মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অপ্রতিরোধ্য শোষণ-পীড়ন ভেঙে পড়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বিদায়ঘণ্টা ক্রমাগত ধ্বনিত হচ্ছিল। এই ভূখণ্ড থেকে উপনিবেশ বিদায় নিচ্ছে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজ সৃষ্টি করে। বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছে যায় ঢাকা পর্যন্ত।
মুনীর চৌধুরীর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সমাজের নানামাত্রিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে আলোড়িত করেছে। ফলে তিনি সব সময় থেকেছেন জীবনঘনিষ্ঠ। প্রবন্ধের মাধ্যমে সাহিত্যে তাঁর অভিষেক হয়েছে। তবে তাঁর ব্যাপ্তি বহুধা পথে। ছোটগল্প-সাহিত্য-সমালোচনা, প্রবন্ধ রচনায় তাঁর ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হলেও প্রধানত তাঁর প্রধান উপস্থিতি নাট্যসাহিত্যে।
মুনীর চৌধুরী অনেক নাটক রচনা করেছেন। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘মানুষ’, ‘নষ্ট ছেলে’ ও ‘কবর’। নাট্যকার তাঁর নাটকে অনবরত সমাজের কলুষ দূর করতে চেয়েছেন। উল্লিখিত তিনটি নাটক একত্র করে প্রকাশ করেছেন। এই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘এই নাটকত্রয়ের মধ্যে আমার এবং এদেশের জীবন-চেতনা ও অভিজ্ঞতা-অনুভূতির এবং বিশেষ গর্বের জ্বলন্ত ছাপ পড়েছে।’ ভূমিকাংশের এই বার্তা নাটকত্রয়ের বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়।
ক্রমাগত মুনীর চৌধুরীর জীবন-চেতনা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ তাঁর মানস-কাঠামো প্রস্তুত করেছে। তাঁর পঠন-পাঠন, নিত্যদিনের যাপিত জীবন, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা—সবকিছুর ভেতর দিয়ে চলমান জীবনের সংকট ও সম্ভাবনার পথরেখা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ফলে ‘মানুষ’, ‘নষ্ট ছেলে’ ও ‘কবর’ নাটক সম্পর্কে উদ্ধৃত ভূমিকাংশকথন আমরা দেখতে পাই।
‘মানুষ’ নাটকে ‘লোকটা’ পরিচয়ের আড়ালে একজন হিন্দু চরিত্র চিত্রায়িত হয়েছে, যিনি একজন চিকিৎসক। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় যখন হিন্দু মুসলমানকে মারছে, মুসলমান হিন্দুকে মারছে; এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চিকিৎসক নিজেকে প্রথমত মানুষ বলে পরিচয় দিয়েছেন।
‘নষ্ট ছেলে’ নাটকে প্রগতি-সাম্যবাদী চরিত্র রাশেদাকে পাই। রাশেদার বাবা ব্যক্তিজীবনে ন্যায়পরায়ণতার পথে ছিলেন না। নিজের আদর্শের বিপরীতে যাওয়ায় বাবা মেয়েকে মেনে নিতে চায় না।
ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে মুনীর চৌধুরী ‘কবর’ নাটক লিখেছেন। ভাষা আন্দোলনের কারণে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে, কারাবাস করতে হয়েছে। কারাবাসীদের একজন মুনীর চৌধুরী এই নাটকের রচয়িতা। ১৯৫২ সালে গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৩ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন উপলক্ষে জেলবাসকালে তিনি ‘কবর’ রচনা করেন। এই নাটকের ভেতর দিয়ে আন্দোলন, রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক খুনি চরিত্র, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান ফুটে উঠেছে। মুর্দাফকির চরিত্রটি বিবেকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
উল্লেখিত তিন নাটকের নাতিদীর্ঘ আলোচনায় বোঝা যাবে লেখক কেন এ দেশের ‘জীবন-চেতনা ও অভিজ্ঞতা-অনুভূতি’র ছাপ থাকার কথা ব্যক্ত করেছেন। ‘মানুষ’ নাটকের বিষয় হয়ে উঠেছে জীবনঘনিষ্ঠ পাঠ। প্রত্যক্ষ করা সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন চিত্র এখানে আমরা দেখতে পাই। ‘নষ্ট ছেলে’ নাটকটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। ‘কবর’ নাটকের পটভূমিও বাস্তবতা উৎসারিত।
‘মানুষ’ নাটকে মুনীর চৌধুরী দাঙ্গা রূপায়ণ করেছেন। এই দাঙ্গা এখন ঐতিহাসিক সত্য। মুনীর চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেছেন দাঙ্গার পরিণতি। একদিকে বন্দেমাতরম, অন্যদিকে আল্লাহু আকবার ধ্বনি। উচ্চকিত দুই ধ্বনিই যেন পরস্পরের মধ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। সেই চ্যালেঞ্জ শক্তি পরীক্ষার। জীবনের বিনিময়ে সেই পরীক্ষা। ফরিদ, জুলেখা, এক শিশু এবং তাদের মা-বাবা এই নাটকের চরিত্র। এদের সঙ্গে আরেকজন ‘লোকটা’ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আছে। এ ছাড়া অনেক লোক আছে, যাদের পরিচিতি সামষ্টিক চরিত্র হিসেবে।
মুসলমান-হিন্দু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মোর্শেদকে হিন্দুরা মেরে ফেলে। মোর্শেদ ফরিদ-জুলেখার আরেক ভাই। মোর্শেদের মৃত্যু ঘিরে একটি পরিবারে সৃষ্ট ঘটনার আবর্তনই এই নাটকের প্রধান কলেবর। স্বল্পতম সময়পরিধিতে সব ঘটনাই ঘটে। এক অঙ্কের নাটক। মুনীর চৌধরী যেহেতু ইতিবাচকতায় সমাজকে দেখতে চান, তাই ‘মানুষ’ নাটকে সাম্প্রদায়িকতার মধ্যেও মানবিকতা হাজির করেছেন। ‘লোকটা’ পরিচয়ে যে চরিত্রটিকে আমরা পাই, তাকে ঘিরে কাহিনির যে ব্যাপ্তি, সেখানে লোকটির বড় পরিচয় দেখানো হয় তিনি একজন মানুষ। মোর্শেদকে হারানো মা-বাবা, বোন জুলেখাও হিন্দু লোকটিকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের প্রতি ঘৃণা-ক্ষোভ-জিঘাংসা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, তখন একজন হিন্দু গ্রামে ঢুকেছে জেনে তাকে খোঁজা হচ্ছিল। লোকটি সদ্য পাস করা চিকিৎসক। তার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিল রোগী দেখতে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তার বন্ধু তাকে জায়গা দিতে অপারগতা জানায়। তখন প্রাণভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মুসলমানরা দেখে ফেলায় সে নিজেকে আড়াল করার জন্য প্রাণভয়ে ফরিদদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ওই চিকিৎসককে ধরার জন্য, মানে মারার জন্য যারা গ্রামে দলবদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে ফরিদও আছে। কারণ তার ভাই মোর্শেদকে হিন্দুরা মেরেছে। এই ঘটনাগুলো যখন ঘটছে, তখন ওই বাড়ির ছোট শিশু অসুস্থতায় চিৎকার করছিল। চিকিৎসকও প্রায়ভয়ে ওই বাড়িতেই ঢুকে পড়ে। চিকিৎসকের চিকিৎসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। গ্রামের লোকজন ততক্ষণে খবর পেয়েছে, যে হিন্দু লোকটিকে দেখা গেছে সে ফরিদদের বাড়িতে ঢুকেছে। ফলে দলবদ্ধ ক্ষুব্ধ মুসলমানরা সবাই মিলে ফরিদদের বাড়ি তল্লাশি করে। ফরিদের মা সুকৌশলে তাকে আড়াল করে। এখানে এটাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও সবাই সেই দাঙ্গার পক্ষের মানুষ নয়। কেউ কেউ ধর্মের পরিচয়ের পরিবর্তে মানুষ হিসেবেও মূল্যায়িত হন।
‘নষ্ট ছেলে’ নাটকের নাম হলেও বাস্তবে সে নষ্ট ছেলে নয়। সামজের চোখে, সামাজিকের ভাষায় বিংশ শতকের মাঝামাঝি প্রগতিবাদী তরুণদের নষ্ট ছেলে বলে জ্ঞান করা হতো। এই নাটকে এরতাজুল করিম নামের একটি চরিত্র আছে। তার মেয়ে রাশেদা। দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা। এরতাজুলের উক্তিতে নিজ সন্তান সম্পর্কে ধারণা পওয়া যায়— ‘আল্লা রসুলের রাহে নয়, বাপ-মায়ের কল্যাণের জন্য নয়, যে মেয়ে কতগুলো বে-শরিয়তী স্বদেশী বুলির মোহে বেহায়া বে-আব্রু হয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, এরতাজুল করিম তেমন মেয়েকে কন্যা বলে স্বীকার করে না।’
এরতাজুল নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অর্থ উপার্জন করেন। কিন্তু মেয়ের ক্ষেত্রে তিনি ধর্মীয় বুলি আওড়াতে থাকেন। অন্যদিকে রাশেদা জনকল্যাণে নিয়োজিত। অভুক্ত-ভুখা-নাঙা মানুষগুলোর জন্য তার অশেষ ভাবনা। তাদের জন্য সে নিবেদিত। তৎকালীন সমাজ-রাষ্ট্র এমন নারীকে পছন্দ করত না। ফলে রাশেদাকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ খুঁজে বেড়ায়। এক ঈদের রাতে রাশেদা গোপনে বাড়িতে আসে। রাশেদা বাড়িতে আসার আগে পুলিশ এসে খোঁজ করে। রাশেদার ছোট ভাই আমিনও রাশেদার পক্ষে। রাশেদা আসার পরও আবার পুলিশ এসেছিল। কিন্তু রাশেদা পুলিশের চোখ এড়িয়ে নিরাপদে চলে যায়।
মুনীর চৌধুরীর সবচেয়ে উজ্জ্বল সৃষ্টি ‘কবর’। এক অঙ্কের এই নাটকের মাধ্যমে নাট্যকার ভাষা আন্দোলনকে অনেকটা সামগ্রিকতায় তুলে ধরেছেন। এই নাটকের অন্যতম চরিত্র ‘নেতা’, তাঁর কোনো নাম এখানে নেই। নাম না থাকার মাধ্যমে বোঝা যায়, তিনি সমস্ত নেতার প্রতিনিধি। ভাষা আন্দোলনে শহীদদের লাশ গোপনে কবর দেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত পুলিশ কর্মকর্তা হাফিজ। তিনিও রাষ্ট্রের অন্ধ আজ্ঞাবহ। এই দুটি চরিত্র ভাষা আন্দোলনের বিপরীত শক্তি। ফকির এখানে এসেছে জাতির বিবেক হিসেবে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে অসংলগ্ন কিংবা অপ্রকৃতিস্থ মনে হলেও ন্যায়বোধের কথা তিনি বলেছেন রূপক-প্রতীক-ইঙ্গিতে। লেখক একটি অতিপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে মৃতদের তুলে এনেছেন। তারা সরব ছিল। লাশগুলো বিপ্লবীদের ভূমিকায় চিত্রিত হয়েছে।
মুনীর চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান স্থান-কাল নিরপেক্ষ। শিল্পী বিচারে তিনি উচ্চাসনে আসীন। মানুষের জন্য নিবেদিত ছিলেন। পাকিস্তান পর্বে দুইবার কারাবরণ করেছেন। কর্মজীবন বিপন্ন হয়েছিল, তবু প্রতিবাদ জারি রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় যখন প্রায় নিশ্চিত, তখনই তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ফেরেননি। অনেকের ধারণা, সেদিনই তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। দেশের জন্য এই বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। ‘কবর’ নাটকে মুনীর চৌধুরী ভাষাশহীদদের প্রসঙ্গে ফকিরের ভাষ্যে লিখেছেন—‘বিশ-পঁচিশ-ত্রিশ হাত যত নিচেই চাপা দাও না কেন এ মুর্দা থাকবে না। কবর ভেঙ্গে বেরিয়ে চলে আসবে।’ এই নাটকে অন্যত্র মূর্তির ভাষ্যে মারা না যাওয়ার ঘোষণা আছে। মূর্তির সংলাপ— ‘আমরা মরিনি। আমরা মরতে চাইনি। আমরা মরব না।’ মুনীর চৌধুরীর নিজের লেখাই নিজের জীবনের জন্য যেন অলঙ্ঘনীয় সত্য হয়ে আছে। মুনীর চৌধুরী মরতে চাননি। তিনি মরে যাননি। তাঁর জন্ম শতবর্ষে এসেও আমরা বলছি—তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। জীবনঘনিষ্ঠ লেখক মুনীর চৌধুরীর জন্মশতবর্ষে প্রয়াণ দিবসের প্রণতি।