বিজয়ের এই দিনে মুসলমানরা আল্লাহর প্রশংসা এবং পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে। কেননা মহান আল্লাহর রহমতেই শুধু একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভ করা যায়।
সময়টি ছিল নবুয়তের ১৩তম বছর। সফর মাসের ২৭ তারিখ তথা ১০ সেপ্টেম্বর ৬২২ সাল। ওই রাতে মহানবী (সা.) সবার অলক্ষে আবু বকর (রা.)সহ মদিনার পথে রওনা করেন। এ সময় তাঁর চোখ দুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল। কারণ তিনি প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। জন্মভূমিকে আল্লাহর রাসুল (সা.) অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই মহানবী (সা.) গভীর ভারাক্রান্ত মনে কাবাঘর ও মক্কা নগরীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হে কাবা! হে আমার জন্মভূমি মক্কা! আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমাকে ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছি। আমি জানি, আল্লাহর জমিনে তুমিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তোমার সন্তানরা আমাকে এখানে থাকতে দিল না। আমার কওম, আমাকে বহিষ্কৃত হতে বাধ্য করেছে। তা না হলে আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’
জন্মভূমির প্রতি মহানবী (সা.)-এর এই যে অকুণ্ঠ ভালোবাসা তা মুসলিম জাতির প্রতিটি মানুষের কাছেও একই অনুভূতির বিষয়। আমরা যে দেশে বাস করছি, তার মাটি আমাদের কাছে মায়ের মতোই পবিত্র। মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে আমরা এই শিক্ষাই লাভ করি। মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষা ও এর নিরাপত্তা বিধান এবং শত্রুর হাত থেকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার কাজকে ইসলাম অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী (সা.) দেশের নিরাপত্তার জন্য কাজ করাকে একটি ইবাদতের শামিল বলে ঘোষণা করেছেন। এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত (দেশের) সীমানা পাহারা দেওয়া এক মাসব্যাপী রোজা পালন ও মাসব্যাপী রাত জাগরণ করে নামাজ আদায়ের চেয়ে বেশি কল্যাণকর। এ অবস্থায় যদি সে মৃত্যুবরণ করে, তবে যে কাজ সে করে যাচ্ছিল, মৃত্যুর পরও তা তার জন্য অব্যাহত থাকবে। তার রিজিক অব্যাহত থাকবে, কবর ও হাসরে ওই ব্যক্তি ফিতনা থেকে মুক্ত থাকবে।’
(সহিহ বুখারি)
দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখা ও স্বাধীনতা লাভের পর এর জন্য আনন্দ প্রকাশ করার বিধানও আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের সামনে পেশ করেছেন। মদিনায় হিজরত করার পর অষ্টম হিজরির ১০ রমজান (৬৩০ সাল) আল্লাহর রাসুল (সা.) মক্কা অধিকার করেন। মক্কা বিজয়ের এই মহা-আনন্দের দিন মহানবী (সা.) তা উদযাপন করেন। বিজয়ের প্রথম আনন্দে তিনি আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া প্রকাশ করেন। মাতৃভূমি ফিরে পাওয়ার আনন্দে মহানবী (সা.) যে তৃপ্তি লাভ করেছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার সম্ভব নয়। এই বিজয়ের প্রাক্কালে আল্লাহর শুকরিয়া প্রকাশের জন্য মহানবী (সা.) খুশির আতিশয্যে মক্কাবাসী কাফির-মুশরিক ও অত্যাচারীদের জন্য ক্ষমার মহিমা ঘোষণা করেন। মক্কা বিজয়ের আনন্দে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যারা আজ কাবাঘরে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ। যারা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, তারা যত অত্যাচার-নির্যাতনকারীই হোক, তারা নিরাপদ, যারা নিজ নিজ বাড়িতে থাকবে তারাও নিরাপদ।’
প্রকৃতপক্ষে বিজয়ের আদর্শ প্রকাশের দৃষ্টান্ত হলো আল্লাহর প্রশংসা এবং ক্ষমার আদর্শ প্রদর্শন করা। তাই প্রতিবছর আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যে বিজয় দিবস পালন করি, সেদিনও ইসলামের এই আদর্শই আমরা প্রকাশ করব। আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব এবং তাঁর মহিমা প্রকাশ করব। বিজয় দিবসের দিন বিজয়ের মহিমা ও তাৎপর্য নিয়ে আমরা আলোচনাসভার আয়োজন করতে পারি। ইসলামের আলোকে বিজয়ের মাহাত্ম্য তুলে ধরতে পারি এবং ক্ষমা ও সহানুভূতির আদর্শ পরিপালন করে সবাই কিভাবে মিলেমিশে থাকতে পারি, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করাও যেতে পারে। এসব সভায় দেশপ্রেম, দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দায়িত্ববোধ এবং দেশের সীমান্ত প্রহরার সওয়াব নিয়েও আমরা আলোচনা করতে পারি, যাতে দেশের নাগরিকদের মধ্যে দেশ রক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করার সচেনতা ও আকাঙ্ক্ষা সব সময় বিরাজমান থাকে।
বিজয় দিবসে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে যারা অবলীলায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার জন্য ঘরবাড়ি ও আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে যাঁরা যুদ্ধের ময়দানে শাহাদতবরণ করেছেন তাঁদের জন্য দোয়া করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে এটিকে ঈমানের দাবি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যেমনটি মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে নবী! যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দিনে প্রবেশ করতে দেখবেন। তখন আপনি আপনার পালনকর্তার তাসবিহ তথা পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমা ও তওবা কবুলকারী।’ (সুরা : নসর, আয়াত : ১-৩)
মহান স্বাধীনতার দিন আমরা আরো যে কাজ করতে পারি তা হলো, শহীদ পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়া, তাঁদের সব ধরনের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা এবং তাঁদের পাশে থাকা। যুদ্ধ করতে গিয়ে যাঁরা আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছেন, তাঁদের অভাব-অনটন দূর করাসহ তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয়ভার নির্বাহের ব্যবস্থা করা এবং এসব যুদ্ধাহত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা কর্মক্ষম তাঁদের কর্মসংস্থানের চেষ্টা করার প্রতিও আমরা নজর দিতে পারি। যুদ্ধাহত মানুষের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন ও তাঁদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। আর এসব দায়িত্ব পালন করতে পারলেই শুধু দেশের স্বাধীনতা হয়ে উঠবে মহিমান্বিত এবং বিজয় দিবস হয়ে উঠবে গৌরবময়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এ বছরের বিজয় দিবস হোক আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করার একটি বছর। আল্লাহ তাআলা এবারের বিজয় দিবসে আমাদের সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে গড়ে তোলার ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।