তাঁদের এই অবদান আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা ও সাহস জোগায়, সকল সংকট-সংগ্রামে দেখায় মুক্তির পথ।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত গড়ে তুলতে যে বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, দেশের আপামর জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আজ আমরা তার সফল পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছি।’
হাদির ওপর হামলায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না
ড. ইউনূস বলেন, ‘আপনাদের সামনে আজ উপস্থিত হয়েছি অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে।
এই আনন্দের দিনে গভীর বেদনার সঙ্গে জানাচ্ছি, জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর সম্প্রতি যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত। সরকার এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে। আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পরাজিত শক্তি ফ্যাসিস্ট টেররিস্টদের এই অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। আপনাদের প্রতি আহবান জানাই, সংযম বজায় রাখুন। অপপ্রচার বা গুজবে কান দেবেন না। ফ্যাসিস্ট টেররিস্টরা, যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, আমরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবেলা করব। তাদের ফাঁদে পা দেব না। পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি এ দেশের পবিত্র মাটিতে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।’
আমাদের তরুণদের রক্ষা করুন
তরুণদের রক্ষার আহবান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের তরুণদের রক্ষা করুন। তাহলে আমরা সবাই এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা পাবে। যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে তারা বুঝে গেছে, তরুণ যোদ্ধারা তাদের পুনরুত্থানের পক্ষে ভীষণ রকম বাধা। এই অস্ত্রহীন, ভীতিহীন, ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, দৈনন্দিন এই চেহারার ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের সাংঘাতিক ভীতি। তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচন আসার আগেই পথের এই বাধাগুলো সরিয়ে ফেলা, নিজেদের রাজত্ব আবার কায়েম করা। তাদের বন্ধুরা যত দিন তাদের সঙ্গে আছে, তত দিন তারা এই স্বপ্ন দেখবে। নির্বাচন হয়ে গেলে তাদের বন্ধুরা সমর্থন জোগাতে বেকায়দায় পড়বে। সে জন্যই তো এত তাড়াহুড়া। তারা চায় নির্বাচনের আগেই তাদের ফিরে আসা নিশ্চিত করতে। নানা ভঙ্গিতে এটা তারা করবে। এই চোরাগোপ্তা খুন করার উদ্যোগ তার একটা রূপ। আরো কঠিনতর পরিকল্পনা নিয়ে তাদের প্রস্তুতি আছে। দেশের সবাইকে জোর গলায় বলতে হবে, আমরা তরুণদের রক্ষা করব। এখানে পুরনো আমলের দাসত্ব মেনে যারা আছে, তাদের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করে আমরা সবাই মিলে দেশের ওপর আমাদের পরিপূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠা করব। নির্বাচনের আর বাকি মাত্র দুই মাস। আমরা তাদের ওপর নজর রাখব এবং বাকি দিনের প্রতিটি দিন উৎসবমুখর করে রাখব। যেহেতু আমাদের কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীদের মনে কোনো ভয়ডর নেই, তাই তারা নির্বাচনের আগের দুই মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে উৎসবমুখর করে রাখবে। সব রকমের হিংসা, কোন্দল থেকে দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনারা জানেন, জাতীয় নেত্রী, দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। এ বিষয়টি আমাদের সবার জন্যই উদ্বেগের। অন্তর্বর্তী সরকার খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকার, দেশের উন্নয়নে তাঁর অবদান এবং তাঁর প্রতি জনগণের শ্রদ্ধাময় আবেগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার এরই মধ্যে তাঁকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পরিবারের ইচ্ছাকে সম্মান দেখিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। দেশে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সব বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।’
পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে দেশে ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক একটি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রমাণভিত্তিক বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভ্যুত্থানের পর পলাতক শেখ হাসিনা এবং এই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে দেশে ফেরানোর জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে।’
ভোটের ওপর নির্ভর করছে সবার ভবিষ্যৎ
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘একটি বিষয় বারবার মনে করিয়ে দিতে চাই, নতুন বাংলাদেশ গঠনের দায়িত্ব আমাদের সবার। আপনাদের মূল্যবান ভোটই আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই ভোটকে শুধু কাগজে একটি সিল মারার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলেই হবে না; বরং এটি হবে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা এবং দেশকে এগিয়ে নিতে সরাসরি অবদান। দেশের মালিকানা আপনাদের হাতে, আর সেই মালিকানারই স্বাক্ষর আপনার ভোট।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম। আমি দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি উন্মুক্ত আহবান জানাচ্ছি, আপনারা একে অপরকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখবেন; কখনো শত্রু হিসেবে দেখবেন না। যারা ভোট বাক্স ডাকাতি করবে, তারা দেশের মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী। তারা নাগরিকদের দুশমন। তাদের থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা আমাদের সবার অবশ্যকর্তব্য। ভোট জনগণের ভবিষ্যৎ রচনার অক্ষর। ভোটের ওপর নির্ভর করছে আপনার আমার সবার ভবিষ্যৎ, আপনার আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ। যোগ্য লোককে ভোট দিন, জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন।’
জুলাই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথযাত্রার ঐতিহাসিক দলিল
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘জুলাই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথযাত্রার একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই সনদে আমরা যে সংস্কারমালা প্রস্তাব করেছি—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি হ্রাস, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সমাজে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা—এসব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জনগণের সুস্পষ্ট মতামত। কারণ একটি জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক নেতৃত্ব বা একটি প্রশাসনের মাধ্যমে টেকসই হয় না; জনগণকেই চূড়ান্ত সম্মতি দিতে হয়।
এ কারণেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কারদিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এর মাধ্যমে আপনারা জানিয়ে দিন, আপনারা জুলাই সনদের সংস্কার কাঠামো এগিয়ে নিতে চান কি না। আপনাদের ভোটই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র কোন পথে অগ্রসর হবে, প্রশাসন কোন কাঠামোতে পুনর্গঠিত হবে এবং নতুন বাংলাদেশ কেমন রূপ পাবে।’
বিচার বিভাগকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আজ আমি আপনাদের সামনে আমাদের রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি তুলে ধরতে চাই। একটি আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা অত্যাবশ্যক। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাতে চাই, এরই মধ্যে বিচার বিভাগকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে।’