গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা এ বিষয়ে তাঁদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের অংশ নেন। এ সময় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলা পূর্বপরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
নিজেদের মধ্যে যেন দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে, কিন্তু কাউকে শত্রু ভাবা বা আক্রমণ করার সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে।
বৈঠকে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে ওসমান হাদির ওপর ন্যক্কারজনক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদলীয় প্রতিবাদসভার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এই সভা হবে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য অটুট রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আরো জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা। এ ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম কঠোরভাবে পরিচালনার ওপরও জোর দিয়েছেন তাঁরা।
ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাস বিরোধী জাতীয় ঐক্যই
আমাদের বড় শক্তি : সালাহউদ্দিন
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পরস্পরের দোষারোপ থেকে বিরত থাকতে হবে। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়াজ তুলতে হবে। কোনো ধরনের অপশক্তিকে আমরা বরদাশত করব না।’ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, শাহবাগ অথবা শহীদ মিনারে যে প্রতিবাদসভা হবে, সেখানে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ কামনা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। বিএনপি ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে ঐক্য অটুট রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ঐক্যকে দৃশ্যমান করতে চাই। ফ্যাসিবাদবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্যই হবে আমাদের বড় শক্তি।’
রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সব দলের নেতাকর্মীরা যেন নিরাপদে থাকতে পারেন, সে জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানানো হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে আমরা সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আহবান জানাব এবং দলীয়ভাবেও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’
আমাদের আগের মতো ঐক্যবদ্ধ
থাকতে হবে : গোলাম পরওয়ার
বৈঠকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যে একে অপরকে দোষারোপ করার প্রবণতা বেড়েছে, যার সুযোগ বিরোধীরা নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অতীতের মতো সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ক্ষুুদ্র দলীয় স্বার্থে আমরা একে অন্যকে প্রতিপক্ষে পরিণত করেছি। এতে জাতি বিভক্ত হচ্ছে।’
হাদিকে গুলির ঘটনা আওয়ামী লীগের
নির্বাচনবিরোধী ছকের অংশ : নাহিদ
এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই কিছু লোক এই অভ্যুত্থানকে খাটো করার জন্য নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। সুসংগঠিতভাবে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চলছে। নির্বাচনের পর যারা ক্ষমতায় আসবে, তারাও এর ভুক্তভোগী হবে। কেউই একা সরকার চালাতে পারবে না।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে মনে হয় যারা অভ্যুত্থান করেছে, তারা অপরাধ করেছে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিকে নরমালাইজ করতে নানা চেষ্টা চলছে। টিভি টক শোতে তারা নিয়মিত অংশ নিচ্ছে, প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মিলিত হচ্ছে এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দিচ্ছে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় সব জায়গায় আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করা, প্রশাসনিকভাবে প্রতিহত করা এবং ভারতের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার কথা বলেছি। আমরা সর্বাত্মকভাবে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখব বলেছি।’
হাদির পরিবারকে প্রধান উপদেষ্টার
সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিতের আশ্বাস
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গতকাল সকালে ওসমান হাদির ভাই আবু বকর সিদ্দীক, বোন মাসুমা এবং ইনকিলাব মঞ্চের তিন নেতা আব্দুল্লাহ আল জাবের, ফাতিমা তাসনিম জুমা ও মো. বোরহান উদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ওসমান হাদির সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সারা দেশ তাঁর জন্য দোয়া করছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় যদি দেশের বাইরে পাঠাতে হয়, যেখানে পাঠানোর প্রয়োজন হবে, সরকার সেখানেই তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
ওসমান হাদির বোন বলেন, ‘ওর অনেক কাজ, ওকে বেঁচে থাকতে হবে। আপনারা বিপ্লবী সরকার, যে করেই হোক জুলাই বিপ্লবীদের বাঁচিয়ে রাখবে হবে। তা না হলে এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে।’
অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা জাবের বলেন, ৫ আগস্টের পর অনেকে বাসায় ফিরে গিয়েছিল, ওসমান হাদি বাসায় ফিরে যাননি। তিনি জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করতেন এবং এ জন্য দিনরাত কাজ করতেন। যে ছেলেটি গুলি করেছে, শুনতে পাচ্ছি সে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কোনো প্রক্রিয়ায় জামিন পেয়েছে। সেটা তদন্ত করুন।