োজনের আগের দিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উদ্বেগ জানিয়েছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাজ্যও বাংলাদেশ ভ্রমণ পরামর্শ হালনাগাদ করেছে।
নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর আহবান : বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে অবহিতকরণ সভা শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এই সভায় কূটনীতিকদের জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানাবে এবং বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী সার্বক্ষণিক সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। কূটনীতিকদের এসব তথ্যও অবহিত করা হয়।
সভায় ভারত, পাকিস্তান, চীন, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, নেপাল, স্পেন, ইতালিসহ ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রায় ৪০ জন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। গত বছর জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোট।
সভায় গত অক্টোবরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং অন্তত ২৫টি রাজনৈতিক দলের সমর্থনে এই জাতীয় সনদ গৃহীত হওয়ার বিষয় ও গণভোটের ফল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানানো হয়।
সূত্র জানায়, সভায় কূটনীতিকদের জানানো হয়, গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। এর আগে আগস্টে ২৪ দফা নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী প্রচারকাল থাকবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, এ পর্যন্ত দেশে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন।
সভায় জানানো হয়, এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু নতুন ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রথমবার ভোটার তরুণ-তরুণী, প্রবাসী বাংলাদেশিরা, যারা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। নিজ নিজ আসনের বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য ডাকযোগে ভোট (পোস্টাল ব্যালট) ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সভায় আরো জানানো হয়, নির্বাচন কমিশন তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। স্বচ্ছতা, ভোটার সহায়তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা। এ নিয়ে গত এক বছরে কমিশন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে সভায় জানানো হয়। সভায় আরো জানানো হয়, প্রায় ৪৫ লাখ বাদ পড়া বা বিচ্ছিন্ন ভোটার নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, প্রায় ২১ লাখ মৃত ভোটার তালিকা থেকে বাদ, পুরুষ ও নারী ভোটারের ব্যবধান কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে আগে বাদ পড়া নারী ভোটারদের সচেতন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা : সভায় জানানো হয়, সারা দেশে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী দেশব্যাপী মোতায়েন থাকবে, যাতে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ হয়। তৃণমূল পর্যায়েও প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস : কিছু কূটনৈতিক মিশনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার পূর্ণ আশ্বাস দেয়। সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতির প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। কূটনৈতিক মিশন ও তাদের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও বিশেষায়িত কূটনৈতিক নিরাপত্তা ইউনিটগুলো কূটনৈতিক এলাকা ঘিরে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত।
সভায় আরো জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ও স্থানীয় ঘটনা ঘটলেও সেগুলো সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিফলন নয় এবং বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কোনো আশঙ্কা নেই। সরকার নির্বাচনের সময়সহ পরবর্তী সময়েও দেশের সব নাগরিক ও কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো কূটনৈতিক মিশনের নির্দিষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ বা সহায়তার প্রয়োজন হলে দ্রুত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহবান জানানো হয়।